রমজানে রাসুল যা করেছেন

আপডেট: 02:14:30 30/05/2018



img

এম মোহাম্মদ : মাগফেরাত অর্থ মার্জনা। পাপাসক্ত মানবজীবনের পরম কাঙ্ক্ষিত বিষয় ক্ষমা বা মার্জনা প্রাপ্তি। আর এই দারুণ খোশখবর নিয়ে প্রতিবছর আমাদের সামনে সমাগত হয় পবিত্র রমজান। সঙ্গে তার রহমত ও নাজাতের অফুরন্ত ভাণ্ডার। মুমিন জীবনের উৎকর্ষ সাধনের জন্য বছরের শ্রেষ্ঠতম সময় এই মাসটুকু। মুমিন জীবন কীভাবে গঠিত হবে তার একটি অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সম্পর্কে কোরআনে বলা হচ্ছে, ‘তোমাদের জন্য রাসুলের [সা.] চরিত্রে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ [সুরা আহযাব:২১]
আমরা এখানে রমজানে রাসুল [সা.] যা যা করেছেন, তা সংক্ষেপে আলোচনা করছি। রাসুল মোহাম্মদ [সা.] এ মাসে যা করেছেন তাই করা আমাদের উচিত। তার ফলে উত্তম চরিত্রের আদর্শ আমাদের রোজাকে আলোকিত করবে। কেননা, তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে উন্নত চারিত্রিক গুণের পরিপূর্ণতার জন্য পাঠানো হয়েছে।’
তিনি রমজানে বেশি বেশি ও বহুমুখী এবাদত করতেন। রমজানে জিবরিল [আ.] রাসুলকে [সা.] কোরআন শিক্ষা দিতেন। এরপর তিনি খুব বেশি দান করতেন। এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্বাস [রা.] থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল [সা.] লোকদের মধ্যে সর্বাধিক দাতা ছিলেন। কিন্তু রমজানে যখন জিবরিল [আ.] তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং কোরআন শিক্ষা দেন, তখন তিনি আরো বেশি দানশীল হয়ে উঠতেন। জিবরিল [আ.] রমজানে প্রত্যেক রাতে তাকে কোরআন শিক্ষা দিতেন। তার সাথে সাক্ষাতের পর রাসুল [সা.] প্রবহমান বাতাসের মতো দানশীল হয়ে উঠতেন।’
এই মাসে তিনি সর্বাধিক কোরআন অধ্যয়ন করতেন। এছাড়াও তিনি তারাবি ও তাহাজ্জুদে বেশি বেশি আয়াত ও সুরা পাঠ করতেন। লোকদেরও কোরআনের সুরা ও বিভিন্ন অংশ শিক্ষা দিতেন। লোকদের দিয়ে ওহি লেখানোর সময়ও তাকে কোরআন পড়তে হতো। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন নামাজ ও নফল নামাজে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। এমনিতেও কোরআন তেলাওয়াত করতেন।
তিনি রমজানে এমন কিছু অতিরিক্ত এবাদত করতেন যা অন্য কোনো মাসে করতেন না। তিনি কখনো বিনা বিরতিতে এবং ইফতার ও সেহরি ছাড়াই রোজা রাখতেন। এটাকে আরবিতে ‘সাওমে বিছাল’ বলে। যার বাংলা বিরতিহীন রোজা। দিন ও রাতে এবাদতের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করার উদ্দেশ্যেই তিনি অবিরাম রোজা রাখতেন। তবে তিনি এই প্রকারের রোজা রাখতে সাহাবি ও তার উম্মাতদের নিষেধ করেছেন। সাহাবিদের এসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের মতো নই। আমি আমার প্রভুর কাছে রাতযাপন করি। তিনি আমাকে খাওয়ান ও পান করান।’ [বুখারি, মুসলিম ও মোয়াত্তায়ে মালেক]
রাসুল [সা.] রমজানের রাতকে নামাজসহ অন্যান্য এবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করতেন। তিনি ছিলেন সর্বাধিক জিকির ও এবাদতকারী। রাতে তিনি আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা, দয়া, রহমত ও বরকত কামনা করতেন, মুনাজাত করতেন, কান্নাকাটি করতেন, কল্যাণ, হেদায়াত ও বিজয়ের জন্য দোয়া করতেন। নামাজে সুদীর্ঘ কেরাত পাঠ করতেন এবং রুকু সেজদাহ অত্যধিক দীর্ঘ করতেন। নির্ধারিত এবাদতকে পর্যাপ্ত মনে করতেন না। তাই বেশি বেশি এবাদতের এই প্রাণপণ প্রচেষ্টা।
কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ো, এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত করণীয়। তোমার রব তোমাকে সম্মানিত মর্যাদায় পৌঁছাতে পারেন।’
তাহাজ্জুদ ছাড়াও তিনি রমজানে তারাবির নামাজ অতিরিক্ত পড়তেন। এভাবে, বলতে গেলে গোটা রাতই নামাজে কেটে যেত। সঙ্গে অন্যান্য এবাদত তো ছিলই। দিনে তার ব্যস্ততা ছিল অন্য রকম। তিনি দাওয়াত ও তাবলিগ, ওয়াজ নসিহত, শিক্ষাদান ও ফতোয়ার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। লোকদের সদোপদেশ দেওয়া এবং তাদের পরিশুদ্ধির জন্য সময় ব্যয় করতেন।
রাসুল [সা.] শুকনো পাকা খেজুর কিংবা গাছপাকা তাজা খেজুর অথবা পানি দিয়ে ইফতার করতেন। যেহেতু ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয় তাই তিনি দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক কল্যাণের জন্য ইফতারের সময় দোয়া করতেন।
রমজানে দূরবর্তী স্থানে সফর করলে তিনি রোজা ভেঙে ফেলতেন। কেননা, মুসাফিরের জন্য রোজা ভাঙা জায়েজ আছে। তিনি নিজে দুই রমজানে রোজা ভেঙেছেন।
রাসুল [সা.] সোবহে সাদিকের পর ফরজ গোসল করে রোজা রাখতেন। অবশ্য সোবহে সাদিকের আগেই তিনি সেহরি খেয়ে নিতেন। সোবহে সাদিকের পর খানা নিষেধ, ফরজ গোসল নিষেধ নয়। তিনি রমজানে রোজা অবস্থায় কোনো কোনো স্ত্রীকে চুমু খেতেন। তিনি বলেছেন, ভুলে কেউ খেলে বা পান করলে রোজা ভাঙে না। কেননা, খোদা তাকে খাওয়ান ও পান করান।
রাসুল [সা.] রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করেছেন। এছাড়াও হাদিসে আরো বিভিন্ন কল্যাণকর কাজের কথা বর্ণিত আছে যা তিনি রমজান মাসে করতেন। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ ও তাবে তাবেঈরা রমজানসহ সব কাজে তাকেই অনুসরণ করেছেন। তাই আমাদেরও উচিত রমজানে তাকে অনুসরণ করা।