রস-গুড়ের সুবাসে মাতোয়ারা জনপদ

আপডেট: 01:34:33 03/01/2017



img
img

হাফিজুল নিলু, নড়াইল : নড়াইলে প্রকৃতিতে শীত জেঁকে বসায় খেজুরগাছ থেকে মধুরস আহরণ শুরু হয়েছে। বৃহত্তর যশোরাঞ্চলের ঐহিত্য খেজুররস ঘিরে গ্রামীণ জনপদে শুরু হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
রসের পাশাপাশি নড়াইলের হাটবাজারে বিক্রি হচ্ছে খেজুরগুড়ের পাটালি। গুড়ের ম ম গন্ধে ভরপুর হাটবাজারগুলো। এই রস ও গুড় দিয়ে পাড়া-মহল্লায় তৈরি হচ্ছে নানা প্রকার পিঠা-পায়েস।
এদিকে খেজুররস ও গুড়ের ঐহিত্য বাঁচিয়ে রাখতে পথে-প্রান্তরে, মাঠে-ঘাটে বেশি করে খেজুরগাছ রোপণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন গাছি, পরিবেশবিদ ও প্রকৃতিপ্রেমীরা। এক্ষেত্রে খেজুরগাছ রোপণে গাছি ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘কৃষি প্রণোদনা’ চালুর দাবি করেছেন সবাই।
লোহাগড়া উপজেলার আমাদা গ্রামের গাছি জামাল শেখ (৫৮) জানান, এ বছর ৮০টি খেজুর গাছ তুলেছেন (রস উপযোগী) তিনি। কোনো গাছে রস আসতে শুরু করেছে, আবার কোনো গাছে বুথি (গাছ তোলার দ্বিতীয় পর্ব) টেনে নলি দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তিনি আরো জানান, খেজুর গাছ থেকে সপ্তাহে সাধারণত একবার রস বের করা হয়।
গাছের অবস্থা বুঝে (গাছ শক্ত হলে) সপ্তাহে পরপর দুইদিনও রস বের করেন গাছিরা। আর অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি থেকে ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত খেজুররস সংগ্রহ করা যায়।
সদর উপজেলার চারিখাদা গ্রামের হালিম মোল্যা (৪২) বলেন, ‘কোনো প্রকার ভেজাল ছাড়াই আমরা বাড়িতে গুড় তৈরি করি। প্রতি কেজি পাটালির দাম রাখা হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। আর এক ঠিলে (ভাড়) রস বিক্রি করি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা দরে।’
উড়ানী গ্রামের রাজ্জাক মোল্যা (৪৪) জানান, খেজুর রস ও শুকনো নারকেল (ঝুনা) একসঙ্গে জ্বালিয়ে ‘নারকেল-পাটালি’ তৈরি করা হয়। এই নারকেল-পাটালি স্বাদে অতুলনীয়। প্রতিকেজির দাম ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা।
একই গ্রামের ছিয়ারন বেগম (৫৫) বলেন, ‘রস দিয়ে পাটালি, নারকেল-পাটালি, জমাটবাঁধা গুড় ও পাতলা গুড় তৈরি করি। এসব গুড় বাড়ি থেকেই কিনে নেন ক্রেতারা। অনেক সময় বাজারেও বিক্রি করা হয়। প্রায় দুই ভাড় রস দিয়ে এক কেজি গুড় তৈরি করা যায়।’
কালিয়ার রঘুনাথপুর গ্রামের গাছি শওকত শেখ (৪৫) ও বাসার বিশ্বাস (৪৭) জানান, জ্বালানির অভাব এবং কাঁচা রসের চাহিদা থাকায় গুড়ের চেয়ে রস বিক্রি করা লাভ বেশি। তাই রস বিক্রি করেন তারা।
রূপগঞ্জ ও লোহাগড়ার বাজারের কয়েকজন গুড় বিক্রেতা জানান, স্থানীয় গাছিদের খেজুরগুড় ছাড়াও যশোর ও উত্তরাঞ্চলের গুড় নড়াইলের হাটবাজারগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। গুড়ের ম ম গন্ধে ভরপুর হাটবাজারগুলো। বাজারে পাটালি ও জমাটবাঁধা গুড়ের চাহিদা বেশি।
তারা বলছেন, প্রতিদিন ভোরে গাছিদের কাছ থেকে চাহিদামতো রস কিনে নিচ্ছেন ক্রেতারা।
কালনাঘাটের গুড় বিক্রেতা জাকির হোসেন বলেন, ‘বাজারের গুড় চিনিমিশ্রিত কি-না, তা সহজে বোঝা যায় না। তাই বিক্রির সময় শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।’
ক্রেতারা জানান, দাম একটু বেশি হলেও ভালো মানের রস ও গুড় কিনতে চান তারা। যে রস ও গুড়ে চিনি মিশ্রিত থাকবে না।
