বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ

আপডেট: 02:59:04 15/07/2019



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক শাসক হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করার পর ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে সরাসরি রাজনীতিতে নাম লেখান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর ’৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় বিচরণ করেন তিনি। ’৯১ সালে দেশে আবারও সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর রাজনীতিতে গুরুত্ব বাড়তে থাকে তার। পরবর্তী সময়ে বৃহৎ দু’টি রাজনৈতিক  দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের রাজনৈতিক সমীকরণেও এরশাদ জড়িয়ে পড়েন।
প্রবীণ রাজনীতিকরা বলছেন, রাজনীতিতে আসার পর থেকে নানা নাটকীয়তা তৈরি করেছেন এরশাদ। ’৯০-এর দশকের শেষদিকে রাজনীতিতে যখন জোটের বিষয়টি সামনে আসে, তখনই নিজের দামদর তুলতে শুরু করেন তিনি। বিশেষ করে, তার বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের শেষ দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোটে যোগ দেন এরশাদ। এই জোট স্থায়িত্ব হয়নি বেশিদিন। ২০০১ সালে জনতা টাওয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে গ্রেফতার হন তিনি। অস্থিরতা তৈরি হলে বেরিয়ে যান জোট থেকে। চারদলীয় জোটে থাকা-না থাকার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ভেঙে যায় তার নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে একটি অংশ থেকে যায় চারদলীয় জোটে।
এরশাদের চারদলীয় জোট ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন বিএনপি-জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক। ওই সময় মাওলানা ইসহাক চারদলীয় জোটের শরিক দল অবিভক্ত ইসলামী ঐক্যজোটের নায়েবে আমির ছিলেন।  তিনি বলেন, ‘এরশাদ সাহেব ওই সময় জেলে ছিলেন। তখন তার দক্ষিণহস্ত ছিলেন নাজিউর রহমান মঞ্জু। আদালতের আদেশ ছিল, প্রায় তিন কোটি টাকা পরিশোধ করতে। ওই টাকা জাপার তৎকালীন নেতারা দেননি। জাপার নেতারা তখন বলতেন, ক্ষমতায় গিয়ে এরশাদকে মুক্ত করবে। কিন্তু এরশাদ সাহেব নাখোশ হলেন। তার দল ছিন্নভিন্ন হলো। তিনি মুক্তি পেয়ে জোটত্যাগ করেন।’
নিজেকে চারদলীয় জোটের রূপকার হিসেবে দাবি করে নিজের আত্মজীবনী ‘আমার কর্ম আমার জীবন’ গ্রন্থে এরশাদ লিখেছেন, ‘জোটের সাথে প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল একসাথে আন্দোলন করবো। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন, চারদলের একসাথে নির্বাচন এবং সরকার গঠনের ব্যাপারে একটি খসড়া চুক্তিও হয়। এই জোটে যাবার কারণেই আমাকে পুনর্বার কারাবরণ করতে হয়েছে চার মাস ২০ দিন।’ এরশাদের অভিযোগ, ‘চারদলীয় জোট আমার মুক্তির ব্যাপারে টুঁ শব্দটিও করেনি। জোটের নেতারা হরতাল ডাকা তো দূরের কথা, একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেয়নি।’ জোটত্যাগের বিষয়ে এরশাদ লিখেছেন, ‘বেগম জিয়ার নেতৃত্বে জোটভুক্ত আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা খুবই দুঃখজনক। বারবার আমাদের হেয় করা হয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। জোটের স্বার্থে আমরা অনেক কিছুই মেনে নিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত জোটে থাকতে পারিনি, জোট থেকে বেরিয়ে এসেছি।’
মুক্তিযুদ্ধে এরশাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি চরিত্র হিসেবে বিরাজ করেছেন। ফলে বাস্তবতার স্বার্থে তার সম্পর্কে কিছু মন্তব্য অনিবার্য হয়ে যায়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সবসময় সুবিধাবাদী ছিলেন। ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ মাস বাড়িতে এসে ছুটি কাটিয়েছেন। ছুটিশেষে তিনি পাকিস্তানে ফিরে গেছেন। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে মুক্তিযোদ্ধারা সফল হবেন কি না। বরং যারা ক্ষমতাবান তাদের সঙ্গেই ফিরে গেছেন। বাঙালিদের মধ্যে বাংলাদেশমনস্ক সৈনিক ছিলেন যারা, তাদের বিচারের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল হয়েছিল তার প্রধান ছিলেন এরশাদ। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বাংলাদেশের একটি প্রশ্নবিদ্ধ চরিত্র।’
রাজনীতিতে এরশাদের ডিগবাজির বিষয়ে আনোয়ার হোসেনের পর্যবেক্ষণ, ‘রাজনৈতিক সুবিধার কারণে আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারকে (এরশাদ) আর বিএনপি মৌলবাদকে (জামায়াত) কাঁধে তুলে নিয়েছিল। যার ফলে রাজনৈতিক সেই সুগম পথে এরশাদ সুবিধা আদায় করেছেন।’
