রাজ্জাকরা মরেন না

আপডেট: 02:26:10 23/08/2017



img

প্রভাষ আমিন

বছর দুয়েক আগে একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। ভর্তি ছিলেন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। তখন একবার তার মৃত্যুর খবর প্রচারিত হয়েছিল। খবরটি মিথ্যা হওয়ায় সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন।
মৃত্যুর খবর প্রচারিত হলে নাকি আয়ু বাড়ে! তখন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও হৃদয়ের গহীনে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস আটকে ছিল। কারণ নায়করাজ রাজ্জাকের বয়স হয়েছে এবং শরীরও ভালো ছিল না। দুই বছর ধরে আটকে থাকা সেই দীর্ঘশ্বাস কান্না হয়ে এলো ২১ আগস্ট সন্ধ্যায়।
গত ১৩ বছর ধরে ২১ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকের দিন। ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল। শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও মারা যান আইভি রহমানসনহ ২৪ জন। সেই ২১ আগস্টের শোকের সঙ্গে যুক্ত হলো নায়করাজের মহাপ্রয়াণের গভীর বেদনা।
নায়করাজ রাজ্জাক আমার খুব প্রিয়, খুবই প্রিয়। আমাদের যৌবনের নায়ক বলেই কিনা জানি না, আমার কাছে রাজ্জাককেই সবচেয়ে ভালো লাগে। এমনকি উত্তম কুমার, দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন, আমির খানদের কথা মাথায় রেখেও রাজ্জাক আমার প্রিয়। জানি আপনারা হাসাহাসি করছেন, লজ্জার মাথা খেয়ে আমি স্বীকার করছি রাজ্জাকই আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমরা বেড়ে উঠেছি রাজ্জাকের সঙ্গে, রাজ্জাককে দেখে। আমরা ভালোবাসতে শিখেছি রাজ্জাককে দেখে, আমরা বিরহ উপভোগ করেছি রাজ্জাকে।
বাঙালি তরুণের মানস গঠন হয়েছে রাজ্জাকে। তার হাসি ঝড় তুলেছে কোটি তরুণীর হৃদয়ে। ছেলে হয়ে আমি রাজ্জাকের প্রেমে যতটা বুঁদ, আমাদের সময়ের তরুণীদের কথা ভেবে আমার তাদের জন্য মায়া হয়। শুধু আমি নই, আসলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পই বিকশিত হয়েছে রাজ্জাকের সঙ্গে। আমি এখনও অবাক হয়ে ভাবি, এখন থেকে ৫০ বছর আগেও রাজ্জাক যতটা স্মার্ট ছিলেন, এখনও তেমন পাই না কেন। রাজ্জাক আসলে সময়ের অনেক আগে জন্মানো প্রতিভা।
রাজ্জাক পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের টালিগঞ্জ এলাকায় তার জন্ম। ছেলেবেলায় স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার। কিন্তু কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরস্বতী পূজায় মঞ্চনাটকে অভিনয় তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। টালিগঞ্জের ফিল্মপাড়ার কাছেই ছিল রাজ্জাকদের পৈতৃক বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই কানন দেবী, বসন্ত চৌধুরী, ছবি বিশ্বাসদের দেখে দেখে বড় হয়েছেন। তাই রক্তে ঢুকে যায় অভিনয়ের নেশা। ভারতে টুকটাক অভিনয় করলেও তার শুরুটা ঢাকায়। বাবা আকবর হোসেন, মা নিসারুন্নেসার কনিষ্ঠ সন্তান ডানপিটে আব্দুর রাজ্জাক।
রাজ্জাককে শিশু বয়সে রেখেই বাবা-মা মারা যান। ১৯ বছর বয়সেই বিয়ে করেন লক্ষ্মীকে, যিনি ছিলেন রাজ্জাকের জীবনের সত্যিকারের লক্ষ্মী। অনেকবার রাজ্জাক বলেছেন, তার জীবনে লক্ষ্মী ছিলেন বলেই তিনি নায়করাজ হতে পেরেছেন। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় স্ত্রী এবং বড় ছেলে বাপ্পারাজকে নিয়ে শূন্য হাতে ঢাকায় চলে আসেন রাজ্জাক। হাত শূন্য, পরিবারের ভরণপোষণের চাপ, আর বুক ভরা স্বপ্ন নায়ক হওয়ার। আবদুল জব্বার খান তাকে চাকরি দেন ইকবাল ফিল্মসে।