লোহাগড়ার ঈশানগাতী গ্রামের আবেদা সুলতানা ও নড়াইল পৌর এলাকার মহিষখোলা এলাকার রুমা খাতুন জানান, খেজুর রস ও গুড় দিয়ে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রসচিতই, পুলি, ভাপা, হাতসেমাই পিঠা এবং পায়েস তৈরি হচ্ছে।
দুধভাতের সঙ্গেও অনেকে গুড় খেয়ে থাকেন। রসের বেশি প্রয়োজন হয় রসচিতই ও পায়েস তৈরিতে।
এছাড়া শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ শীতের সকালে খেজুররসের স্বাদ নিচ্ছেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাসের আশংকায় কাঁচা রস পানের ক্ষেত্রে সর্তক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
মওসুমি পিঠা বিক্রেতারা জানান, শহরের বিভিন্ন গলিপথ, স্ট্যান্ডসহ লোকালয়ে চিতই, পুলি ও ভাপাপিঠার চাহিদা রয়েছে।
এদিকে, আগের তুলনায় খেজুরগাছের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে গাছির সংখ্যাও।
খেজুরগাছ মালিক কালিয়ার রঘুনাথপুরের সাজ্জাদ হোসেন জানান, গাছির অভাবে তাদের ২৫টি গাছ থেকে দুই বছর রস আহরণ সম্ভব হচ্ছে না। অথচ, সাত বছর আগেও তিনি চাহিদা মিটিয়ে রস বিক্রি করেছেন।
তিনি আরো জানান, কয়েক বছর গাছ কাটা না (তোলা) হলে ওই গাছ থেকে পরে রস বের করতে গাছিদের অনেক বেগ পেতে হয়।
নোয়াপাড়া গ্রামের জাহিদ হোসেন জানান, একটি খেজুরগাছ তুলতে (রস উপযোগী করতে) গাছের ধরন অনুযায়ী গাছিকে দিতে হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে। আর রস আহরণের দিন গাছিকে প্রতি ভাড়ের (মাটির কলস) অর্ধেক রস দেওয়ার নিয়ম তো আছেই।
মাইজপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী বাদশা আলমগীর বলেন, ‘ইটভাটায় দাহ্য কাঠ হিসেবে খেজুরগাছের চাহিদা থাকায় কাঠব্যবসায়ী এবং ভাটামালিকরা খেজুরগাছের দিকেই বেশি নজর দেন। ছোট ছোট খ- করে (আঞ্চলিক ভাষায় গুল) ইটভাটায় খেজুরগাছ দেওয়া হয়। এতে আশংকাজনক হারে খেজুরগাছ কমেছে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইল জেলা শাখার আহ্বায়ক খন্দকার শওকত বলেন, ‘বিগত ১৫ বছরে ব্যাপক হারে ইটভাটায় খেজুরগাছের অপব্যবহার হয়েছে। নির্বিচারে খেজুরগাছ কাটা হলেও সেই তুলনায় বা তার চেয়ে বেশি খেজুরগাছ রোপণ করা হয়নি।’
‘এ কারণে গ্রামাঞ্চলের পথে-প্রান্তরে এবং বিলের ধারে আগের মতো খেজুরগাছের সারি চোখে পড়ে না। ইটভাটায় খেজুরগাছের অপব্যবহার বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ দরকার।’
তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে খেজুর গাছের সংখ্যা কমতে থাকলে এক সময় হয়তো খেজুররস ও গুড় অতীত হয়ে যাবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইলের উপ-পরিচালক শেখ আমিনুল হক বলেন, ‘এ জেলায় ১০০ হেক্টর জমিতে খেজুরগাছ রয়েছে। এ বছর ৯১২ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। রস ও গুড় গাছিদের জন্য লাভজনক। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সড়কসহ জমিতে খেজুরগাছ লাগানোর জন্য কৃষকদের আগ্রহ সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
তবে, জেলায় কতটি খেজুর গাছ রয়েছে; সেই পরিসংখ্যান নেই কৃষি বিভাগের। এদিকে গাছিরা জানান, শীত যত বেশি জেঁকে বসবে, তত বেশি রস সংগ্রহ করা যাবে। এক্ষেত্রে রস ও গুড় বিক্রি করে আরো বেশি লাভবান হবেন বলে আশা করছেন গাছিরা।

আরও পড়ুন