এরশাদের বিরুদ্ধে ৩৪টি দুর্নীতির মামলা ছিল উল্লেখ করে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এরশাদ যখনই একটু শক্ত কথা বলতেন, তখন মামলাগুলো চালু হতো। আবার তিনি চুপ করে থাকলে মামলার কার্যক্রম বন্ধ থাকতো। এটা কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। কারণ তিনি যে দেশ ও জনগণের সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করাটা কাঙ্ক্ষিত ছিল। ফলে এরশাদ নেতিবাচক কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রশ্নবিদ্ধ। উপরন্তু তিনি কখনও কথা ঠিক রাখতেন না। মোদ্দাকথা তিনি ছিলেন সুবিধাবাদী।’
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে যোগ দেন এরশাদ। এরপর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আবারও মহাজোট ছাড়ার বিষয়টি বিভিন্ন বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি। পরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগের মাসে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। এরশাদ নিজে অবশ্য এই জোট নিয়ে অস্বস্তির কথা বলেছেন। নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘সততার দৃষ্টান্ত রাখেনি আওয়ামী লীগও। স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী বলেই স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে আমরা সবসময় সহযোগিতা করে এসেছিলাম।’
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রসঙ্গে এরশাদ লিখেছেন, ‘ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করতে তাদের বাইশটি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই দীর্ঘ বাইশ বছর পর তারা এবার নিয়ে (২০১৪) তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনে সক্ষম হলো। এই তিনবারই ক্ষমতায় আসতে জাতীয় পার্টির সহযোগিতা গ্রহণ করতে হয়েছে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘শেষাবধি এলো দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে ঘটলো অনেক ঘটনা। তবে নির্বাচনের ঘটনাবলি যেভাবেই প্রবাহিত হোক না কেন, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে বলেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পেরেছে, নির্বাচনের ফলও বৈধতা পেয়েছে, সর্বোপরি গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। ফলে আমাদেরই সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠনে সক্ষম হলো।’
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদ মহাজোট ত্যাগ করে নির্বাচন না করার ঘোষণা করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের ৩ তারিখ আত্মহত্যার ঘোষণা দেন। পরে ছাব্বিশ ঘণ্টা অজ্ঞাতবাসে থাকার পর ঢাকায় সফররত ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং তার বারিধারার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। এরপর এরশাদ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা জানান সাংবাদিকদের।
এর আগে ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। তিনি ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দল ২৭টি আসনে বিজয়ী হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ৩৪টি আসনে জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে। এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এরশাদ।
এরশাদের নেতৃত্বে গত বছরের ৭ মে ৫৮টি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ আত্মপ্রকাশ করে। ২টি নিবন্ধিত দল ও ২টি জোটসহ মোট ৪টি শরিক দল নিয়ে এ জোট গঠন করা হয়েছে। সম্মিলিত জোটের শরিক দলগুলো হলো—জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, জাতীয় ইসলামী মহাজোট ও বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)। এর মধ্যে ইসলামী মহাজোটে আছে ৩৪টি ইসলামি দল এবং বিএনএতে আছে ২২টি দল। সব মিলিয়ে এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটে দলের সংখ্যা ৫৮টি। এরশাদের এই জোটের নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৩টি। দলগুলো হলো—জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট। গত নির্বাচনে এই জোটের কোনও শরিক দল মহাজোটের মনোনয়ন পায়নি। বর্তমানে জোটের কার্যক্রম নেই।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন