লঞ্চের ফেরিওয়ালা শিবু এখন কোটিপতি

আপডেট: 01:34:39 19/05/2018



img
img
img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় রাজাকার খলিল শেখের সহযোগিতায় পাক সেনারা আমার বাবা কুমুদ রায়কে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গুলি করে নবগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়। তখন আমার বয়স প্রায় ১২ বছর। অনেক খোঁজ করেও বাবার লাশ পাইনি। সংসারে মা ও দুই বোন। তাদের বাঁচাতে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে লঞ্চে লঞ্চে কলা, বিস্কুট, পাউরুটি বিক্রি করে সংসার চালাইছি। অনেক দিন খেয়ে না খেয়ে দিন কেটেছে। এক পোয়া আটা কিনে পাতলা জাউ রান্না করে সবাই মিলে খাইছি। কচু ঘোটা খেয়েছি। বাজার থেকে শাক-পাতা কুড়িয়ে তেল-লবণ ছাড়াই সেদ্ধ করে খাইছি। অনেকের কাছে হাত পাতিছি। কোনো সহায়তা পাইনি। অনেক কষ্টে মানুষ হইছি।’
জীবনের কঠিন সময়ের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন শিবুপদ রায়।
লঞ্চের সেই ফেরিওয়ালা কালের পরিক্রমায় এখন কোটিপতি। মাছ ও বিশাল কৃষি খামারের মালিক।
সমাজের বিশিষ্ট লোকও এখন তিনি। কালিয়া পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের একাধিকবার নিবাচিত কাউন্সিলরও। তিনি বলেন, ‘এখন আমার ভাত পরে খায়।’
শিবুপদ রায়ের বাড়ি কালিয়া শহরের ছোট কালিয়া এলাকায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, কালিয়া উপজেলা শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে গোবিন্দনগর গ্রামের ভক্তডাঙ্গা বিলের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। এখানেই শিবুপদ রায় ২৬৭ একর জমির ওপর গড়ে তুলেছেন সমন্বিত খামার। খামারে টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, ঢেড়স, পেঁপে, করোলা, লাউসহ বিভিন্ন শাক-সবজির আবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশাল ঘেরে চিংড়ি, বিভিন্ন প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ চাষাবাদসহ আমন ও বোরো ধানের আবাদ করা হচ্ছে।
শিবপদ নিজেই শ্রমিকদের সঙ্গে খামারের পরিচর্যা করেন। উৎপাদিত কৃষিপণ্য রাজধানীসহ পাশের গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, মাগুরার বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এখানে ২২ জন শ্রমিক নিয়মিত এবং এক থেকে দেড়শ জন শ্রমিক খণ্ডকালীন কাজ করেন। এই খামার থেকে বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকার কৃষিপণ্য ও মাছ বিক্রি করা হয়। পণ্য পরিবহন খরচ, শ্রমিক, ইজারা নেওয়া জমির মালিকদের টাকা পরিশোধ করে শিবুপদ রায়ের বছরে লাভ থাকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।
‘লঞ্চে লঞ্চে কলা, বিস্কুট, পাউরুটি বিক্রি করে প্রতিদিন দশ থেকে ১২ টাকা আয় হতো। এ টাকা দিয়ে সংসার চালাতাম। লঞ্চেই একদিন আমার দেখা হয় বড়দিয়া মোকামের (বড়দিয়া নৌবন্দর) ভুসিমাল ব্যবসায়ী নিত্যানন্দ সাহার সঙ্গে। তিনি কাছে ডেকে আমার কষ্টের কথা শুনে তার গদিতে (ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে) থাকা-খাওয়াসহ মাসে ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করার সুযোগ দেন। সাত বছর দোকানে কর্মচারীর কাজ করেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। সবশেষ সাত হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়েছি।’
বেতনের টাকা জমিয়ে ১৯৭৮ সালের দিকে কালিয়া পৌর এলাকায় ১৬ হাজার ৬০০ টাকা পুঁজি নিয়ে ভুসিমালের দোকান দেন শিবুপদ রায়। প্রায় দুই দশক পর ১৯৯৮ সালে দশ একর জমি বন্দোবস্ত নিয়ে বাড়ির পাশে চিংড়ি চাষ শুরু করেন। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ঘেরের পাশাপাশি ধানছাঁটাই মেশিন (রাইচমিল) কেনেন। ২০১৫ সালে ভক্তডাঙ্গা বিলেই সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলেন। প্রথমে ২২৬ একরে, পরে তা বেড়ে ২৬৭ একর জমিতে দাঁড়ায়। এ বছর ১০০ একর জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন তিনি।
ভক্তডাঙ্গার বিল সারা বছরই পানিতে তলিয়ে থাকে। ফসলাদি তেমন একটা হতো না। এ সমস্ত জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে ২০ বছর চুক্তিতে তাদের জমি বন্দোবস্ত নেন শিবু। এ রকম প্রায় ৫০০ কৃষকের জমি বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। জমির মালিকদের (জমির পরিমাণ অনুযায়ী) বছরে দিতে হয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এছাড়া রয়েছে নিয়মিত এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের টাকা।
ছোট কালিয়া এলাকার অশোককুমার ঘোষ বলেন, পৌর কাউন্সিলর হয়েও শিবুপদ রায় কৃষিক্ষেত্রে যে অবদান রেখেছেন, তা অনুকরণীয়। তার খামারে ঘেরের পাশাপাশি সারা বছরই কিছু না কিছু ফসল চাষ হচ্ছে। প্রতিদিনই তিন থেকে চার ট্রাক মালামাল এই খামার থেকে বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।
কাঁচামাল ব্যবসায়ী ছলেমান মোল্লা বলেন, সপ্তাহে তিনি এখান থেকে এক ট্রাক বিভিন্ন শাক, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, পেঁপে, ঢেড়স প্রভৃতি নিয়ে থাকেন। বিষ এবং ফরমালিনমুক্ত হওয়ায় এখানকার সবজির চাহিদা রয়েছে।
আসলাম শেখ এবং আশীষ মালো দুজনই মাছ ব্যবসায়ী। তারা বলেন, তিন দিন পর পর এখান থেকে তারা এক ট্রাক করে চিংড়িসহ বিভিন্ন সাদা মাছ নিয়ে থাকেন।
কালিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবিরকুমার বিশ্বাস বলেন, ‘পরীক্ষা করে দেখেছি শিবুপদ রায়ের খামারের সব কিছু বিষ এবং ফরমালিনমুক্ত। যার কারণে এই খামারের সব কিছু বাজারে চাহিদা রয়েছে।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজিব রায় বলেন, প্রতিদিন তিন থেকে চার মণ চিংড়ি, দশ থেকে ১৫ মণ অন্যান্য মাছ বিক্রি করা হয়ে থাকে খামারটি থেকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইল কার্যালয়ের উপ-পরিচালক চিন্ময় রায় বলেন, ‘২৬৭ একরের এ বহুমুখি খামারটি নয়নাভিরাম। জীবনে অনেক স্থানে চাকরি করেছি, কিন্তু গোছালো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এমন কৃষিখামার কোথাও চোখে পড়েনি। এটি শুধু অনুকরণীয়ই নয়, আমাদের দেশে একটি মডেল হতে পারে।’