যুদ্ধে দুই চোখ হারিয়েও তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন!

আপডেট: 06:25:36 08/12/2016



img
img

জহর দফাদার : যৌবনের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার অকুতোভয় লড়াকু আব্দুল মান্নান মোল্লা এখন স্থানীয়দের হাসি-ঠাট্টার পাত্র! রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাজারে যাওয়ার সময় দুষ্টু লোকজন তাকে পায়ে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়।
পাকসেনাদের সঙ্গে ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধে দুই চোখ হারানো এই মহান মুক্তিযোদ্ধাকে স্থানীয় লোকজন ‘কানা মান্নান’ বলে সম্বোধন করে।
এতকিছুর পর আজো এই মানুষটি পাননি মুক্তিযোদ্ধার সম্মানটুকু। তালিকাভুক্ত করা হয়নি তাকে। জীবনের এই শেষসময়ে এসে এখন তার একটি চাওয়া, বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন মৃত্যুর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তার নামটি অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি মরতে চান একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, সসম্মানে।

ট্রেনিং
যুদ্ধের সময় ১৯ বছরের টগবগে যুবক। জন্ম ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি। লেখাপড়া খুব একটা জানেন না; কিন্তু স্মরণশক্তি প্রখর।
আব্দুল মান্নান ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। বাড়ি যশোর সদরের মুনসেফপুর পশ্চিমপাড়ায়। বাবা চাকরি করতেন খুলনার ইস্টার্ন জুটমিলে, শ্রমিক হিসেবে। সেকারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে মিলের পাশেই থাকতেন। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ বাড়িছাড়া হয়ে যান। খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু মথুরাপুরের মোশাররফকে নরেন্দ্রপুর এলাকার জল্লাদ আফসার নামে এক রাজাকার বন্দুকের বাট দিয়ে বাড়ি মারে। শাসায়, মুক্তিবাহিনীতে গেলে মেরে ফেলবে। এই ঘটনাটি তার মনে ব্যাপক দাগ কাটে। তবুও মা-বাবা কিংবা বন্ধু মোশাররফকে না জানিয়ে তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন; দখলদারদের হাত থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে।
মান্নান চলে আসেন প্রশিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওহাব মিন্টুর কাছে। সদরের একডালা-বটতলা এলাকায় তিনি তরুণ যোদ্ধা রেজা কাজী, ফরিদ, শান্তি, আব্দুল মান্নানসহ ১৫-১৬ জনকে রাইফেল চালনা থেকে শুরু করে ক্রলিং, সেফটিনেট, গ্রেনেড নিক্ষেপ প্রভৃতি যুদ্ধকৌশল প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা মিন্টু এরআগে এসব বিষয়ে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং তৎকালে তিনি মুজাহিদ কোম্পানির টুআইসি ছিলেন; ইনজিনিয়ারিং কোরেও কাজ করেছেন।
এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মান্নান সোজা ভারতে চলে যান। ভারতের বনগাঁর চাপাবাড়িয়া ট্রেনিংক্যাম্পে ছিলেন, অস্ত্রের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।
মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন জানান, তিনি মান্নানসহ ১৫ জন একসঙ্গে ট্রেনিং করেছেন। এখানে ট্রেনিং শেষে আর মান্নানের আর সঙ্গে দেখা হয়নি তার।
মান্নান বলেন, ‘‘ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরি। আব্বা বললেন, ‘এখানে খুব খারাপ অবস্থা, তুই চলে যা।’ ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ নামে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ফের ভারতে গিয়ে আরেক দফা প্রশিক্ষণ নিই। সেখানে আমির আলী পাঠান নামে একজন প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে দু-আড়াই মাস ট্রেনিং নিই।’’
‘নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে কমান্ডার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে আমাদের ১১ জনের একটি দলকে দেশে পাঠানো হয়।’

যুদ্ধকথা
নভেম্বরের শেষের দিকে সকালে কোটচাঁদপুর এলাকার শুভদির মাঠে তারা অ্যাম্বুশ করেন। পাকিস্তানি সেনারা খুলনা থেকে দর্শনার দিকে ট্রেনে যাবে- এমন সংবাদ আসে সোর্সের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে সেখানকার একটি ব্রিজের আশপাশ রেকিও করা হয়েছে।
মান্নানদের উদ্দেশ্য ছিল, ব্রিজটাকে ট্রেনসহ উড়িয়ে দেওয়া। তারা দুজন বসে আছেন কাটিম চার্জ করার জন্যে। মূল দায়িত্ব ছিল মহেশপুর উপজেলার চোরকোল এলাকার এক মুক্তিযোদ্ধার (নাম স্মরণ করতে পারেননি)। কিন্তু ট্রেনটি বেশ কাছাকাছি এলেও তিনি ঠিকমতো তারে সংযোগ দিতে পারছিলেন না।
মান্নান বলেন, ‘তাকে সরিয়ে দিয়ে আমি তারের নেগেটিভ-পজেটিভ সংযোগ করতে সমর্থ হই। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনটি ব্রিজের উপরেই পৌঁছে। সেদিন ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা খুবই সাহসী ছিলেন। বেঁচে থাকা কয়েকজন পাশে আখক্ষেতে পজিশন নিয়ে নেন। আমরাও তাদের বাইরের থেকে ঘিরে ফেলি।’
সেদিনের কথা স্মরণ করে মান্নান বলেন, ‘নারকেলবাড়িয়ার মুসাভাই আর আমি আখক্ষেতের মধ্যে গুলিতে আহত এক পাকিস্তানি সেনাকে ঘিরে ফেলি। তিনি পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন; কিন্তু রাইফেলটি ডানহাতে ধরে রেখেছিলেন। আমরা দুইজন তার হাত থেকে রাইফেলটি কেড়ে নিতে পারছিলাম না। পরে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে তাকে হত্যা করে পরে রাইফেলটি ছিনিয়ে নিই।’

