যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে কী করেন কয়েদিরা

আপডেট: 01:12:13 04/06/2018



img
img

শহিদুল ইসলাম দইচ : কারাগারের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর নির্যাতনের কারণে অসন্তোষ বাংলাদেশে বহুলচর্চিত একটি বিষয়। তবে এর বাইরে অন্য চিত্রও আছে। সাধারণ লেখাপড়া, নৈতিক শিক্ষা আর হাতেকলমে কর্মমুখি শিক্ষার মাধ্যমে বন্দিদের আলোর পথও দেখায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ। লব্ধ জ্ঞান, দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একজন অপরাধী জেলমুক্তির পর ইচ্ছে করলে সুপথে থেকেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারেন।
যশোরে কেন্দ্রীয় কারাগারে এখন হাজতি-কয়েদি মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার বন্দি; যাদের মধ্যে প্রায় এক হাজার জনই এই সব শিক্ষার আওতায় রয়েছেন।
বিশাল আয়তনের যশোরে কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশ ভালো। ভৈরব নদের পাশে শহরের প্রাণকেন্দ্র এই কারাগারটিতে রয়েছে একটি সুবিশাল লাইব্রেরি। বন্দিদের স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং উপার্জন করার মতন হাতের কাজ শেখার ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। কারাভ্যন্তরে রয়েছে তাজ চালি, কাঠচালি, দর্জিচালি, কুটির শিল্পচালি। ব্রতচালি, মালি, বাবুচালি ইত্যাদি।
কুটির শিল্পচালিতে পুঁতি ও বেতির কাজ করেন কমপক্ষে ৮০ জন। এদের প্রশিক্ষক কয়েদি মো. নুরুল ইসলাম। তার নেতৃত্বে ওই চালিতে পুঁতি ও বেতি দিয়ে ব্যাগ, পার্স, চুড়ি, নূপুর, নেকলেস, টিস্যু বক্স, কলমদানি, ফুলদানি, চাবির রিং, তসবিহ ছাড়াও নৌকা, শহীদ মিনারের প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়।
প্রশিক্ষক নুরুল ইসলাম জানান, তিনি দিনে একটি টিস্যু বক্স বা কলমদানি অথবা ফুলদানি তৈরি করতে পারেন। প্রায় দশ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। কারগারে থাকা বন্দি, কারারক্ষী, প্রদর্শনী হলে আসা বাইরের লোকজন এসব পণ্যের ক্রেতা। মাসে কমপক্ষে তিন থেকে চার হাজার টাকা উপার্জন করেন তিনি।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত নুরুল ইসলামের সাজার মেয়াদ শেষ হবে বছর দেড়েক পর। বাড়ি ফিরে তিনি অভিজ্ঞতালব্ধ এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে জীবিকা নির্বাহ করবেন বলে আশা করছেন।
হস্তশিল্পের কাজ করেন কয়েদি হাফিজুর রহমান। আগে তিনি রঙতুলির কাজ করতেন। কারাগারের নানা অনুষ্ঠানের ব্যানার, ফেস্টুন, সাইনবোর্ড তিনিই বানাতেন। বছরখানেক হলো তিনি ওয়ালম্যাট, ব্যাগ, চুলের খোপা, গুছি, কানের দুল, ক্লিপ, চুমকি ও জরি দিয়ে বিভিন্ন ক্যালিগ্রাফি, কাবা শরিফ, মদিনা শরিফের প্রতিচিত্র তৈরি করেন। এখাত থেকে তার মাসে ৪-৫ হাজার আয় রোজগার হয়। মুক্তি পাওয়ার পর তিনিও এই কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করবেন বলে আশা করছেন।
কারাগারে কাঠের কাজ করেন আব্দুল করিম। তার সঙ্গে রয়েছেন আরো চারজন। কাঠ দিয়ে তারা নৌকা, উড়োজাহাজ, হেলিকাপ্টার, স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনারের রেপ্লিকা, টিস্যু বক্স, খেলনা, কাঠের ওয়ালম্যাট, কাঠের পুতুল, খেলনা খাট ইত্যাদি তৈরি করেন। তাদের এই সমস্ত শিল্পকর্ম বিভিন্ন মেলয় বিক্রি হয়। শোপিস কারাভ্যন্তর ও বাইরে বিক্রি হয়। এখন তার উপার্জনও ভালো। ছাড়া পেলে বাইরে একই কাজ করবেন বলে জানালেন।
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. আবু তালেব বলেন, কারাগারে বন্দিদের জীবন মান উন্নয়ন, নৈতিক শিক্ষা, কর্মমুখি শিক্ষা ইত্যাদির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে বিভিন্ন ট্রেডে হাজারখানেক বন্দি কাজ করেন।
‘শরীর সুস্থ রাখার জন্য এখানে সকাল-বিকেল ভলিবল ও ক্রিকেট খেলার আয়োজন করা হয়। কারাভ্যন্তরের বিশাল মাঠে পাঁচ-সাতশ’ বন্দি খেলা উপভোগ করেন। রয়েছে ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থাও। এছাড়া মাদকাসক্ত বন্দিদের জন্য রয়েছে বিশেষ পিটি-প্যারেড। তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাও করা হয়। মুক্তির পর পরিবার যদি এই পরিচর্যা অব্যাহত রাখে তবে তারা মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসতে পারে,’ অভিমত জেলার তালেবের।