রঁদেভ্যু ও আমার প্রেমিকারা

আপডেট: 02:48:57 20/12/2017



img

হাসনাত আবদুল হাই

এই অশীতিপর বয়সেও স্বীকার করতে লজ্জা পাই না বা বিব্রতবোধ করি না যে আমার অনেক প্রেমিকা এবং তাদের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। আমার প্রেমিক-জীবন শুরু হয়েছে কৈশোরে এবং যত বয়স বেড়েছে, নিত্যনতুন প্রেমে পড়েছি। যাকে পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস বলা হয়, লেডি মুরাসাকির লেখা, টেলস অব গেঞ্জির নায়কের মতো আমিও নতুন প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে পুরোনো প্রেমিকাদের ভুলে যাইনি। তাদের প্রতি আমার মনোযোগ এবং অনুরাগ অক্ষুণ্ন থেকেছে। নতুনের প্রতি পক্ষপাত না দেখানোর জন্যই পুরোনো প্রেমিকারা মনঃক্ষুণ্ন হয়নি, সম্পর্ক আগের মতোই রেখেছে।
বলেছি, কিশোর বয়স থেকেই আমার প্রেমিক-জীবনের শুরু, যার জন্য আমি প্রেমিক হিসেবে কাসানোভাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছি। অবশ্য প্রেমিক হিসেবে আমি কখনোই তার মতো লম্পট এবং হৃদয়হীন ছিলাম না, এখনো নেই। কিশোর বয়সে প্রেমে পড়ার মানে এই নয় যে কিশোরী যারা, তাদের সঙ্গেই প্রেম করে আমার হাতেখড়ি। প্রেমিক হিসেবে আমি যাকে বলে প্রিকশাস, অকালপক্ব। কিশোর বয়স থেকেই কিশোরী, তরুণী ও যুবতী সব বয়সের প্রেমিকা জুটিয়েছি। অন্যভাবে বলতে গেলে ভাগ্যচক্রে জুটে গিয়েছে।
আমার আগ্রহ ও আন্তরিকতা দেখে কেউ বয়সের জন্য মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। কেন নেবে? আমি নির্দোষের মতো কেবল তাদের সঙ্গ চেয়েছি, গুণমুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করেছি। আর আমার প্রেমিকারা দেখতে যে যে রকমই হোক, সবারই এক মন্ত্র: রূপে তোমায় ভোলাব না।
বিবাহিত জীবন শুরু হওয়ার পরও আমার প্রেম ছিল বিরতিহীন। আমার স্ত্রীকে এ সম্বন্ধে অন্ধকারে রাখিনি। তাকে জানিয়েই আমি প্রেমিকাদের নিয়ে থেকেছি। ডেঞ্জারাস লিয়াজোঁ সিনেমার কুটিল চরিত্রের নায়িকার মতো মোটেও হিংসুটে কিংবা জিঘাংসা ছিল না সে। আমি বিশ্বপ্রেমিক, স্ত্রী সেটি মেনে নিয়েছে। সে জানত, তার স্থানে সে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেখানে অন্য কারও প্রবেশাধিকার নেই। জানত বলছি এই জন্য যে প্রায় ছয় বছর হলো আমাকে ছেড়ে সে না-ফেরার দেশে চলে গেছে। সে যখন ছিল, আমার প্রেমিকারা নিয়মিত বাসায় এসেছে, পড়ার ঘর দখল করে বসেছে, ঘর ভরে গেলে অনেকে বাইরের ঘরের চেয়ার-টেবিল দখল করেছে, শেষে তাতেও না কুলালে তারা বেডরুমে হানা দিয়েছে। আমার স্ত্রী চলে যাওয়ার পার তাদের এই অভ্যাসে কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। বরং যেন সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য একটু বেশি করেই আসছে। একসময় তাদের সঙ্গে প্রেম করা ছিল আমার পার্টটাইম কাজ। বার্ধক্যে পৌঁছানোর বহু আগেই— আমার স্ত্রী জীবিত থাকতেই সেটা পরিণত হয়েছিল ফুল টাইমে।
