রায় পড়ে যা বুঝেছি

আপডেট: 02:53:55 27/08/2017



img

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

বিচারপতিগণকে অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হল না। মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ দুই-আড়াই বছর আগে যে রায় দিয়েছিলেন, আপিল বিভাগ সেই রায় বহাল রেখেছেন। সুপ্রিমকোর্টের মাননীয় বিচারপতিগণকে প্রয়োজনে অপসারণের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা বহাল থাকার পক্ষে রায়টিকে স্বাগত জানাই।
কিন্তু মনের ভেতর একটি প্রশ্ন থেকেই যায় : যথেষ্ট পরিপক্বতার অভাবের কারণে সংসদকে যদি বিচারপতিগণের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া না যায়, তাহলে ওই সংসদকে কি দেশ শাসনের অধিকার অব্যাহতভাবে দেয়া যায়?
প্রশ্নটি মনে কেন এলো, সেটা বুঝতে হলে রায়ের কিছু অংশ সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা প্রয়োজন। স্থানাভাবে রায় থেকে ইংরেজিতে উদ্ধৃত করছি না বরং ওই অনুচ্ছেদগুলোর ভাবার্থ বাংলায় লিখছি। ভাবার্থের ভাষা আমার নিজের। তবে সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশে বলতে চাই, ভাবার্থ লিখতে গিয়ে আমি সতর্ক ছিলাম।
রায়ের ১৯২ অনুচ্ছেদের ভাবার্থ : খায়রুল হক মহোদয়ের নেতৃত্বে যে রায় দেয়া হয়েছিল সেই রায়ে আশা করা হয়েছিল, বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করবে যেন ওই নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারে।
সেই রায়ে আশা করা হয়েছিল, সরকারের হস্তক্ষেপ ব্যতীতই নির্বাচন কমিশনের শূন্য পদগুলো পূরণ হবে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা মহোদয়ের নেতৃত্বে প্রদত্ত রায়ে মন্তব্য করা হয়েছে, ২০১১ বা ২০১২ সালের পরবর্তী বাংলাদেশের কোনো সরকারই উপরে ব্যক্ত আশাগুলো পূরণের লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি এবং বিরোধীদলও এ বিষয়টি সংসদে বা অন্য কোনো ফোরামে উপস্থাপন করেনি।
আরেকটি মন্তব্য হচ্ছে, সরকার বা বিরোধী দল কর্তৃক এইরূপ নিষ্ক্রিয়তার ফলে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। অতঃপর ১৯৩ অনুচ্ছেদে দীর্ঘ মন্তব্য আছে, যা এ কলামের পরের অনুচ্ছেদে উল্লেখ করছি।
রায়ের ১৯৩ অনুচ্ছেদের ভাবার্থ : জাতীয় সংসদের নির্বাচন যদি স্বাধীনভাবে, পক্ষপাতহীনভাবে এবং কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ব্যতীত অনুষ্ঠান করা না যায়, তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যতীত গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ আমাদের দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সংসদ এখনও শৈশবেই রয়ে গেছে। জনগণ এ দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছেন না। যদি এ দুটি প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা ও সম্মান অর্জন করতে না পারে, তাহলে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।
স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যতীত জ্ঞানী বা মেধাবী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সংসদের সদস্য নির্বাচিত হতে পারবেন না এবং এ কারণে সংসদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়। সংসদ যদি যথেষ্ট পরিপক্ব না হয়, তাহলে ওই অপরিপক্ব সংসদের হাতে বিচারকগণের অপসারণের ক্ষমতা দেয়া বিচার বিভাগের আত্মহত্যার শামিল। এছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে তাদের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সচেতন ও সাবধান হতে হবে।
রায়ের অনুচ্ছেদগুলো দীর্ঘ হওয়ায় দুটি অনুচ্ছেদের ভাবার্থ থেকে আমি পাঁচটি পয়েন্ট সারমর্ম হিসেবে এখানে উল্লেখ করছি। রায় মোতাবেক- ১. বর্তমান বাংলাদেশ সরকার নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, ২. নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি, ৩. নির্বাচন কমিশন এবং সংসদের ওপর মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা নেই, ৪. বর্তমান সংসদ এখনও শৈশবে অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো সময় কৈশোর পার করবে, তারপর যুবক হবে, ৫. বর্তমান সংসদ যথেষ্ট পরিপক্ব নয়। যেহেতু এই সংসদ যথেষ্ট পরিপক্ব নয়, সেহেতু এ সংসদের হাতে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা দেয়া যায় না; অতএব দেয়া হল না।
সাম্প্রতিককালে টেলিভিশন টকশোতে, পত্রিকার কলামে, সংবাদে, প্রেস ক্লাবের আলোচনা সভায় সুপ্রিমকোর্টের রায়, সুপ্রিমকোর্টের ক্ষমতা, সংসদের ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনার ঝড় বইছে। সাধারণ পাঠক যারা এ বিষয়টির সাতে-পাঁচে থাকেন না বা ব্যস্ততার কারণে গভীরে যেতে পারেন না, তাদের জন্য একটি ক্ষুদ্র উপক্রমণিকা এ কলামের পরবর্তী অংশে উপস্থাপন করছি।
