রাখাইনে সেনার ওপর ফের রোহিঙ্গাদের হামলা

আপডেট: 01:44:40 08/01/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের একটি সংগঠন ফের দেশটির সশস্ত্রবাহিনীর ওপর হামলা করেছে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। হামলাকারীদের 'রোহিঙ্গা জঙ্গি' উল্লেখ করে বিবিসি এই খবর দিয়েছে।
এর আগে গত আগস্টে তারা নিরাপত্তা বাহিনীর অনেকগুলো ঘাঁটিতে হামলা করেছিল। প্রতিক্রিয়ায় সেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন শুরু করে সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ, আগুনের মুখে সেদেশ থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন প্রায় সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু।
বিবিসির খবরে বলা হয়, শুক্রবার উত্তর রাখাইনের মংডু এলাকার একটি গ্রামে চালানো চোরাগোপ্তা এই হামলায় মোট তিনজন আহত হয়েছে বলে আরসা দাবি করছে। কৃতিত্ব দাবি করলেও তারা এই আক্রমণের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরসা বলছে, বর্মী সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখায় সামরিক বাহিনীর ওপর তারা সবশেষ এই আক্রমণটি চালিয়েছে।

কেন এই হামলা
আরসা বলছে, দেশটির নেত্রী অং সান সু চি রাখাইনে সামরিক অভিযান বন্ধের আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নিপীড়ন নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।
আজ রোববার আরসার এক বিবৃতিতে এই হামলার দাবি করে সংগঠনটি সেনাবাহিনীর ওপর আরো হামলা চালানোরও ঘোষণা দিয়েছে।
রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এধরনের হামলা চালানো ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।
রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা বলছে, রাষ্ট্রীয় সমর্থনে রোহিঙ্গাদের ওপর যে সন্ত্রাস চলছে তার বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।
আরসা বলছে, বর্মী সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। এই অভিযোগ অস্বীকার করছে সেনাবাহিনী। বর্মী সামরিক বাহিনীর মতে আরসা একটি ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠন।

আরসার তৎপরতা
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই আরসার তৎপরতা সম্পর্কে খুব কমই শোনা যাচ্ছিল। আগস্ট মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বেশ কয়েকটি হামলার পর এই বিদ্রোহীরা খুব একটা তৎপর ছিল না। তাদের চালানো হামলার কথাও খুব একটা শোনা যায়নি। শুধু তাই নয়, কয়েক সপ্তাহ আগে আরসার পক্ষ থেকে একতরফাভাবে অস্ত্র-বিরতির কথাও ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত অক্টোবর মাসে।
বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা জনাথন হেড বলছেন, আগস্টের পর রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার কারণে আরসা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এবং তখনই তাদের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।
তবে গত শুক্রবার সৈন্যদের বহনকারী গাড়িতে হামলা চালানোর ঘটনা প্রমাণ করছে যে এখনো কিছু রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা সেখানে রয়ে গেছে।

কীভাবে হামলা
আরসার পক্ষ থেকে এব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। রাখাইনে সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার কারণে ঘটনার নিরপেক্ষ বর্ণনাও পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, একদল সশস্ত্র জঙ্গি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রোগীদের বহনকারী সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে হামলা চালায়। এতে দুই সৈন্য এবং একজন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়।
মিয়ানমার সরকারের তরফ থেকে এদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও দেশটির সেনাবাহিনী তাদেরকে আরসা বলে উল্লেখ করেছে।
কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, সেখানে বোমা হামলাও হয়েছে। আবার কোথাও বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর গাড়িটি ল্যান্ডমাইনের ওপর পড়ে গেলে বোমাটি বিস্ফোরিত হয় এবং তখন একদল সশস্ত্র জঙ্গি তাদের ওপর হামলা চালায়।
গত আগস্ট মাসে বর্মী নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর এ ধরনের হামলার জেরেই রাখাইনে সেনাবাহিনীর অভিযান শুরু হয় এবং তারপর সেখান থেকে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।

আরসার শক্তি
আরসার গঠন, এর সদস্য কারা, কীভাবে ও কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে, নেতৃত্বে কারা এবং সর্বোপরি তাদের শক্তিমত্তা সম্পর্কে খুব কমই ধারণা পাওয়া যায়। তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য কী সেটাও খুব একটা পরিষ্কার না।
এক বছরেরও কিছু সময় আগে থেকে এই বাহিনীর বিদ্রোহীরা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ছোট ছোট হামলা চালাতে শুরু করে। এবং তারপর সবচেয়ে বড় হামলাটি চালায় গত আগস্ট মাসে।
আরসার নেতা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত রোহিঙ্গা, যিনি নিজেকে আতা উল্লাহ বলে পরিচয় দিচ্ছেন, গত আগস্ট মাসে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতগুলো ভিডিও পোস্ট করেছেন, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে রোহিঙ্গাদের আত্মরক্ষায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।
আরসার নেতা বলেছেন, সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের হাত থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের রক্ষা করতেই তাদের এই যুদ্ধ। এবং তাদের এই লড়াই বৈধ।

আরো হামলা?
আরসার এই বিবৃতি থেকে এটা স্পষ্ট যে ভবিষ্যতে এধরনের আরো হামলা হতে পারে।
এর ফলে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর তৎপরতা আরো বাড়বে এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতিতে চেষ্টা করবে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমগুলো যেন সেখানে যেতে না পারে।
পরিণতিতে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা আরো কঠিন হয়ে উঠলো।

আরও পড়ুন