চোখ হারান যেভাবে
কমান্ডার আনোয়ার হোসেন, ডেপুটি কমান্ডার চুয়াডাঙ্গার লতার নেতৃত্বে চুয়াডাঙ্গার উথলীতে অবস্থান নেন আব্দুল মান্নান, বরিশালের হানিফ, নারকেলবাড়িয়ার মুসা, উথথীর মান্নানসহ (২) ১১ জন।
উথলির একটি শালবাগান। বিকেল ৫টার দিকে পাকিস্তানিদের সঙ্গে গুলিবিনিময় শুরু হয়। সে প্রচ- এক যুদ্ধ। এই লড়াইয়ে তাদের কারোরই বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কমান্ডার আনোয়ারের কাছ থেকে তার দূরত্ব ছিল ৫০ গজের মতো। হঠাৎ পাকিস্তানিদের একটি গ্রেনেডের আঘাতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন কমান্ডার আনোয়ার। আর সেই সময়ই কী যেন লাগে মান্নানের মুখম-লে।
তিনি বলেন, ‘কী যে একটা এসে লাগলো কপালে, মুখের নিচে এবং দুই চোখে। খুব জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল। এরপর আর কিছু মনে নেই। পরে জানতে পারি দর্শনার একটি গোপন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমাকে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর থেকে দুই চোখে আর কিছুই দেখতে পাই না। ততদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। এর মাসখানেক পর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ (তিনিও তালিকাভুক্ত হননি; মারা গেছেন সম্প্রতি) আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেন।’

স্বীকৃতিহীনতা
মান্নান বলেন, ‘যখন যেখানে ছিলাম, তারা যে কাগজপত্র দিয়েছে, তা রেখে দিই। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। অনেক কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু নেই, তাই স্বীকৃতিও পাবো না- এমন বিশ্বাসই ছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে তার মেয়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় আমার আশা জাগ্রত হয়। যাচাই-বাছাইতে আমার নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও কেন যে বাদ পড়লো জানি না। অনেক চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারিনি। ফের হতাশা ভর করে।’
এরপর ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের কথা নতুন করে ভাবেন। তালিকা থেকে যারা বাদ পড়েছেন তাদের নিবন্ধনের ঘোষণা দেন। সংবাদ পেয়ে ১৭ জুন নিবন্ধন করেন মান্নান; যার ডিজি নম্বর ৫০৫৮৮। মনে করেছিলেন, এবার হয়তো কপালটা খুলতে পারে। কিন্তু আশার গুড়ে বালি পড়েছে।

কষ্টের দিনকাল
বছর ২৩ আগে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই ছেলেমেয়ে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে মাসুম বিল্লাহ (১৫) ঢাকায় দর্জির কাজ করে।
সংসার চলছে স্ত্রী রাশিদা বেগমের দৈনন্দিন মজুরির ওপরে। তিনি স্থানীয় একটি পানের বরজে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন; মজুরি দিনে ১০০ টাকা। আজ ১৪-১৫ বছর ধরে তিনি সেখানে কাজ করেন। জানালেন, খুব কষ্ট করেই সংসার চালাতে হচ্ছে।
মান্নান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখন পর্যন্ত কোনো সুবিধা পাইনি। বরং টিটকিরি সহ্য করতে হয়। তবে, প্রতিবন্ধী হিসাবে তিন মাস অন্তর ৯০০ টাকা (প্রতিমাসে ৩০০) পাই।’

সহযোদ্ধাদের ভাষ্য
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নানের বাড়িতেই কথা হয় এই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মো. মকবুল হোসেন, আব্দুল ওহাব মিন্টু, নওশের আলী গাজী প্রমুখের সঙ্গে।
তারা জানান, এই এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আব্দুল মান্নানই সবচেয়ে কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। বহু চেষ্টা করা হয়েছে তার নাম তালিকাভুক্ত করতে। কিন্তু কী এক অজানা কারণে তার নামটি অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
তারা জানান, শুধু মান্নান একা নন; এই এলাকাসহ আশপাশের আরো কয়েক মুক্তিযোদ্ধার নাম নথিভুক্ত হয়নি। তারা জানান, যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে যশোর পিকনিক কর্নার (শাহাবাটি দিঘির পাড়) এলাকায় পাকসেনাদের সঙ্গে মকবুল হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচ- লড়াই হয়। সে লড়াইয়ে শহীদ হন গোলাম মোস্তফা মৌলভী, আব্দুল গফুর মৃধা। তাদের নামও নেই তালিকায়। এছাড়া জীবিতদের মধ্যে তালিকাভুক্ত হতে পারেননি নরেন্দ্রপুর এলাকার নওশের আলী গাজী, আব্দুস সালাম, গোপালপুর এলাকার আবুল হোসেন খোকন, কচুয়া এলাকার আব্দুল মতিন, ওয়াজেদ আলী, দেয়াপাড়ার রেজা কাজী, ফারুক শাহী প্রমুখ।
তারা অবলিম্বে এসব বীরের নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির দাবি জানান।

শেষ ইচ্ছা 
‘বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার একটাই চাওয়া, মৃত্যুর আগে যেন আমাকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। সম্মানটুকু নিয়েই শেষ নিশ্বাস ছাড়তে চাই’, বলছিলেন যুদ্ধাহত আব্দুল মান্নান।

আরও পড়ুন