যশোরবাসী কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করবে আপনাকে

আপডেট: 02:21:06 10/03/2018



img

আরিফুর রহমান

আমলাতন্ত্রকে গালি দেওয়া সহজ; কিন্তু, প্রশাসন, পৃষ্ঠপোষকতা এবং নীরব নেতৃত্ব সমান্তরালে চলে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মতো হয়ত মঞ্চ কাঁপিয়ে, ঘোষণা দিয়ে নেতৃত্বের সফলতা তুলে ধরা হয় না, তবে মাঠ প্রশাসনের নেতৃত্ব চলে নীরবে। সেই নীরব নেতৃত্বের ধূমকেতু যশোরের বিদায়ী জেলা প্রশাসক জনাব মো. আশরাফ উদ্দিন।
আমরা জানি, যশোর বাংলাদেশের প্রথম জেলা, প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা, দেশের প্রথম ডিজিটাল জেলা, দেশের সবচেয়ে কার্যকরী স্থলবন্দরও যশোরে। তথাপি, অনুন্নত শিল্পায়ন, মাদকের ভয়াল ছোবলে তরুণ সমাজের বিপথে যাওয়া, বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনার সাথে তাল মেলাতে না পারা- এ সবই যশোরের প্রতিচ্ছবি। যশোরে আসার পর প্রথমেই বিদায়ী জেলা প্রশাসক মহোদয়ের বিস্ময় জাগে, এত ইতিহাসের, গৌরবের, ঐতিহ্যের যশোরের এ অবস্থা কেন? যারা কাজের মানুষ, উদ্ভাবনের মিশেলে যাদের নেতৃত্ব, অজুহাত বা প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারে না। দমিয়ে রাখতে পারেনি বিদায়ী জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিন স্যারকেও। স্বভাবজাত উদ্যম নিয়ে স্যার শুরু করলেন যশোরকে বদলে দেওয়ার দিগন্তজোড়া স্বপ্ন। পাশাপাশি, প্রশাসন সার্ভিসের গর্ব আশরাফ স্যার এও মাথায় রাখলেন “গর্তে ইঁদুর রেখে মাটি চাপা দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না, ইঁদুর আবার গর্ত খুড়বেই”। স্যার ভাবলেন, স্যারের মতো করেই বুঝলেন, শিল্পায়ন এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে যুবসমাজের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার মাধ্যমেই মুক্তি ঘটবে সীমান্তবর্তী এ জেলার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান স্যারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সেই ভাবনার পথচলা শুরু। আনঅফিসিয়ালি আলোচনা করলেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে। বগুড়ায় জেলা প্রশাসক থাকাকালীন দুটি “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (Exclusive Economic Zone)” গড়ে তোলার অভিজ্ঞতার আলোকে ভাবলেন, পরিকল্পনা শুরু করলেন। শুরু হলো নির্ঘুম রাত, নিরন্তর ছুটে চলা। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম অংশ “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” হিসেবে যশোরকে সামনে নিয়ে আসার। কর্মজীবনে আশরাফ স্যার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালকের দায়িত্ব পালনসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করার সুবাদে স্যারের ব্যক্তি ইমেজ অনন্যসাধারণ। নিজ উদ্যোগেই স্যার নীতি নির্ধারকগণদের বুঝাতে চেষ্টা করলেন যশোর কেনো “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল”-এর জন্য উপযুক্ত, কেনো যশোরে সেটা অপরিহার্য। স্যার সফল হলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান স্যার যশোরে আসলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে জানালেন যশোরে “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” গড়ে তোলার সরকারের অভিপ্রায়ের কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা”র মুখ্য সমন্বয়ক ড. আবুল কালাম আজাদ স্যার যশোরে আসলেন, “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা”র উপর সকল শ্রেণি-পেশার মানুষদেরকে নিয়ে দিনব্যাপী কর্মশালার পাশাপাশি বিশেষ নজর রাখলেন যশোরে “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” গড়ে তোলার। তৎপরতা অব্যাহত রইল। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। মন্ত্রণালয় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নীতি নীর্ধারকগণ ছুটে আসলেন যশোরে। আশরাফ স্যার সবাইকে নিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলেন যশোরের সম্ভাব্য  “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” গড়ে তোলার জায়গাগুলোতে। সুযোগ্য জেলা প্রশাসক হিসেবে সবসময় মাথায় রাখলেন মানুষের বসতি এবং ফসলি জমি যাতে অন্তর্ভুক্ত না হয়। নিপুণ দক্ষতায় স্যার আগত নীতিনির্ধারকগণদের বুঝাতে সক্ষম হলেন কীভাবে “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” গড়ে তোলার মাধ্যমে যশোর মুক্তি পাবে মাদকের ছোবল থেকে, ক্রীড়নক হতে পারবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার।
সবশেষে, স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা, আর বিদায়ী জেলা প্রশাসক জনাব মো. আশরাফ উদ্দিন স্যারের অদম্য চেষ্টায় আজ যশোরে দুটি “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে, একটি আলোচনা আর পর্যালোচনার পর্যায়ে আর একটি “Export Processing Zone” গড়ে তোলার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে না বললেই নয় যে, বিদায়ী জেলা প্রশাসক মহোদয়ের যোগ্য সহযোগী হিসেবে এত সব কর্মপরিকল্পনায় নিরলস পরিশ্রম ও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জনাব মো. রেজায়ে রাব্বী।
এত সব “Thinking out of Box” সত্ত্বেও থেমে থাকেনি ডিজিটাল জেলা হিসেবে যশোরের বার বার প্রথম হওয়া, জেলা প্রশাসন থেকে দরিদ্র ও মেধাবীদের বৃত্তি দিয়ে সাহায্য করা, অসহায় মানুষদের আর্থিক সাহায্য, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, মোবাই কোর্ট পরিচালনা, জুয়া ও মাদকের আসর বন্ধ করা, আগের জেলা প্রশাসকগণের উদ্ভাবনী কাজগু্লোকে আরো টেকসই করা, মোদ্দা কথা জেলা প্রশাসনের নিত্য কাজ।
মাত্র নয় মাস, এ অল্প সময়ের মধ্যে বিদায়ী জেলা প্রশাসক জনাব মো. আশরাফ উদ্দিন স্যার যে কর্মবীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা “বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল” গড়ে তোলার কাজ সমাপ্ত হলে যখন যশোরবাসীর মুক্তি ঘটবে মাদকের ভয়াল থাবাসহ আরো নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা থেকে, তখন নিশ্চয় যশোরবাসী কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করবে আপনাকে, চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন যশোরবাসীর মনে। আপনার আগামীর পথচলা হবে সমগ্র দেশ ও সমগ্র জাতির কল্যাণের অগ্রদূত হিসেবে।
[লেখক : এনডিসি, যশোর]