যুগ-যন্ত্রণার প্রধান আলেখ্য ‘শিশমহল’

আপডেট: 02:07:56 17/04/2017



img

দিদার মুহাম্মদ

যিনি বাজি ধরেন এই শ্বাপদ সময়ের সাথে, যার কবিতা পিঠের থকথকে জখমের মতো অথচ সাবলীল আলাপের মতো বোধের দেয়ালে আঁচড় কাটে অবলীলায়, মহল গড়ে স্বার্পিত কষ্টের মতো, ত্রিকালদর্শী সে সমকালীন যন্ত্রণার কবি মঈন মুনতাসীরে ‘শিশমহল’ সেই সত্যের নির্মাণ। তিনি জানেন, সরকারি চিড়িয়াখানা সত্য, পুঁজিবাদী সমাজের দাসত্ব সত্য; মিথ্যা কেবল দুর্বলের হাক, নয়তো সরকারি চিড়িয়াখানা আর সমাজের শাইলকদের কেন দরকার। আত্মবিক্রয়ের পর যেমন সার্বভৌমত্বের কিছু থাকে না, ঘিরে ধরে জীবনের অনাসক্তি, তখন তিনি মুসাফিরের মতো যাত্রাবিরতি নয়, পূর্ণ বিশ্রাম চান মাটির দু-আস্তরণ নিচে। পরক্ষণেই তেতিয়ে ওঠে সাহারার মতো তৃষ্ণার্ত কবিহৃদয়। দুনিয়ার মদে তার তৃষ্ণা মিটবে না যেন, কবি হয়ে ওঠেন দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী-
আমার রক্তে, মাংসে আর বাহুতে নেশা
আমার ঠোঁটে, চোখে আর চুম্বনে নেশা
আমার কাঁধে, পিঠে আর কলিজায় নেশা

কবির ঘোর কাটে না। যেন সরকারি জিম্মায় লালদালানের উঁচু দেয়ালের ক্ষুদ্র জানালা থেকে উঁকি দিয়ে দেখেন নাগরিক জীবন। রাস্তার মেয়েটির হাতে ভেঁপু বাজিয়ে চলে জীবন, জীবন চলে হকারের ঝুঁকি নিয়ে এগাড়ি-ওগাড়ি করে। কিন্তু নাগরিক বৌটার ঘুম ভাঙেনি এখনো যার গাঢ় মেকাপের আস্তরণে আসল রূপটিই যায়নি দেখা। তাই কবি জীবনের যে কঠিন সত্য, তাকে আহ্বান জানানা এভাবে-
এবার দরোজা খোলো-
একবার দেখি আধোয়া মুখ তোমার,
তাতে কৃত্রিমতা কম মেলে যদি-
সেই ভালো-
সেই ঈষৎ মানবী দর্শন!

দিন গড়িয়ে বিকেল কিংবা সন্ধ্যা এলেও জীবন চলে ম্যারাথন দৌড়ে। শামুক-গুগলির মতো নেতিয়ে পড়ে, কোথায় যাবে এই ভেলকিবাজির দেশে এই শালদুধের মতো ঘন সন্ধ্যায়। তবু জীবন থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব নয়, তাকে যোগান দিতে হয় কাম, অর্থ আর ক্ষমতা। কী হয় শেষমেষ! কবির উপলব্ধি,
এই সুশোভিত নারী,
গহনা, গবাদি পশু, সন্তান আর ফসলি জমির মোহে
আমি হারিয়ে ফেলেছি নিজস্ব ঠিকানা।

অনাগত সন্তানের ভয়ে ক্ষয়ে যান কবি। ক্ষয়ে যান দগ্ধ-পোড়া আকাশের ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের চে’ কিঞ্চিৎ বেশি। কবি অবাক হয়ে যান যখন দেখেন কেবল শরীর দিয়েও গড়ে ওঠে মানুষ। তারচে’ বরং বেশ্যারা ভাল। আত্মবিক্রয়ের আরেক মান–
বুকের কয় ইঞ্চি, উরুর কতোটা অংশ,
নাভির নিচের কয় গজ দেখাতে পারলে
ফুটপাতের দর্শক তৃপ্তি পাবে-
সে কথা ভেবেই তোমার স্বস্তি।

