শাসকদের ‘ব্লু হোয়েল গেম’

আপডেট: 01:18:59 27/01/2018



img

প্রভাষ আমিন

গত ১২ জানুয়ারি সরকারের চতুর্থ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন,এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তার মানে এখন চলছে নির্বাচনী বছর। বছরটি সব রাজনৈতিক দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি দলের জন্য একটু বেশিই গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন তারা যত ভালো কাজ করেছে, সবকিছু নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার এখনই সময়। এতদিন যত খারাপ কাজ করেছে, তা আড়াল করতে আরও বেশি ভালো কাজ করার এখনই সময়। আপনারা যে চার বছর জনগণের কাছে যাননি, তা ভুলিয়ে দিতে হবে আরও বেশি করে তাদের কাছে গিয়ে। কিন্তু এই কথাটা বোধহয় ভুলে গেছেন সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। বিরোধীদলকে তারা মাঠেই নামতে দেন না। ফলে রাজনীতির মাঠে তাদের কোনও প্রতিপক্ষ নেই। তাই যেন তারা মেতে উঠেছে আত্মধ্বংসী প্রবণতায়। বছরের শুরু থেকেই এই প্রবণতা শুরু হয়েছে এবং দিনে দিনে তা বাড়ছে।
দিনদশেক আগে কক্সবাজার-৩ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল তার সরাসরি শিক্ষক সুনীলকুমার শর্মাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন।  সংসদ সদস্যের ভাষায়, সেই শিক্ষকের অপরাধ—তিনি আওয়ামী লীগবিরোধী। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করাটা কবে থেকে বাংলাদেশে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, সেটা বলেননি সেই এমপি।
হকার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে গত সপ্তাহে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। হামলা চালানো হয় সরকারি দলের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ওপর। সেই ঘটনায় সন্ত্রাসী নিয়াজুলের অস্ত্রসহ হামলা করার ছবি এখন সবার হাতে হাতে। পরে সে গণপিটুনিও খেয়েছে। কিন্তু অস্ত্র হাতে নিয়াজুলের ছবিটাই নারায়ণগঞ্জের ঘটনার হাইলাইটস। সমস্যাটা হলো কক্সবাজার বা নারায়ণগঞ্জের কোনও ঘটনার প্রভাব কিন্তু শুধু সে এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সেই ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব  স্নোবল ইফেক্ট নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। আর এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এত বেশি সক্রিয়, যেকোনও একটা ছবি ভাইরাল হতে সময় লাগে না।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক ও সদস্য নিয়োগ নিয়ে যে নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা হলো, তার দায় কার? দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দায় চাপাচ্ছেন দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপের কাঁধে, আর গোলাপ বল ঠেলতে চাচ্ছেন ওবায়দুল কাদেরের কোর্টে। দায় যারই হোক, শেষ বিচারে ক্ষতি কিন্তু আওয়ামী লীগেরই। ফেসবুকে আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত কমিটি ছড়িয়ে পড়ার প্রতিক্রিয়ায় পরপর দুদিন পদবি নিয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন ওবায়দুল কাদের। উত্তাপের প্রাথমিক সময়টা আবদুস সোবহান গোলাপ ছিলেন এলাকায়। তিনি ধানমন্ডির কার্যালয়ে এলেন রীতিমত মহড়া করে। এই মহড়া কাকে দেখানোর জন্য, কার বিরুদ্ধে?
তবে আত্মধ্বংসী রাজনীতির এই প্রবণতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ২৮ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন হচ্ছে না। ৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর থেকে গণতন্ত্র বিদায় নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে দলের ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্য থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে অনুযায়ী গত ৯ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের দখলে। ছাত্রদল এখানে অবাঞ্ছিত। বাম ছাত্রসংগঠনগুলো, যাদের আমরা হারমোনিয়াম পার্টি বলি, তারা মাঝে-মধ্যে মিউ মিউ করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় মাত্র। অনেকদিন ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছিলেন। তাদের আন্দোলন সরকার বা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নয়; নিজেদের শিক্ষা জীবন নিয়ে। এই আন্দোলনেরও পক্ষ-বিপক্ষ আছে। গত সপ্তাহে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। তারা হামলাকারীদের বহিষ্কার ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন।  