শহীদ কাদরীর কবিতায় প্রেম

আপডেট: 02:24:02 09/11/2016



img

সাগর জামান

শহীদ কাদরী বাংলা ভাষার অন্যতম খ্যাতিমান কবি। পঞ্চাশের দশকে তার বর্ণিল অভিষেক। ব্যতিক্রমী ভাবনার বাণী তিনি কবিতায় প্রযুক্ত করে রৌদ্র করটিত একটি সোনালি দিগন্ত আবিষ্কার করেন। তার স্বনির্মিত প্রান্তর বৃক্ষ পুষ্পে শোভিত হয়ে ওঠে। তিনি তার আবেগময় প্রেমের উপলব্ধিকে সোচ্চারিত রাখেন। শহীদ কাদরীর ভাবনার অপারতা প্রেমের অমোঘ তাকে স্পর্শ করে নিবিড় প্রেমের আবেদনকে। তিনি নিসর্গের কাছে কিংবা মানবীর মুখে চুলের গহীনে সযত্নে সঞ্চিত রাখেন। স্বপ্নের সহায়তায় সেগুলো শহীদ কাদরীর আহ্বানে কবিতায় লিপিবদ্ধ হয়। তিনি প্রেমবন্দনায় নিরন্তর নিবেদিত থাকেন। প্রেমলীলায় তিনি সমর্পিত হন। প্রেমের শক্তি তার কবি সত্তাকে সমুন্নত রাখে। তিনি কবির শক্তিকে উন্নীত করেন স্বপ্নের শীর্ষে। তার স্বপ্নের সীমানা বিস্তৃত হয়। সবকিছুর নেতৃত্বে একজন কবিকে তিনি দাঁড় করান। কবির আদেশ নির্দেশে পরিচালিত হবে সব। নির্মলতা জয়ী হবে। সব সুন্দর বিকিকিনির মাধ্যমে হবে। কুৎসিত দৃশ্য লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাবে। অস্ত্রের পরিবর্তে গুচ্ছফুল বহন করবে সব কাহিনি। কবির শক্তির কাছে অবনত হবে সব অশুভ শক্তি। প্রেম বিষয়ক ভাবনা অনুচিন্তা, স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার নিয়ামক প্রেরণা প্রেমকে অলক্ষ্য থেকে উপস্থিত করার প্রবণতা শহীদ কাদরীর কাব্যভাষায় দেখা যায়। প্রেমের বিহ্বলতা, বিরহ কাতরতা এবং সুখানুভূতি এক সাথে নক্ষত্র ও পঙক্তি হয়ে শহীদ কাদরীর কাব্যভাষার দ্যোতনায় ফুটে ওঠে। প্রেমের ভাবনা নানা অনুভূতির সৃষ্টি করে। রকমারি চিন্তার সমাহারে শহীদ কাদরীর কবিতায় প্রেম উপজীব্য হয়। প্রেমের আবেগ অনুভূতি তাকে স্বপ্নতাড়িত করে। তিনি কেজো ক্ষমতাবান মানুষে রূপান্তরিত হতে চান। তিনি প্রেমিকাকে নির্ভয়ে থাকার আহ্বানে উদ্দীপ্ত হন। উচ্চারণ করেন-

‘ভয় নেই
আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে মার্চপাস্ট করে চলে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।
ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটাতার ব্যারিকেড পার হয়ে অনেক রণক্ষেত্রের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোড় গোড়ায় প্রিয়তমা।

শহীদ কাদরীর কবিতায় স্বপ্নবিলাসী, কল্পনাপ্রবণ এক কবির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি শোভন দৃশ্যকে আহরিত করে কবিতায় চিত্রিত করেন। তিনি স্বপ্নের মধ্যে সুন্দর আগামীর অধিনায়কের ভূমিকায় একজন কবিকে অবতীর্ণ করেন। এসবের মধ্যদিয়ে শহীদ কাদরীর কবিতায় স্বপ্নবিলাসী কল্পনাপ্রবণ এক কবির পরিচয় পাওয়া যায়। এসবের মধ্যদিয়ে তার প্রেম প্রলয়ের তীব্রতা ফুটে ওঠে। প্রেমকে তিনি নানাভাবে ধারণ করেন। এবং সব প্রেমিকাকে তিনি অভিবাদন জানিয়ে দক্ষ নিপুণ ক্ষমতাধর অধিনায়কের মতো সুন্দর ভবিষ্যতের বর্ণনা শোনান। তার কবিতায় বর্ণিত হয় বদলে যাওয়া পৃথিবীর বাণী। শহীদ কাদরী তার ভিন্নতর চোখে দেখেছেন জাগতিক জীবনকে। দায়বদ্ধতা সমাজরীতির বেড়াজাল থেকে মুক্তির প্রত্যাশা মানবিক বোধের জায়গায় প্রত্যাবর্তন স্বপ্ন এসব কিছু মুখ্য উদ্দেশ্য পরিবর্তনের্ সমাজ পরিবর্তনের পরিকল্পনা তিনি তার কবিতায় সন্নিবেশিত করেছেন। প্রেমের ব্যাখ্যা তিনি নানাভাবে দিয়েছেন। তিনি প্রেম বিবেচনা করতে গিয়ে বলেছেন-

