রাজাপুরের ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড়

আপডেট: 02:29:31 17/01/2019



img
img

জহর দফাদার : মাঠের ভেতর প্রায় দুই কিলোমিটার সারিবদ্ধভাবে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন হাজার হাজার নারী, পুরুষ আর শিশু। তাদের চোখ পশ্চিম দিকে, যেখান থেকে দৌড়ে আসছে কয়েকটা ঘোড়া। এসব ঘোড়ার মধ্য থেকেই উঠে আসবে প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় স্থান অধিকারী।
বুধবার বিকেলে এমনই দৃশ্য ছিল যশোর সদরের ইছালি ইউনিয়নের রাজাপুর মাঠজুড়ে।
ধান কাটার পর রাজাপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ মাঠ এখন শুকনো খটখটে। আর এই মাঠেই ‘গ্রামবাসী’ আয়োজন করেন তাদের ঐতিহাসিক ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতা।
বুধবার দুপুর থেকেই প্রায় দুই কিমি ফাঁকা মাঠ আস্তে আস্তে পূর্ণ হতে থাকে। একসময় তা হাজার হাজার আবালবৃদ্ধবণিতার মিলনমেলায় রূপ নেয়। মাঠের শেষে রাস্তার ধার ঘেঁষে পসারিরা বসায় তাদের পণ্যের মেলা।
আজ ‘ঘোড়ার দাবড়’ বললেন এই গ্রামের আকবর আলী। তিনিও এসেছেন বিক্রি করতে পিঁয়াজু-চপ। আকবর আলী বলছিলেন, ‘মেয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে, বোন এসেছে স্বামীর ঘর থেকে। আরো আত্মীয়-স্বজন মিলে ১৫ জন এসেছে আজকের এই প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে। বাড়িতে চার কেজি গরুর মাংস কিনে দিয়ে এসেছি। দুপুরের খাবার সেরেই তারা মাঠে আসবে।’
পাশের গ্রাম পদ্মবিলায় অন্তত ৫০ বছর ধরে এই ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা হয়ে আসছে। গত পাঁচ বছর ধরে রাজাপুর গ্রামের এই মাঠে আয়োজন করা হয় প্রতিযোগিতাটি। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে লোকজন আসেন তাদের প্রিয় ঘোড়াটি নিয়ে, প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
কথা হয় অভয়নগরের নাজমুল হক নামে একজন প্রতিযোগীর সঙ্গে। তার ঘোড়ার নাম ‘বিসমিল্লাহ’ ওরফে ‘বুলেট’। দুইবছর আগে এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে ঘোড়াটি কিনেছেন। শখের বশে ঘোড়া পোষেন, বিভিন্ন জেলায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। গত বছর গোপালগঞ্জ ও সাতক্ষীরায় প্রতিযোগিতায় গিয়েছিলেন। তার ঘোড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে।
যশোর-মাগুরা সড়কের পুব পাশে রাজাপুর গ্রামটি। দুপুরের পরেই এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে পসারিরা এসে মেলে ধরেছেন তাদের পণ্যের সমাহার। ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে বিশাল এই গ্রামের মাঠজুড়ে বসে অন্যরকমের আয়োজন। এখানে দেখা গেছে নাগরদোলা; মাত্র পাঁচ টাকায় হাতেটানা এই নাগরদোলায় শিশুদের পাশাপাশি তাদের বড় ভাইবোন এমনকী মা-বাবারা চড়ছেন। রসগোল্লা, বুন্দিয়া, গজা, দানাদার, জিলাপিসহ হরেকরকম মিষ্টি বিক্রি করছেন দোকানিরা। বিক্রি হচ্ছে চটপটি, ফুচকা, হালিম। প্রত্যেকে আলাদা আলাদা স্টল বানিয়ে সেখানে আবার প্লাস্টিকের টুল বসিয়ে দিয়েছেন খরিদ্দারদের জন্যে। বাচ্চাদের জন্যে বাঁশি, প্লাস্টিকের পাখি, হাড়ি-পাতিল, বেলুন। দেদারছে বিক্রি হচ্ছে বাদামভাজা, চানাচুর, পাপরভাজা, মসলাদার পান। চায়ের স্টল রয়েছে অগুণতি।
ঘোড়দৌড় দেখতে এসেছেন গৃহবধূ আমেনা বেগম ও রিনা খাতুন। সঙ্গে তাদের সন্তানাদি। রীনা জানান, বাবার অসুখের খবর পেয়ে এসেছিলেন। গতকালই চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজকের অনুষ্ঠানের জন্যে একদিন বেশি থাকতে হলো। বাচ্চারা খুব করে বলছিল, তাছাড়া নিজেরও ইচ্ছে ছিল ‘ঘোড়ার দাবড়’ দেখার।
রাজাপুর গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ খলিল মোল্যা (৭৫) বলেন, “খুব ছোটবেলা থেকে পদ্মবিলা মাঠে ‘ঘোড়ার দাবড়’ দেখতাম। এই মাঠেও কয়েক বছর ধরে দেখতিছি। আসলে ইডা হলো আমাগের ঐতিহ্য; বাড়ির সবাই মিলে দেখতি আসিছি।”
বিকেলে সাড়ে তিনটার দিকে ঘোড়দৌড় শুরু হয়। মাঠের পশ্চিমপাশ থেকে শুরু হয় দৌড় প্রতিযোগিতা। যশোরের বিভিন্ন উপজেলাসহ ঝিনাইদহ, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়া থেকে এসেছেন ২৫ জন প্রতিযোগী। প্রায় দেড় কিমি দূরত্ব পার হতে হয়েছে প্রতিবার এসব প্রতিযোগীকে। চার রাউন্ড দৌড়শেষে প্রতিযোগীদের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় নির্বাচিত করা হয়।
এবার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে যশোরের অভয়নগর উপজেলার ইলিয়াস সর্দারের ঘোড়া। এরপর আয়োজক গ্রাম রাজাপুরের ফাহিম হন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় হন অভয়নগর উপজেলার শামসু মোল্যা। পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেককে নগদ টাকা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহউদ্দিন শিকদার, বিশেষ অতিথি ইছালি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসএম আফজাল হোসেন এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের সভাপতি আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক মাস্টার রবিউল ইসলাম বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের টাকা তুলে দেন। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সকলের জন্যে সান্ত্বনা পুরস্কারের ব্যবস্থাও ছিল।