সাধারণভাবে খারাপ না শোনালে, মোটা দাগে আমার প্রেমিকাদের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। তারা সব কাগজে তৈরি, আপাদমস্তক কালো হরফের মোটিফ দিয়ে সজ্জিত। কারও বাইরের সাজ খুবই শিল্পিত, কেউ আড়ম্বরহীন হয়েই ব্যক্তিত্বের প্রকাশে দৃষ্টিনন্দন। প্রেমিকাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, পরিচয়ের পর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে দেশে এবং বিদেশের নির্দিষ্ট স্থানে। ফরাসি ভাষায় এইভাবে দেখা করার স্থানকে বলা হয় ‘রঁদেভ্যু’। নির্দিষ্ট স্থানে ছাড়াও চলার পথে দেশে কিংবা বিদেশে হঠাৎ কোথাও দেখা পেয়েছি প্রেমিকার, যা অতর্কিতে হওয়ার জন্যই রোমাঞ্চকর। সেই রকম দেখায় পুরোনো প্রেমিকারা যেমন এসেছে, একইভাবে নতুনেরাও পরিচিতির পর অন্তরঙ্গ হয়েছে। কিন্তু এভাবে অনির্দিষ্ট স্থানে দেখা হওয়াকে ‘রঁদেভ্যু’র সঙ্গে তুলনা যাবে না, যদিও অনির্দিষ্ট স্থানে দেখা হওয়া প্রেমিকারা ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট রঁদেভ্যুতে আসতে পারে এবং আসেও। তখন নতুন আর পুরোনো প্রেমিকায় কোনো তফাত থাকে না। একই রঁদেভ্যুতে একাধিক প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হলে তারা বিরূপ না হয়ে একে অন্যের প্রতি সৌজন্য প্রকাশ করে এবং আমার সঙ্গ উপভোগের জন্য প্রস্তুত থাকে।
আমার প্রেমিকাদের পৃথক পৃথক নাম। আবার সাধারণ একটা নামও আছে। এই সাধারণ নামটি হলো ‘বই’। প্রেমের ব্যাপার বলেই বেশ সাসপেন্স রেখে এতক্ষণ পর নামটা বলা হলো। আর রঁদেভ্যু বলে যেসব স্থানকে নির্দিষ্ট করেছি, সেগুলো যে বইয়ের দোকান, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হ্যাঁ, বই-ই আমার আজীবনের প্রেমিকা, হয়তো আমৃত্যুও। আগেই বলেছি, এদের সংখ্যা অনেক এবং ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। দুঃখের বিষয়, তাদের তুলনায় রঁদেভ্যুর সংখ্যা বাড়ছে না, কোনো কোনো রঁদেভ্যু বা বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এ জন্য আমাদের প্রেমিকা-বইদের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা মোটেও কমেনি। আগের মতো তাদের অনেকেই আমার বাড়িতেই স্থায়ী অতিথি।
বইয়ের সঙ্গে প্রেম এত সহজ এবং দ্রুত হতো না যদি রঁদেভ্যু বা বইয়ের দোকান না থাকত। আমার এবং আমার মতো বইপ্রেমীর সৌভাগ্য, বইয়ের দোকান এই ডিজিটাল যুগেও অনলাইনের প্রতাপের মধ্যেও টিকে আছে। অ্যামাজনের ‘কিন্ডলে’ ব্যবহার করে বই পড়া যায়, বিভিন্ন অনলাইনেও তাই। কিন্তু সেই সব বই কি স্পর্শ করা যায়? গন্ধ থাকে তার পাতায় পাতায়? পড়ার সময় শব্দ হয় গাছের পাতায় মৃদু বাতাস বয়ে যাওয়ার মতো? বই পড়া যান্ত্রিক কোনো ব্যাপার নয়, পঞ্চেন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতা। সেই জন্যই বই পড়া প্রেমের মতো রোমাঞ্চকর।
সব বইপ্রেমীরই পছন্দের রঁদেভ্যু আছে, দেশে এবং বিদেশে। বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার আগে আমারও এমন ছিল কিন্তু এখন কেবল দেশেই সেগুলো সীমাবদ্ধ।
দুই