সত্যটা হলো, এই আন্দোলনে আড়াল থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাম ছাত্রনেতারাই। মঙ্গলবার তারা এই দাবিতে উপাচার্যকে ঘেরাও করতে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি বড় পরিবার। এই পরিবারের অভিভাবক উপাচার্য। শিক্ষার্থীরা তাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ, দাবি-দাওয়া, আবদার নিয়ে তো উপাচার্যের কাছেই যাবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের সন্তানের মতো। উপাচার্য তাদের ক্ষোভের কথাটা দরদ দিয়ে শুনতে পারতেন, মানার মতো হলে মানতে পারতেন, অন্তত আশ্বাস দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি নিজেকে কলাপসিবলে বন্দি করে রাখলেন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সেই কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে এগিয়ে যান। উপাচার্য পেছনের গেট দিয়ে চলে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা মাটিতে বসে পড়ে তাকে আটকে দেন। শুনেছি, কেউ কেউ উপাচার্যের সঙ্গে বেয়াদবিও করেছেন। দাবি যত ন্যায্যই হোক, উপাচার্যের সঙ্গে বেয়াদবি করাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা করেছেন, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দিতে হবে। কলাপসিবল গেটের তালা ভাঙাটাও ঠিক হয়নি। কিন্তু যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের অতীত জানেন, তারা বুঝবেন, উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখা বা কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে ফেলা, খুব বড় ঘটনা নয়। আগেই বলেছি, উপাচার্য বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, তাদের সান্ত্বনা দিতে পারতেন, আশ্বাস দিতে পারতেন। সেটা যদি নাও পারেন, তিনি প্রক্টরকে বলে তাকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ ডাকতে পারতেন। যদিও আমি মনে করি, পুলিশ ডেকে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ দমন করা সম্ভব ছিল না। তাতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারতো। কিন্তু উপাচার্য নিজেকে বাঁচাতে বলি দিয়ে দিলেন ছাত্রলীগকে। নিজেকে উদ্ধারে তিনি ডাকলেন ছাত্রলীগকে। যা হয়, ছাত্রলীগ সেখানে গিয়ে পিটিয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিয়ে উপাচার্যকে উদ্ধার করে। তাদের হামলায় সাংবাদিকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। ছাত্রলীগ নেত্রীরা হেনস্থা করেছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্রীদের। ছাত্রলীগ দাবি করেছে, ‘বাম সন্ত্রাসী’দের হামলায় তাদের ১২ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আমি তাদের দাবি অবিশ্বাস করিনি। মারামারি হলে দুই পক্ষের লোকই আহত হবেন। ছাত্রলীগের শক্তি বেশি, তাই তাদের আহত হওয়ার সংখ্যা কম।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ছাত্রলীগ সেখানে গেল কেন? রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে তো তাদের কোনও কর্মসূচি ছিল না। উপাচার্য ডাকলেই তারা ছুটে যাবে কেন? তারা কি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লাঠিয়াল? ছাত্রলীগ আর দশটি ছাত্র সংগঠনের মতোই একটি সংগঠন। হতে পারে তারা ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট, তাদের সমর্থন-প্রভাব বেশি। কিন্তু ছাত্রলীগের দায়িত্ব কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা উপাচার্যকে উদ্ধার করা নয়। প্রয়োজনে ছাত্রলীগ পাল্টা কর্মসূচি দিতে পারতো। কিন্তু বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে উপাচার্যকে উদ্ধার করা কোনোভাবেই তাদের কাজ নয়। উপাচার্যকে বাঁচাতে গিয়ে তারা নিজেদের ভাবমূর্তিতে আরেকবার কালিমা লেপন করলো। যেহেতু মার্চে ছাত্রলীগের সম্মেলন। তাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ ছিল। যার প্রকাশ ঘটেছে সেদিনের ঘটনায়। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় যেমন সন্ত্রাসী নিয়াজুলের অস্ত্র হাতের ছবি, রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের ঘটনায়ও তেমনি ছাত্রলীগ নেত্রীর আরেক ছাত্রীকে হেনস্থার ছবি এখন ভাইরাল। নির্বাচনের সময় নিশ্চয়ই এই ছবিগুলো প্রতিপক্ষ ব্যবহার করবে বারবার। শেষ বছরে যখন অতীতের কালিমা মুছে সরকার ও সংগঠনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কথা, তখন বিরোধীদের হাতে নতুন নতুন অস্ত্র তুলে দেওয়া আত্মধ্বংসী প্রবণতা। সরকারি দল যেন মেতে উঠেছে ব্লু হোয়েল গেমে।
[লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএনএন নিউজ। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]