শাবাশ তুহিন

আপডেট: 09:09:33 06/05/2018



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরের পাড়দিয়া গ্রামের হত-দরিদ্র আনিছুর রহমানের ছেলে তুহিন হোসেন। সে যশোর বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
গরিব পরিবারে জন্ম নেওয়া তুহিন নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে কাজ করেছে বাবা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে। ভেঙেছে ইট, করেছে রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ। ছোটবেলা থেকে বন্ধুর পথ চলা তুহিন শত কষ্টের মাঝেও ছাড়েনি লেখাপড়া। অবশেষে সফলতার মুখও দেখেছে সে।
বাবা দিনমজুর আনিছুর রহমান ও মাতা মর্জিনা খাতুনের তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে তুহিন দ্বিতীয়। ছোট বেলা থেকেই সে ক্লাসে প্রথম হতো।
তুহিনের ছোট বোন তৃষা খাতুন এখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। কয়েক বছর আগে তৃষার হৃৎপিণ্ডের দুটো বাল্ব ছিদ্র হয়ে যাওয়ায় দিনমজুর পরিবারে যে সহায়-সম্বল ছিল তার সবটুকু বিক্রি করতে হয়েছে আনিছুরকে। তবুও পুরোপুরি চিকিৎসা হয়নি তৃষার। তৃষা অসুস্থ হওয়ার সময় ২০১২ সালে তুহিন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে ট্যালেল্টপুলে বৃত্তি পায়। বোনের অসুস্থতার কারণে হঠাৎ আর্থিক সংকটে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। তুহিন নেমে পড়ে রাস্তার কাজে। তখন উপজেলার জি এইচ পাড়দিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিকীর নজরে আসে তুহিন। পড়ালেখার প্রতি অসীম আগ্রহ ও মেধা দেখে তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেখাভালের দায়িত্ব নেন আবু বকর।
২০১৫ সালে ওই বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫সহ আবারো ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় তুহিন। সংসারে অভাব থাকলেও এরপর থেকে লেখাপড়া শিখে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে তুহিন। ভর্তি হয় বিজ্ঞান বিভাগে নবম শ্রেণিতে। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া তুহিন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এবারো গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
তুহিনের বাবা সব হারিয়ে এখন ভাড়ায় ইজিবাইক চালান। ফলে ভালো ফলাফল করেও পড়ালেখা চালিয়ে নিতে পারবে কি-না সন্দিহান তুহিন।
তুহিন বলে, ‘ভালো ফলাফলের জন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে চিকিৎসক হতে চাই। আমি মা-বাবার কষ্ট ঘুচাতে চাই। শিক্ষকদের ঋণ শোধ করতে চাই। কিন্তু কীভাবে পাড়ি দেবো সামনের এই পথ!’
তুহিনের বাবা আনিছুর রহমান বলেন, ‘আর পাঁচজনের ছেলে-মেয়ের মতো আমার তুহিনকে ভালো কাপড়-চোপড়, বই-খাতা, এমনকি দুই বেলা দুই মুঠো ভালো খাবারও দিতি পারিনি। ছেলের এত ভালো খবর শুনে বাবা হিসেবে আমার আজ লজ্জা লাগছে।’
তুহিনের শিক্ষক ও অনুপ্রেরণাদাতা আবু বকর সিদ্দীক বলেন, ‘তুহিনের মেধা ও পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে আমার স্কুলে ভর্তি করি। নিজের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাকে সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। বরাবরই ভালো ফলাফল করে সে তার কথা রেখেছে। ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষার জন্য এখন তার সহযোগিতা একান্ত দরকার।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল গফুর বলেন, ‘বাবা গরিব হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে তুহিনকে রাস্তার কাজে যেতে হয়েছে। আমার স্কুলের এক শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় আজ তুহিন এত ভালো করেছে।’
তিনি তুহিনের সার্বিক কল্যাণ কামনা করেন।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় পাড়দীয়া হাইস্কুলের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে আটজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তুহিনসহ পাঁচজন জিপিএ-৫ পেয়েছে।

আরও পড়ুন