বলেছি, কিশোর বয়স থেকে আমার বইপ্রেম শুরু। এখন কিছুটা শুধরে নিয়ে বলি যে সেই প্রেম ছিল রঁদেভ্যু ছাড়াই, বইয়ের দোকানে গিয়ে চার চক্ষু মিলনের অবর্তমানেই। ১৯৫৪ সালে মফস্বল শহর থেকে ঢাকায় আসার পর বইয়ের সঙ্গে সামনাসামনি প্রেম করার সুযোগ এল। ঢাকায় নিউমার্কেটে কয়েকটা বইয়ের দোকান হলো আমার রঁদেভ্যু, বাংলাবাজার দূর বলে সেদিকে যাইনি। কলেজে ভর্তি হওয়ার কয়েক মাস পর হাতে পেলাম বৃত্তির টাকা। বইয়ের সঙ্গে প্রেম তো চলছিলই মফস্বলে থাকতে রঁদেভ্যু ছাড়াই। এবার সেই অভাব পূরণ হলো, প্রেম করা সম্পূর্ণতা পেল। নিউমার্কেটের পশ্চিম আর উত্তর দিকে তখন বেশ কয়েকটা বইয়ের দোকান। এর একটি নাম ওয়ার্সি বুক সেন্টার। তারা বইও ছাপায় আর বিক্রি করে গল্প-উপন্যাসের বই। বৃত্তির টাকা দিয়ে সেই দোকান থেকে কিনে ফেললাম আলাউদ্দিন আল আজাদের লেখা দুটি গল্পগ্রন্থ—ধানকন্যা ও জেগে আছি । বেশ প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখা। পরের দিকে লেখকের এই দৃষ্টিভঙ্গি অক্ষুণ্ন ছিল না, যে কারণে তাঁর নতুন লেখা বইগুলোর সঙ্গে প্রেম তেমন জমেনি।
জেগে আছি বইটি এখনো আমার সংগ্রহে আছে, ধানকন্যা কেউ নিয়ে ফেরত দেয়নি। ওয়ার্সি বুক সেন্টার থেকে কিছুদিন পর কিনে ফেললাম বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধের বই সাহিত্য-চিন্তা আর সমর সেনের কবিতা। এঁদের দুজনের লেখা আগে পড়িনি কিন্তু নাম জানা ছিল। বুদ্ধদেব বসুর গদ্য ভালো লেগেছিল, খুব সযত্নে লেখা, ইংরেজি লেখার প্রভাব স্পষ্ট। সমর সেনের কবিতা ছিল গদ্যশৈলীর, যা পড়ার অভিজ্ঞতা সেই আমার প্রথম। বেশ আকর্ষণ করেছিল ছোট আকারের কবিতাগুলো—ভাষা এবং বিষয়ের জন্য।
পরে আরও কয়েকজন আধুনিক কবির বই কিনে লিখে ফেলি—সাম্প্রতিক আধুনিক কবিতা নামে একটি প্রবন্ধ, যা ছাপা হয় ঢাকা কলেজের সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা আমাকে এরপর খুব আকর্ষণ করেনি, ঝোঁক বেড়েছে গল্প-উপন্যাসের প্রতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পকলা ও সিনেমাবিষয়ক বই। নিউমার্কেটের উত্তর দিকে মহিউদ্দিন অ্যান্ড সন্স নামের বইয়ের দোকানে কিনেছি জন স্টেইনবেক, এরস্কিন কল্ডওয়েল, জেমস টি ফ্যারেল, শেরউড অ্যান্ডারসন, আয়ান র্যান্ড—এই সব আমেরিকান লেখকের উপন্যাস। ড্রয়িংস অব ওল্ড মাস্টার্স আর হার্বাট রিডের লেখা শিল্পের ওপর দুটি বই সেই দোকান থেকে কেনা। সমারসেট মমের ডায়েরি আ রাইটার্স নোটবুকও একই দোকানে পেয়ে যাই। বইটি গল্প-উপন্যাস লেখার উপকরণের সংকলন, যা নতুন লেখকের বেশ কাজে লাগার মতো। এখন মনে হয়, সে সময়েই লেখক হওয়ার একটা বাসনা আমার মধ্যে অবচেতনে ছিল। তাই বইটি কিনেছিলাম। এই বইগুলো সবই আমার সংগ্রহে এখনো আছে। পুরোনো প্রেমিকাদের মধ্যে এরাই পুরোভাগে। নিউমার্কেটের বাইরে আরেকটি প্রিয় রঁদেভ্যু ছিল আমার, স্টেডিয়ামের কাছে ম্যারিয়েটা নামে ছোট আকারে বইয়ের দোকান। বেশ রুচিশীল ছিল সেই দোকানের মালিক। সেখানে পাওয়া যেত মননশীল অনেক বই। ওই দোকান থেকেই কিনি কমলকুমার মজুমদারের গল্পসংগ্রহ, সুহাসিনীর পমেটম, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী আর বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের গল্পগ্রন্থ বিশাল ক্রোধ। খুব সম্ভবত সেই দোকানেই পাই সৈয়দ শামসুল হকের লেখা প্রথম বই তাস আর হাসান আজিজুল হকের আত্মজা ও একটি করবী গাছ। শওকত আলীর পিঙ্গল আকাশও কি সেখান থেকে কেনা? কিংবা হাসান হাফিজুর রহমানের আরো দুটি মৃত্যু?