না প্রেম সে কোনো ছিপছিপে নৌকো নয়
যার চোখ মুখ নাক ঠুকরে খাবে
তলোয়ার মাছের দঙ্গল সুগভীর জলের জঙ্গলে
সমুদ্রচারীর বাঁকা দাঁতের জন্যে যে উঠেছে বেড়ে
তাকে হ্যাঁ তাকে কেবল জিজ্ঞেস করো
নেই বলবে
না প্রেম সে কোনো ছিপছিপে নৌকা নয়
ভেঙ্গে আসা জাহাজের পাটাতন নয় দারুচিনির দ্বীপ নয়
দীপ্র বাহুর সাঁতার নয় খড়কুটো? তাও নয়
ঝোড়ো রাতে পুরনো আটাচালার কিংবা প্রবল বৃষ্টিতে
কোনো এক গাড়ি বারান্দার ছাট লাগা আশ্রয়টুকুও নয়
ফুসফুসের ভেতর যদি পোকা মাকড় গুঞ্জন করে ওঠে
না প্রেম তখন আর শুশ্রুষাও নয়, সর্বদা সর্বত্র
পরাস্ত সে মৃত প্রেমিকের ঠাণ্ডা হাত ধরে
সে বড়ো বিহ্বল, হাঁটু ভেঙ্গে পড়া কাতর মানুষ।

শহীদ কাদরী এভাবে নিজস্ব প্রকাশ ভঙ্গি দিয়ে প্রেমের ব্যাখ্যা করেছেন পৃথকভাবে। প্রেমের যথার্থ সংজ্ঞা তিনি কোনো উপমাতে সহজে সন্ধান পাননি। বহু উপমা তিনি প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু অনেক উপমাকে তার উপযুক্ত মনে হয়নি। এই মনে না হওয়াকে প্রকাশ করতে করতে তিনি প্রেমের মূল স্থানে পৌঁছেছেন। তার প্রেমের এই চলমানতা উপমা উৎপ্রেক্ষার চঞ্চলতাকে প্রবল করেছে। একটি প্রগাঢ় প্রতিশ্রুতির দৃঢ় প্রস্তুতি লক্ষ্য করা গেছে এই ধরনের কবিতায়। হাতাশা হাপিত্যেশ আর দুঃখ সুখে আবৃত প্রেমের ভুবনকে তিনি নতুন রঙের ছাট লাগিয়েছেন। আগেই বলেছি তিনি অন্বেষণের উপমার সন্ধান ঠিকই পেয়েছেন কিন্তু দুঃখের অনিবার্যতা অপরিহার্যভাবে তার কবিতায় এসেছে। শহিদ কাদরী তার কবিতায় পরিণতির পারস্পরিক মিলনের শাশ্বত ছবি যেমন পরিস্ফুটন করেছেন তেমন অশান্তি, দুঃখ শোকের সম্ভাবনাকে তিনি এড়িয়ে যেতে পারেননি। উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে:

বন্য শুকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা
মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ
কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা
ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই
কিন্তু শান্তি পাবে না পাবে না, পাবে না

একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে
শূন্য হাড়ির গহ্বরে অবিরত
শাদা ভাত ঠিক উঠবে ফুটে তারা পুঞ্জের মতো
পুরানো গানের বিস্মৃত কথা ফিরবে তোমার স্বরে
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই
কিন্তু শান্তি পাবে না পাবে না, পাবে না’

শহীদ কাদরী চিত্তজয়ের ব্রত নিয়ে কবিতার ভেলায় ভেসে যেতে যেতে হৃদয় নামের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে গিয়েছেন অবলীলাক্রমে। তিনি নিসর্গ সভ্যতা আর সুন্দরতার কাছ থেকে সামান্য সৌন্দর্য অলক্ষ্যে ধার করে প্রিয়তমার নামকে তিনি দারিদ্র্যমুক্ত করেন। প্রকৃতির নির্মল সম্পদকে তিনি সযত্নে তুলে এনে নারীমুখকে চিত্রিত করেন। নিসর্গের শরীর তার কাছে অক্ষর প্রতিমা হয়ে ধরা দেয়। তিনি নিসর্গের অংশবিন্দু দিয়ে নির্মাণ করেন প্রিয় মুখের প্রিয় নাম।

‘আমি এখন তোমার নাম লিখবো
আমি এখন তোমার নাম লিখবো
তোমার নাম খেলার জন্যে আমি
নিসর্গের কাছ থেকে ধার করেছি বর্ণমালা
সভ্যতা বৃষ্টি, বিদ্যুত, ঝড় আর
সভ্যতার কাছ থেকে একটি ছুরি।
এই সব অক্ষর দিয়ে
তোমার নাম আমি লিখছি তোমার নাম
অগ্নিময় বৃষ্টিতে তুমি
ঠাণ্ডা হিম সোনালি ছুরি প্রিয়তমা।’

প্রেমের অনুভূতি যেমন মানুষকে শীতল ছায়ায় শিহরিত করে তেমনি প্রেমের উত্তাপ মানুষকে অগ্নিময় এবং ছুরির মতো ধারালো করে তোলে। শহীদ কাদরীর কবিতায় এ জাতীয় দর্শন লক্ষ্য করা যায়। এবং এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা সান্নিধ্য প্রাপ্তির আকুতি অস্থির প্রতীক্ষায় স্বপ্নের বেড়াজালে বন্দি হওয়া চিত্রকল্প ফুটে ওঠে তার কবিতার শরীর জুড়ে। ছড়িয়ে যায় হাজার প্রেমিকের হৃদয়ে এক প্রেমিকের প্রেম। একটি মুখের জন্য লক্ষ মুখ মিলিত হয় একটি মিছিলে। সংগোপনে থাকা শব্দগুলো সশব্দে বেরিয়ে আসে অসংখ্য মুখের উচ্চারণে। ছড়িয়ে পড়ে কণ্ঠস্বরে ভাষার দ্যোতনায়। এভাবে শহীদ কাদরীর কবিতা জয়ী হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে হৃদয়গ্রাহী।

লেখক : প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন