যে পতাকা অক্ষত ছিল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস

আপডেট: 01:38:31 16/03/2018



img

স্টাফ রিপোর্টার : সবুজ জমিনে লাল সূর্য, তার মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র এমন একটি পতাকা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস পত পত করে উড়েছে যশোরের বেনাপোল চেকপোস্টে। এই পতাকার দখল নিতে দিনের পর দিন যুদ্ধ চলেছে, শহীদ হয়েছেন অনেকে। কিন্তু স্বাধীন বাংলার এ পতাকা নয় মাস ছিল অক্ষত। এ পতাকাকে সবাই সম্মান দেখিয়েছেন। সাহস হয়নি পতাকাটি নামানো বা অন্যকিছু করতে।
পতাকাটি উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বেনাপোল পোর্ট থানার নামাজগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দ্বীন ইসলাম।
ওই পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা বেনাপোলের মুক্তিযোদ্ধা দীন ইসলাম জানান, বেনাপোল চেকপোস্ট তৎকালীন ইপিআর (বিজিবি) ক্যাম্পের ইনচার্জ সুবেদার মোশারেফ হোসেনের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল সকালে বেনাপোল চেকপোস্ট জিরো পয়েন্ট এলাকায় (বর্তমান বিজিবি ক্যাম্পের সামনে) বাঁশের খুঁটিতে উড়িয়ে দেওয়া হয় সেই লাল-সবুজের পতাকা। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাক সেনাদের হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ২৭ মার্চ বেনাপোল ইপিআর ক্যাম্পের সুবেদার মোশারেফ হোসেন তিনজন সহকর্মীকে নিয়ে ক্যাম্প থেকে সশস্ত্র অবস্থায় বেরিয়ে এসে অন্যদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগান।
দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘৩০ মার্চের মধ্যে আমাদের সঙ্গে আরো ১৪-১৫ জন যোগ দেন। ১ এপ্রিল সুবেদার মোশারেফ আমাদের নিয়ে যান বেনাপোলের বিপরীতে ভারতের জয়ন্তীপুর ফুটবল মাঠের শরণার্থী ক্যাম্পে। সে সময় মোজাম্মেল হক, আবদুর রশিদ, ছাত্রনেতা মোহাম্মাদ আলীও আমাদের সাথে ছিলেন। ওখান থেকে এসে ৩ এপ্রিল আমরা সীমান্তে পতাকা উত্তোলন করি।’
সাব সেক্টর কমান্ডার তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরী সেই পতাকা সম্পর্কে ‘যশোর জেলার ইতিহাস’ বইতে লিখেছেন, ‘এপ্রিল মাসের শেষের দিকে যখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আমাদের জনশক্তি সীমান্তের ওপারে চলে যায়, তখন বেনাপোল সীমান্তের উড্ডীয়মান পতাকাকে আমরা অসহায়ভাবে ফেলে যাইনি। মে মাসের প্রথমার্ধে যখন মুক্তিবাহিনীর পুনর্বিন্যাস চলছিল তখন এই পতাকা সংরক্ষণের ভার নিয়েছিলেন ভারতীয় বিএসএফের ১৮ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেং সিং বীরচক্র। এই রাজপুত অফিসার আমাদের পতাকাকে সম্মান দিয়ে মুক্তিসংগ্রামের প্রতি তার শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন। ১৮ বিএসএফ দুই দেশের দুটি পতাকা কভার করে রেখেছিল। মানুষতো দূরে থাক কাকপক্ষীটিও তার কাছে ভিড়তে পারেনি।’
‘সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বা গভীর রাতে মেশিনগান গর্জে উঠত, যদি তার আশপাশে সামান্যতম কোনো গতিবিধি পরিলক্ষিত হত। এই পতাকা ধ্বংস করার জন্য পাকিস্তানিদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তানিদের এই অপচেষ্টাকে কেন্দ্র করে এ জন্য কতজন যে হতাহত হয়েছে তা ঠিকভাবে বলা মুশকিল। এই পতাকা নিয়ে বেনাপোল সীমান্ত থাকত সব সময় সরগরম। আমাদের অনাগত দিনের বিজয়ের প্রতীক ছিল এই পতাকা।’
তৌফিক-ই-এলাহি চৌধুরী লিখেছেন, ‘জুন-জুলাইয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্ট বেনাপোল সীমান্ত থেকে বিদায় নিয়ে বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে চলে যায়। ওই সময় পতাকাটি বেনাপোল সীমান্তে একটি স্বীকৃত সত্য হয়ে গিয়েছিল। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা মিলে যৌথভাবে এই পতাকা সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয়। বেনাপোল সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০০ গজ জায়গা এ সময় জিরো লাইনে পরিণত হয়।’
বেনাপোল চেকপোস্টের পতাকা সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বীরবিক্রম ওই বইয়ে বলেন, ‘২৩ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর দুই ব্যাটালিয়ন সৈন্য বেনাপোলের কাগজপুকুর এলাকায় মুক্তিবাহিনীর মূল ঘাঁটিতে আঘাত করে। এখানে ৬ ঘণ্টা তুমুল যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ১৫ জন শহীদ হন। এর পরবর্তী ১৫ দিন পাকিস্তানিরা বেনাপোল চেকপোস্ট এলাকা দখলে নেওয়ার জন্য বহুবার আক্রমণ করে। উদ্দেশ্য ছিল চেকপোস্টের দখল নিয়ে সেখানে পাকিস্তানি পতাকা উত্তোলন করা। পতাকা রক্ষার যুদ্ধে অন্তত ১০০ পাক সেনা নিহত হয়। কিন্তু এলাকাটি কখনও পাকিস্তানিদের দখলে যায়নি।’
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃখ, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের সাক্ষী সেই স্থানটির কোনো চিহ্ন এখন আর নেই। সেখানে এখন বিজিবি ক্যাম্পের কংক্রিট ইয়ার্ড।
ইতিহাস রক্ষায় ওই স্থানটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন বেনাপোল পোর্ট থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার শাহ আলম।
তিনি বলেন, স্থানটি আজো আমাদের স্মৃতিতে অমøান। এর সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগী হওয়া কর্তব্য।’