স্টেডিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমরা যেতাম প্রভিন্সিয়াল রেস্টুরেন্টে আড্ডা দিতে। ফিরে আসতাম ম্যারিয়েটা থেকে পছন্দের বই কিনে। এই সব বইয়ের দোকানের মতো একাধিকবার গিয়েছি এমন ছিল না বইঘর নামে মেডিকেল কলেজের পাশে ছাপরায় তৈরি দোকানটি। কিন্তু ওই দোকান থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত বিখ্যাত একুশে ফেব্রুয়ারী নামের সংকলন, যেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আলাউদ্দিন আল আজাদ এবং আরও কয়েকজনের অবিস্মরণীয় একগুচ্ছ কবিতা। সাদামাটা দেখতে বইটির গুরুত্ব বৃদ্ধি করেছিল সেই সময়ের তরুণ শিল্পী মুর্তজা বশীরের অনেকগুলো উডকাট ছবি, যার বিষয় ছিল স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বইটি আমার সংগ্রহে এখনো আছে এবং মাঝেমধ্যে যখন হাতে নিই, রোমাঞ্চ জেগে ওঠে। বই তো নয়, যেন ছিল বিপ্লবের ইশতেহার, যৌবনের অপ্রতিরোধ্য জলতরঙ্গ।
১৯৫৪ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত আরও দেশি-বিদেশি লেখকের বই পড়েছি এবং কিনে সংগ্রহে রেখেছি। যেমন জাঁ পল সার্ত্রে, আলবেয়ার কামু, আঁদ্রে জিদ এবং টমাস মানের বই। জাঁ পল সার্ত্রের ট্রিলজি এখনো সংগ্রহে আছে। অন্য বইগুলো খুঁজে পাই না। ১৯৬০-এর ডিসেম্বরে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনে পড়ার জন্য সিয়াটল শহরে গিয়ে ক্যাম্পাসে থিতু হয়েই বইয়ের দোকানের সন্ধানে বের হই। ইউনিভার্সিটি ওয়ে নামের রাস্তায় ইউনিভার্সিটি বুক স্টোর আকারে বিশাল কিন্তু ভেতরে কেবল পাঠ্যপুস্তকই বিক্রি হয়; সেই সঙ্গে মিকি মাউস আর পিনাটস-জাতীয় কমিকস। ঘুরতে ঘুরতে একই রাস্তার পাশে ছোট গলির মাথায় আবিষ্কার করি বুকওয়ার্ম নামে পুরোনো বইয়ের এক দোকান। ভেতরটা অন্ধকার। ঢোকার অনেকক্ষণ পর চোখে পড়ে এক কোণে বসে আছেন পক্বকেশ এক প্রৌঢ়া। তাঁর চারদিকে কাঠের আলমারির তাক পুরোনো বইয়ে ভর্তি। বেশ সোঁদা গন্ধ পাওয়া যায় পুরোনো বইগুলো থেকে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাই আনতোয়ান দ্য সাঁ জু পেরির লেখা উইন্ডস, স্যান্ড অ্যান্ড দ্য স্টার আর ফ্লাইট টু আরাস। বই দুটির সমালোচনা পড়েছিলাম ঢাকায়, রঞ্জনের বইয়ের বদলে বইটিতে। তারপর থেকেই এই লেখকের প্রতি আকর্ষণ জন্মায় এবং তাঁর বই কবে এবং কোথায় পাব—এ কথা ভাবি। খুব অল্প দামে বই দুটি কিনে ফিরে আসি ডরমিটরিতে। বুকওয়ার্মে আমার যাওয়া-আসা প্রায় নিয়মিত হয়ে যায়। সেখান থেকেই কিনি আঁদ্রে জিদের দুই খণ্ডের জার্নাল, জে ডি স্যালিঞ্জারের বেস্ট সেলার ক্যাচার ইন দ্য রাই, নর্মান মেইলারের অ্যাডভারটাইজমেন্ট ফর মাইসেলফ, জেমস বল্ডউইনের গো, টেল ইট টু দ্য মাউন্টেন, সিনক্লেয়ার লুইয়ের মেইন স্ট্রিট এবং আরও কয়েকজনের বই। