লোহাগড়া হাসপাতাল : ভবন আছে, ডাক্তার নেই

আপডেট: 02:18:58 28/03/2018



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের জন্য তিনতলা নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় চার বছর আগে। ২০১৪ সালের নভেম্বরে নতুন ভবনটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হলেও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির শুধু ৫০ শয্যার খাদ্যের অনুমোদন হয়েছে। চিকিৎসকসহ জনবল নিয়োগের অনুমোদন মেলেনি। ফলে চিকিৎসক সংকটের কারণে এখানে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসকের দশটি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। আর এর ফলে দুর্ভোগে পড়েছেন এখানে সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩১ শয্যার এই হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য ২০০১-২০০২ অর্থবছরে সাত কোটি ১৭ লাখ ৩৪১ টাকা খরচ করে তিন তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ ১৩ বছর পর নির্মাণ কাজ শেষে ২০১৪ সালের নভেম্বরে নতুন ভবনটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর দীর্ঘ চার বছরেও প্রশাসনিক অনুমোদন না পাওয়ায় বতর্মানে পুরনো ভবনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চলছে। এ ভবনে বেড রয়েছে ৩১টি। লোহাগড়া উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ। এ কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে রোগীর চাপ অনেক। শয্যার অভাবে তাদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়। বহির্বিভাগেই প্রতিদিন ২০০-৩০০ রোগী সেবা নিতে আসেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে দশটি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। তাদেরকে আন্তঃবিভাগ, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আর এ কারণে মাঝে মধ্যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা।
সরেজমিনে দেখা যায়, জনগুরত্বপূর্ণ এ কমপ্লেক্সেটি কাগজে-কলমে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও অনুমোদন না হওয়ায় ৩১ শয্যার আদলে চলছে চিকিৎসা সেবা। পুরুষ ওয়ার্ডে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা মেলে রোগীরা গাদাগাদি করে কোনো রকমে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে। আবার কিছু রোগীর সিট মেলেনি। তাই মেঝেতেই চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসক।
দেখা যায়, বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা করতে করতে অনেকে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। উপজেলার লাহুড়িয়া গ্রামের রেজাউল হক জানান, ভিড়ের কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষায় আছেন।
বাটিকাবাড়ি গ্রামের হেনা বেগম বলেন, ‘সকাল দশটায় এসেছি। দেড় ঘণ্টায়ও ডাক্তারের সিরিয়াল পাইনি।’
পার মল্লিকপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য হামিমুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
মাই গ্রামের প্রশান্তকুমার দাশ ব্যথার ওষুধ নিতে এসেছিলেন। দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে ডাক্তারের দেখা পেলেও বাইরে থেকে তাকে ওষুধ কিনে নিতে বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বহির্বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, বহির্বিভাগে মাত্র দুইজন চিকিৎসককে কয়েক শত রোগীকে চিকিৎসা পরামর্শ দিতে হয়। এক মুহূর্তের জন্য চেয়ার থেকে ওঠা যায় না। নিজেরা অসুস্থ হলেও ছুটি নেওয়া বা পাওয়া যায় না। এতো চাপের মুখে ভালো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না। ৫০ শয্যা বাস্তবায়ন হলে আরো ১২জন চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি হতো। তখন রোগীদের সঠিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতো।
এ ব্যাপারে লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা লুৎফুন নাহার জানান, ৩১ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ মাত্র দশটি। ৫০ শয্যা হলে চিকিৎসকের পদ হবে ২১টি। এছাড়া অপারেশন থিয়েটার ও আরো ১৯টি শয্যার প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রসহ অন্যান্য উপকরণ এখনো পাওয়া যায়নি। নতুন ভবন নির্মিত হলেও প্রশাসনিক অনুমোদন না পাওয়া এবং ১২টি চিকিৎসকের পদসহ অন্যান্য উপকরণের অভাবে ৫০ শয্যা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
নড়াইলের সিভিল সার্জন মুন্সি আসাদুজ্জামান জানান, লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে শুধু ৫০ শয্যার খাদ্যের অনুমোদন আছে। অন্য সবকিছুই চলছে ৩১ শয্যার ঘাটতি জনবল দিয়ে। হাসপাতালটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। গত মাসেও এ বিষয়ে একটি চিঠি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো ফল মেলেনি।

আরও পড়ুন