জাতীয় সংসদ গত ৪৫ বছরে বাংলাদেশের সংবিধানে অনেকগুলো সংশোধনী এনেছে। ১৯৭৬-৭৭ এবং ১৯৮২-৮৬ সময়কালে তৎকালীন সামরিক সরকারগুলো সংবিধানে যেসব সংশোধনী এনেছিল সেগুলো পরবর্তীকালে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদন করা হয়। সামরিক সরকার সংবিধানে যেসব সংশোধনী এনেছিল এবং সংসদ কর্তৃক র্যাটিফাই করা হয়েছিল অথবা খোদ সংসদ কর্তৃক সংবিধানে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছিল, এর কয়েকটি সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক বাতিল করা হয়েছে পূর্ণ বা আংশিকভাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্ট কর্তৃক সংবিধানের সংশোধনী প্রসঙ্গে রায় দেয়া কোনো নতুন ঘটনা নয়। এটি তাদের এখতিয়ারভুক্ত। বাংলাদেশের সংবিধানই সুপ্রিমকোর্টকে ক্ষমতা দিয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শেষবারের মতো ঘটনাটি ঘটল। এর আগে ঘটেছিল ২০১১-১২ সালে। কিন্তু এবার অর্থাৎ ২০১৭ সালে রায় প্রকাশের পর সংসদের সরকারি দল তথা বাংলাদেশ শাসনকারী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক এমনসব অশোভন, অসাংবিধানিক, নেতিবাচক এবং বিচার বিভাগের প্রতি আক্রমণাত্মক মন্তব্য শুরু হল, যা অতীতে সচরাচর ঘটেনি বা দেখা যায়নি। যা হোক, এর বর্ণনা দেয়া আজকের কলামের উদ্দেশ্য নয়; এর কারণ ও ফলাফল পরে আলোচনা করব।
জাতীয় সংসদ তিন বছর আগে বিচারপতিগণের অপসারণের ক্ষমতা নিজের হাতে রাখার ষোড়শ সংশোধনী পাস করেছিল। ১৯৭২-এর নভেম্বরে গৃহীত এবং ডিসেম্বর থেকে কার্যকর সংবিধানে বিধান ছিল এইরূপ- নির্ধারিত আইন বা নিয়ম মোতাবেক প্রয়োজনে সংসদই সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারবে। বঙ্গবন্ধুর আমলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী দ্বারা বাকশাল নামে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়াও সংবিধানের আরও অনেক কিছুই সংশোধন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আমলে সংশোধিত অনেক বিষয়ের মধ্যে এটিও ছিল- সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণকে চাকরি থেকে অপসারণ করার ক্ষমতা সংসদের বদলে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের ৬ তারিখ রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। জেনারেল জিয়াউর রহমান বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত ব্যবস্থাকে কঠোর এবং বিচারপতিগণের প্রতি অসহনশীল মনে করেছিলেন।
তাই জিয়াউর রহমান আদেশ করেছিলেন, বিচারপতিগণের অপসারণের জন্য চূড়ান্ত ও অলঙ্ঘনীয় সুপারিশ করবেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সাংগঠনিক কাঠামো ছিল প্রধান বিচারপতি এবং পরবর্তী জ্যেষ্ঠ দু’জন বিচারপতি। এই নিয়ম প্রায় ৩৬-৩৭ বছর চলেছে। ২০০৯-১৩ সালের আওয়ামী লীগ সরকারও এ পদ্ধতি মেনে নিয়েছিল।
২০১১ সালে যখন সংবিধানের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সংশোধনী আনা হয় (পঞ্চদশ সংশোধনী), তখনও আওয়ামী লীগ সরকার ওই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই তিন বছর আগে সরকার সংসদের মাধ্যমে এ ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী আনে। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যে সংশোধন করা হয়, তার ফলে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতিগণকে অপসারণ করার ক্ষমতা (সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থা বাতিল করে) সংসদের হাতে ন্যস্ত হয়।
এ সংশোধনীটি দেশের সচেতন নাগরিক এবং আইনজীবী মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়। একপর্যায়ে এ সংশোধনীর বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট করা হয়। রিটকারীর বক্তব্যের সারমর্ম হল : ষোড়শ সংশোধনী বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করার শামিল এবং এটি সংবিধানবিরোধী। হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় সংশ্লিষ্ট বিচারপতিগণ দীর্ঘ শুনানি শেষে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে সরকার সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল মামলা রুজু করে।
দীর্ঘ শুনানি শেষে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায় প্রদান করেন। উল্লেখ্য, সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে নিয়োজিত মোট ৭ জন তথা সব বিচারপতি মিলে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গঠন করেছিলেন এবং ওই বেঞ্চ আপিল মামলার শুনানি করেন। আরও উল্লেখ্য, সুপ্রিমকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের আহ্বানে বাংলাদেশের উচ্চতম আদালতের দশজন দেশবরেণ্য আইনজীবী ‘আদালতের বন্ধু’ তথা এমিকাস কিউরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমিকাস কিউরি হন অবশ্যই প্রবীণ ও বিজ্ঞ আইনজীবীরা। তাদের কাজ হল, তাদের প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বুঝতে ও নিষ্পত্তি করতে আদালতকে সহায়তা করা।
এমিকাস কিউরিগণ মামলার কোনো পক্ষের আইনজীবী হন না। তারা হন নিরপেক্ষ, তাই তাদের বলা হয় আদালতের বন্ধু। ষোড়শ সংশোধনীর আপিলের শুনানিকালে ৯ জন এমিকাস কিউরি সংশোধনী বাতিলের পক্ষে মতামত দেন। অর্থাৎ বলা যেতে পারে, রায়টি ছিল সর্বসম্মত।
যখন শুনানি চলছিল তখন আপিল বিভাগে মোট বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৭। আপিল বিভাগ যখন রায় প্রদান করেন তখন পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ তথা ৭ জন বিচারপতির প্রত্যেকেই একমত হয়েছেন যে, সংশোধনীটি বাতিলযোগ্য। এরূপ পূর্ণাঙ্গ আদালতের বা পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সর্বসম্মত রায় নিয়ে বিতর্ক তোলা বাঞ্ছনীয় নয়।

[লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
mgsmibrahim@gmail.com
দৈনিক যুগান্তর থেকে]

আরও পড়ুন