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তখনো পুরোনো হননি, যে জন্য তাঁর বই কিনতে হলো ইউনিভার্সিটি বুক স্টোর থেকে। সেই দোকানে আমাকে বিস্মিত করে র্যাকে দেখা গেল খুশবন্ত সিংয়ের ট্রেন টু পাকিস্তান। যাহোক, ইউনিভার্সিটি বুক স্টোর রঁদেভ্যু হিসেবে বুকওয়ার্মের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারল না। সময়-অসময়ে সেই অন্ধকার ঘরের পুরোনো বইয়ের স্তূপ দেখতেই গিয়েছি বহুদিন।
ছুটিতে এক মাস ছিলাম সান ফ্রান্সিসকো শহরের বার্কলে ক্যাম্পাসে। সেখানে অলডুস হাক্সলে পাবলিক লেকচার শোনার পর ইউনিভার্সিটির বুক স্টোর থেকে কিনি দ্য ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড। কিন্তু সেই সময় আমার রঁদেভ্যু ছিল মেরিন কাউন্টিতে সসালিটে নামের এলাকার সিটি লাইট বুক স্টোর। দোকানটির মালিক ছিলেন বিট কবি লরেন্স ফারলেংঘেটি। সেখান থেকে কিনি বিট জেনারেশনের প্রধান লেখক জ্যাক ক্যারুয়াকের অন দ্য রোডসহ অন্যান্য বই। এই দোকানেই পাই ডিলান টমাসের একমাত্র গল্পগ্রন্থ অ্যাডভেঞ্চারস ইন দ্য স্কিন ট্রেড। কবি হলেও তাঁর গল্প লেখার হাত ছিল পোক্ত। একই দোকান থেকে আরও কিনি উইলিয়াম বারোজের দ্য নেকেড লাঞ্চ এবং দ্য টিকিট দ্যাট এক্সপ্লোডেড এবং হেনরি মিলারের বিতর্কিত বই ট্রপিক অব ক্যানসার। আগে নাম জানা ছিল না কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে শুনেছি ট্রুম্যান ক্যাপোটের খ্যাতি। যে কারণে তাঁর দুই গল্পগ্রন্থ আদার ভয়েসেস, আদার রুম (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কি এই বইটি পড়েই তাঁর গল্পের বইয়ের নামকরণ করেন?) আর গ্রাস হার্প সঙ্গে সঙ্গে কিনে ফেলি। যে এক মাস ছিলাম সান ফ্রান্সিসকোতে, বেশ কয়েকবার গিয়েছি সিটি লাইট বুক স্টোরে। এটিও আমার অন্যতম রঁদেভ্যু, এর স্মৃতি এখনো অটুট।
আমেরিকা থেকে লন্ডনে গিয়ে প্রবাসী হই দুবছরের জন্য। সে সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান বলে খ্যাত ফয়েলস থেকে কিনি অ্যাংরি ইয়াংম্যান জেনারেশনের অনেক লেখকের বই। এখান থেকেই পাই আয়োনেস্কো, বেকেটসহ অ্যাবসার্ড নাট্যকারদের নাটক। অনেকবার গিয়েছি ফয়েলসে। এরপর তার সামনে খুলেছে ওয়াটারস্টোন নামের বইয়ের দোকান। এখান থেকে কিনেছি অ্যালেন বোটনের আর্ট অব ট্রাভেল, কাফকার মেটামরফোসিস, ফরাসি নব-রোমান্সের মুখপাত্র অ্যালে রব গ্রিলের জেলাসিসহ কয়েকটি উপন্যাস, ওয়ালেস ফাওলির অ্যাজ অব সুররিয়ালিজম এবং পল থেরো ও জান মারিসের একাধিক ভ্রমণকাহিনি।
১৯৬৪-তে ঢাকায় ফিরে আসার পরও মাঝেমধ্যে যখন লন্ডন গিয়েছি, এই দুটি দোকানে যাওয়া ছিল অবধারিত। কাজুও ইশিগুরু যে বছর রিমেইন্স অব দ্য ডের জন্য বুকার পুরস্কার পেলেন, তার আগেই বইটিসহ তাঁর অন্য দুটি উপন্যাস ওয়াটারস্টোন থেকে কিনি আমি। কিছুদিন পর বুকস একসেট্রা নামের আরেকটা বইয়ের দোকান খুলেছিল তার পাশে। সেই দোকানও আমার রঁদেভ্যু হয়েছিল, যখনই লন্ডনে গিয়েছি। ডব্লিউ এইচ স্মিথ খুব খানদানি না হলেও পুরোনো বইয়ের দোকান হিসেবে খ্যাত ছিল। হিতরো এয়ারপোর্টে এর শাখা থেকে বেশ কিছু বই কেনা হয় ট্রানজিট করার সময়।
আমেরিকাতে পরে যখন গিয়েছি, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে বর্ডারের দোকানে যাওয়া ছিল প্রায় কর্তব্যের মতো। ১৯৬৮-তে করাচিতে চাকরি উপলক্ষে যাওয়ার পর বন্দর রোডে ব্রিটিশ আমলের বইয়ের দোকান টমাস অ্যান্ড টমাস থেকে কিনি মার্কুইস দ্য সাদের ইউজেনি গল্পগ্রন্থ, ইভতেশেঙ্কোর কবিতার বই এবং আত্মজীবনী আ প্রিকশাস চাইল্ডহুড। দ্য কনটেম্পরারি সিনেবার বইটিও সেই দোকান থেকে কেনা।
ঢাকায় আশির দশক থেকে যেসব বইয়ের দোকান আমার রঁদেভ্যু হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখ করতে হয় আজিজ সুপার মার্কেটে পাঠক সমাবেশ, একুশে ও তক্ষশিলা। এর মধ্যে পাঠক সমাবেশ থেকেই ইংরেজি ও বাংলা বই কেনা হয় সবচেয়ে বেশি। এরা আমার নতুন প্রেমিকা।
রবীন্দ্রনাথের বই কেনার জন্য তক্ষশিলার চেয়ে আর ভালো দোকান হতে পারে না। এই দোকানের মালিক একজন নারী, তাঁর আন্তরিকতা, বই সম্বন্ধে জ্ঞান এবং ক্রেতার প্রতি সৌজন্যবোধ মুগ্ধ করার মতো। একুশে থেকে নন্দনতত্ত্বসহ অন্যান্য বিষয়ের ওপর অনেক বই কিনেছি। নাম করতে গেলে তালিকা দীর্ঘ হবে। এখন একুশে কিনে নিয়ে সেখানে খোলা হয়েছে প্রথমা নামের বইয়ের দোকান। এই নামে প্রকাশনা সংস্থাও আছে, যেখান থেকে মতিউর রহমানের নেওয়া সাক্ষাৎকারভিত্তিক বই, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই এবং সৈয়দ আবুল মকসুদের গবেষণামূলক বইগুলো প্রকাশিত হয়ে প্রশংসা অর্জন করেছে। তবে সেখানে আগের মতো সিনেমা আর আর্টের ওপর বই এখন বেশি দেখা যায় না।
২০০০ সালের পর গুলশান আর ধানমন্ডিতে একসেট্রা নামে ঝকমকে আধুনিক একটা বইয়ের দোকান হয়েছিল। পাশেই ছিল কফি ওয়ার্ল্ড। সেই দোকানটিও আমার প্রিয় রঁদেভ্যু হয়েছিল। অনেক নতুন প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হয়েছে সেখানে। দুঃখের বিষয়, কয়েক বছর পর দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক দিন আগে প্রায় একই জায়গায় কফি ওয়ার্ল্ডের পেছনে লালমাটিয়ায় তিনতলা দালানে খুলেছে বেঙ্গল বইয়ের দোকান। এই দোকানটি আমার মতো বইপ্রেমীদের রঁদেভ্যু হবে, এতে সন্দেহ নেই।
[প্রথম আলো থেকে]