লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা সংকট

আপডেট: 08:20:56 24/12/2016



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি ওষুধসহ চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত উপকরণের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা। 
গত এক বছর ধরে এই সংকট চলছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত উপকরণ না পাওয়ায় রোগী ও তাদের স্বজনদের বাইরে থেকে বাড়তি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়েছেন গরিব ও দুস্থ রোগীরা।
এদিকে, হাসপাতালে চিকিৎসক, সেবিকাসহ জনবলেরও অভাব রয়েছে। ফলে বহির্বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাছাড়া হাসপাতালে রয়েছে শয্যা সংকট। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় রোগীদের মেঝে কিংবা বারান্দায় রেখে সেবা দেয়া হচ্ছে।
বিগত ২০১৫ সালের ৪ নভেম্বর থেকে কাগজে-কলমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু করে। এর পরে রোগীদের কাছ থেকে ৫০ শয্যার জন্য সেবামূল্য আদায় করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বাস্তবে আজও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যার কার্যক্রম চালু হয়নি। বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাণরক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ ওষুধসহ রক্তের ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় মেডিকেল সরঞ্জামাদির সংকট চলছে। এতে গরীব ও দুস্থ রোগীরা দুর্ভোগে পড়ছেন।
শনিবার সকালে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার সিংগা গ্রামের ফিরোজা বেগম (৬০) হাসপাতালের ১১ নম্বর বেডে ভর্তি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রক্ত স্বল্পতায় ভুগছেন। ডাক্তার বলেছেন, তার শরীরে এখন রক্ত উৎপাদন হয় না। তাই বাড়ির সদস্যদের সহযোগিতায় চিকিৎসকের পরামর্শ মতে প্রায়ই তার শরীরে রক্ত দিতে হয়। সাথে থাকেন পুত্রবধূ তানিয়া সুলতানা। রক্তের ব্যাগ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ সরকারিভাবে পান কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রায় বছর খানেক ধরে শাশুড়ির শরীরে রক্ত দিতে হয়। এক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ২৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। কিন্তু কোনোদিনও রক্তের ব্যাগ বিনামূল্যে হাসপাতাল থেকে পাইনি।’
একই উপজেলার ঝিকড়া গ্রামের তুরাফ শেখ বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসের ১৫ তারিখে আমার মা ফরিদা বেগমকে (৫০) হাসপাতালে (২ নম্বর বেডে) ভর্তি করেছি। ডাক্তার বলেছেন- মায়ের শরীরে রক্ত উৎপাদন হয় না। দুই ব্যাগ রক্ত ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা নিতে এসে এখান থেকে বিনামূল্যে রক্তের ব্যাগ না পেয়ে বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।’
শামুখ খোলা গ্রামের সৈয়দ আরিফুজ্জামান (৫০) দীর্ঘদিন ধরে রক্ত স্বল্পতায় ভুগছেন। তিনিও এই হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের ১০ নম্বর বেডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আরিফুজ্জামান সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, তার শরীরে প্রায়ই রক্ত দেওয়া লাগে। প্রতিবার ২৫০ টাকা করে গুণলেও হাসপাতাল থেকে একবারও বিনামূল্যে রক্তের ব্যাগ তাকে সরবরাহ করেনি। এমনকী অনেক ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে।
সমাজকর্মী লিয়াকত হোসেন বিশ্বাস বলেন, ‘সাড়ে ৩ লাখ মানুষের জন্য উপজেলায় রয়েছে একটি মাত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অসহায় ও গরিব রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হলেও এখানে নেই কোন ব্লাড ব্যাংক। তাছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধও বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। এসব ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু নজরদারি প্রয়োজন।'
হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) সুষমা মল্লিক বলেন, ‌‘এ বছরে আজ (২৪ ডিসেম্বর) পর্যন্ত ২৭০ ব্যাগ রক্ত আমাদের মাধ্যমে রোগীদের শরীরে দেওয়া হয়েছে। দিন দিন এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক রক্তের ব্যাগ সরবরাহ নেই। বছরের শুরুতে নড়াইল সিভিল সার্জন অফিস থেকে মাত্র ৫০ ব্যাগ পেয়েছিলাম যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।’
উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা বিএম কামাল হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘গরিব ও দুস্থ রোগীদের জন্য লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং রক্তের ব্যাগ থাকা প্রয়োজন। যদি রক্তের ব্যাগ সরবরাহ কম থাকে তাহলে অবশ্যই প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরবরাহ বৃদ্ধি করা উচিত। তা নাহলে  বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় হতে পারে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আশু সহযোগিতা প্রয়োজন।’
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. লুৎফুন নাহার বলেন, ‘রক্তের ব্যাগের বর্তমানে সরবরাহ নেই। তাই হাসপাতাল থেকে রোগীদের এই সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

আরও পড়ুন