সেখানে কাজ করেছেন কামাল আহমেদের সহকারী হিসেবে। ‘১৩ ফেকু ওয়াস্তাগার লেন’সহ দুয়েকটি চলচ্চিত্রে টুকটাক অভিনয় করলেও তার যাত্রা শুরু জহির রায়হানের হাত ধরে ১৯৬৬ সালে সুচন্দার বিপরীতে ‘বেহুলা’ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। ২২ বছরের এক উদ্বাস্তু যুবকের নায়করাজ হয়ে ওঠার গল্পটি রূপকথার মতই। তার জীবনের গল্পে দারুণ সিনেমায়। পরিশ্রম করলে আর লক্ষ্যে সৎ ও অবিচল থাকলে যে সাফল্য আসবেই; রাজ্জাকের এই গল্প যুগে-যুগে অনুপ্রাণিত করবে মানুষকে। শুধু সিনেমার রুপালি পর্দায় নয়, বাস্তবেও তিনি আইডল হওয়ার মতোই। সিনেমার রঙিন জগৎ তার মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারেনি। স্ত্রী লক্ষ্মীর ছায়ায় ঢাকা পাঁচ সন্তানের সুখী পরিবারের অভিভাবক রাজ্জাক, তেমনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের অভিভাবকও।
তবে তার আক্ষেপ ছিল শেষ বয়সে চলচ্চিত্র পরিবারটাকে আর সুখী দেখে যেতে পারেননি। এখন বাংলা চলচ্চিত্র প্রায় ধ্বংসের মুখে। বাংলা চলচ্চিত্রের এখন যে অবস্থা, তাতে রাজ্জাকদের আর বেঁচে থেকে লাভ নেই। চলচ্চিত্র শিল্পের লোকজনই নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়ে মৃতপ্রায় এই শিল্পের মৃত্যু ত্বরান্বিত করছেন। কদিন আগে এক অর্বাচীন পরিচালক চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের অবদান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। নাম উল্লেখ করে এই উল্লুককে আমি বাড়তি গুরুত্ব দিতে চাই না। তবে আমার ধারণা যারা অগ্রজদের সম্মান দিতে জানেন না, তাদের ধ্বংস ঠেকানোর সাধ্য কারও নেই।
আমরা সবাই নিজেদের সময়টাকেই সেরা মনে করি। আমরা যারা মধ্যবয়সে, তারা নিজেদের কৈশোর, যৌবনকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করি। এই সত্যটুকু মনে রেখেও আমি বলছি, বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা সময়টা আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। নায়করাজ রাজ্জাক সেই স্বর্ণালি সময়ের অন্যতম নির্মাতা। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ দিয়ে যার শুরু, পরের ৫০ বছর তিনিই ছিলেন অবিসংবাদিত রাজা। হিন্দি চলচ্চিত্রে দিলীপ কুমারের, কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের যতটা প্রভাব; বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের প্রভাব তারচেয়ে কম নয়, বরং বেশিই হবে। কারণ রাজ্জাককে একাই গড়তে হয়েছে, টেনে তুলতে হয়েছে।
উত্তম-সুচিত্রার পাশে দাপটে সমুজ্জ্বল রাজ্জাক-কবরী। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে রাজ্জাকের নাম। ৬৯’র টালমাটাল সময়ে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে রাজপথ থেকে টেনে নিয়েছিল রুপালি পর্দায়। সেই ছবিতে প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ‘আমার সোনার বাংলা…’ যা পরে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর একজন রাজ্জাক। রোমান্টিক নায়কের ধারণাটা পূর্ণতা পেয়েছিল রাজ্জাকে। আবার ৭৩ সালে ‘রংবাজ’ দিয়ে পর্দায় রাগী যুবকের ইমেজটা গড়ে দিয়েছিলেন রাজ্জাকই। তার ‘স্বরলিপি’, ‘কাচ কাটা হীরা’ ‘অমর প্রেম’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘অশিক্ষিত’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘বদনাম’, ‘বেঈমান’ ‘ময়নামতি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘আলোর মিছিল’, ‘কালো গোলাপ’ থেকে শুরু করে ‘বাবা কেন চাকর’ পর্যন্ত তার দাপট ছিল সব ধরনের চরিত্রে, দুর্দান্ত অভিনয়ে। তিনশরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন, পরিচালনা করেছেন ১৬টি ছবি। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে তাকে কখনও মাপা যাবে না। রাজ্জাক চেয়েছিলেন আমৃত্যু চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে, অভিনয়ে থাকতে। কিন্তু রাজ্জাকের জন্য চরিত্র সৃষ্টির মতো মেধা আমরা হারিয়েছি অনেক আগেই।
তাই রাজ্জাকও কিছুটা হারিয়ে গিয়েছিলেন, আড়াল করে নিয়েছিলেন। ৭৬ বছরের পরিপূর্ণ জীবন রাজ্জাকের। কোনও অপ্রাপ্তি নেই। তবু নিজেদের হাতে গড়া চলচ্চিত্র শিল্পের এই অধঃপতন দেখে নিশ্চয়ই কষ্ট পেয়েছিলেন তিনি। দু’হাত ভরা প্রাপ্তির পাশাপাশি ছিল বুকভরা অভিমানও। চলচ্চিত্রের স্বর্ণালি সময়ের আরও কয়েকজন এখনও আছেন বটে, তবে বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গে আমার প্রগাঢ় ভালোবাসার টানটা অনেকটা আলগা করে দিয়ে গেলেন রাজ্জাক। ভালোবাসার সেই কাল আর ফিরবে না জানি।
আমি চলচ্চিত্রবোদ্ধা নই। তবে চলচ্চিত্রের পোকা বলতে পারেন। আশির দশকজুড়ে অসংখ্য ছবি দেখেছি হলে গিয়ে। তখন চলচ্চিত্রই ছিল আমাদের প্রধান বিনোদন। আর সেই বিনোদনে সুস্থতা নিয়ে আমাদের মন মাতাতেন, রাঙাতেন নায়করাজ রাজ্জাক। তার নতুন-পুরনো কোনও ছবিই মিস করতাম না তখন। হলে বা বিটিভিতে রাজ্জাক মানেই এক অমোঘ চুম্বকের নাম। তাকে ভালোবাসতাম, তাকে হিংসা করতাম, ঈর্ষা করতাম, তার চুলের স্টাইল, কথা বলার ভঙ্গি নকল করতে চাইতাম। কারণ রাজ্জাক নায়ক হলেও আমাদের চেনা, অতি পরিচিত যেন। তাকে চেনা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। পাশের বাড়ির কিন্তু আবার দূর আকাশের তারা। রাজ্জাক মানেই যেন এক মায়াবি বিভ্রম। আমার একটা ব্যক্তিগত স্বভাব আছে। খুব প্রিয় মানুষদের কাছে যাই না। প্রিয় মানুষদের কারও কারও কাছে গিয়ে মানবিক দুর্বলতা দেখে হতাশ হয়েছি বলে, পরে এড়িয়ে চলেছি। তাই সুযোগ থাকার পরও রাজ্জাকের কাছে যাইনি, দূর থেকে ভালোবেসেছি। চেয়েছি এবং চাই আমাদের মনে রাজ্জাক যেমন নায়কের ভাবমূর্তি, তেমনই থাকুন। রাজ্জাকদের দেহান্তর ঘটে বটে, তবে তারা মরেন না। বেঁচে থাকেন, থাকবেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। এখন তো হাতে আছে ইউটিউব নামের আলাদিনের চেরাগ। মন খারাপ হলেই দেখব ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনই…’, ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন…’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি…’ বা ‘মাস্টার সাব, আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই…’। নীল আকাশের নিচে একা একা খুঁজবো প্রিয় নায়ককে বা রাজ্জাককে খুঁজবো ‘ওই দূর দূর দূরান্তে, নীল নীলান্তে…’।

[লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]

আরও পড়ুন