সাবলীল ধারাভাষ্য। কবিকে আত্মগ্লানিতে, ক্ষোভে ক্ষত হতে দেখি। ব্যক্তিকবির প্রেমিকা নয়, দেহসর্বস্ব তথাকথিত প্রেম ও প্রেমিকাই এখানে দেখি। দেহশিকারী প্রেমিককে নিয়ে দুটি লাইন বা একটি কবিতা কেন লিখলেন না কবি সে প্রশ্ন অবান্তর না হলেও যেহেতু কবিতায় আসেনি তাই সেটার কথা বলা যাচ্ছে না। তবে এতটুকু বলি, কবি কোন রাজনীতিক নন, প্রথাগত সংস্কারক নন, যে এক বক্তব্যে সবাইকে এক হাত দেখিয়ে দিবেন। আবার, কেবল মাঝের লাইনগুলো পড়বেন না, পড়বেন পুরোটুকু। যারা মাঝের রগরগে অংশটুকু পড়বেন তারা আর যাই করুন কবিতাটা পড়েননি।
পাঠক বড় সমঝদার। কবিতার ভাব ও ভাষার ব্যবহার নিয়ে একটি মূল্যায়ন খুবই জরুরি হয়ে ওঠে তার কবিতায়। তার ভাব ও ভাষা সাদামাটা। কবিতার সাদামাটা ভাষাটাই ভাষার নিকটবর্তী, পাঠকের নিকটবর্তী। কথাগুলো বাস্তব ছ্যাঁচা খাওয়া মানুষের তথা আপনারই পাশের লোকটার ভাষা যে কিনা গালি ছাড়া কোন কথাই শেষ করতে পারে না। এটাই ভাষার মুক্তি, কবিতার ভাষা। ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের নাট্যরূপ মঞ্চস্থ হয়েছিল, পাঁচির পচা পা দেখে গা ঘিন ঘিন করেছিল। নাটকের সার্থকতা তো এখানেই, শিল্পের সার্থকতা এমনই, বোধ আর উপলব্ধিকে নাড়িয়ে তোলে। হ্যাঁ, কবিতা ‘শিল্পমান উত্তীর্ণ’ হলো কিনা প্রশ্ন। কিন্তু ‘শিল্পমান’টা কী! সে তো আরেক বালাই।
কবি মঈন মুনতাসীর নেংটাকে নেংটাভাবেই মঞ্চে এনেছেন, মানুষ দেখছে। তিনি অশ্লীলকে শ্লীল করার চেষ্টা করে ক্ষমতার পা চাটতে যাননি। আবার, শ্লীলকে অশ্লীল বলে বাজার কিনতে চাননি। বরং অশ্লীলকে অশ্লীল বলেছেন, এক অসংগতিকে দিয়ে শুরু করেছেন, শেষ করেছেন রাষ্ট্রে গিয়ে।

কবির ভেতরে প্রেমের যে দহন, প্রেমিকার যে অস্তিত্ব তা কখনো মানবী অবয়ব নিয়ে দাঁড়ায় কবির সামনে। কবি বাংলাদেশের ক্ষত মানচিত্র, ভাগাভাগির নক্সা ছাড়া কিছুই দেখেন না। তাই দেশ তার প্রেমিকা হয়ে ওঠে। কবির ভাষায়-
আমি শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছি
আমার প্রেমিকার শরীরের আসে-পাশে
সন্দেহভাজনদের আনাগোনা।

কিংবা,
এই শিয়াল কুকুরের দেশে
এভাবেই ভাগাভাগি হয়ে যায়
আমার প্রেমিকার শরীল!

আমি তো বলি কবি মঈন মুনতাসীর ‘ত্রিকালদর্শী কবি’। পুরো ‘শিশমহল’ কিংবা তার ‘পাথুরে অলংকার’, ‘প্রজাপতির ডুবসাঁতার’ কিংবা ‘ক্রীতদাস’ হাতে থাকলে দেখুন আমার কথার সত্যতা মিলবে। ‘শিশমহল’ সিরিজ কবিতা। সিরিজ কবিতার প্রতিটি কবিতার সাজয্যু থাকে। গাছের একটি ডাল ধরে টান দিবেন না, ওটা আসলেই দুর্বল। পুরো গাছটা টেনে তোলার চেষ্টা করুন, দেখুন শেকড় কত নিচে। ‘শিশমহল’ তেমন কিছুই। সমস্যা হলো সমাজের যা নিয়ে তর্ক-বিবাদ করা দরকার কবি তা করেছেন-
আমার উঠোন ঘেষে
একাদশী চাঁদ দাঁড়িয়েছে এসে।
ভিক্ষে নিবি?
নে!
আমাদের চাল নেই, ডাল নেই,
খাটের নিচে পচা কুমড়োর মতো সাজানো আছে
অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
আমাদের ঝুলিতে যে প্রগতিশীলতার ধারণা আছে-
তা যথার্থই বিকৃত।
আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে সব অর্থ রয়েছে
তাতে দুদকের দায়ের করা কয়েকটি মামলা।
ভিক্ষে নিবি?
নে!
তবে আমাদের সংসদ ভবনটা নিতে পারিস
ওটা এখন আমাদের প্রয়োজন নেই।
এমন মাগিদের পাচাপাচি করার জায়গা
ঢাকা শহরে ঢের রয়েছে।
খুব আইন প্রণয়নের দরকার হলে
ষোলো আনা মাগিদের নিয়ে
কামরাঙ্গির চরে একদিন আইনসভা ডাকবো।
ভিক্ষে নিবি?
নে।

যদি বলি তার কবিতা ‘তেতো এক সত্য আখ্যান’ তবে সত্য সনাক্তকারীর আঁতে ঘা লাগতেই পারে। আসল জবাব কবি নিজেই দিয়েছেন তার ‘শিশমহল’-এ একদম প্রথম কবিতাতেই-
যুদ্ধে জড়াবো না ভেবেছিলাম
অথচ, আজ সকালে গুলিবিদ্ধ হলো-
আমার প্রেমিকার বাদামি দুটো স্তন!

যদি উচিত কথা বলি-
যদি চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেই-
আমিও বিরল প্রজাতির ঘড়িয়াল!
আমিও স্থান পাবো সরকারি চিড়িয়াখানায়!’

লেখক : কবি ও গদ্যকার