শাহনাজ পারভীন-এর ‘একাত্তরের আগুন সময়’ : সময়ের সমান্তরালে

আপডেট: 12:21:22 22/05/2017



img

সাইদ হাফিজ

সময়- তিন অক্ষরের এই সমতল শব্দটির আয়তন সামান্য হলেও এর ব্যাপ্তি ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি’-র মতো ব্যঞ্জনাময়। সময় বয়ে চলে খানিকটা অবচেতন প্রক্রিয়ায়। ‘সময়টা গড়িয়ে যায় নদীর স্রোতের মতো বাঁধভাঙা জোয়ারের সাথে তাল মিলিয়ে’ (এ. আ. স., পৃ.-১৪৩)। সময়ের মধ্যে বসবাস করে সময়ের অস্তিত্ব উপলব্ধি করা কঠিন, কিন্তু সময় করে ‘সময়’ নিয়ে ভাবতে বসলে সময়ে কুলায় না। তবে সময়ের সহজাত ধর্ম পরিবর্তনশীলতাই সময়ের প্রবহমানতা অনুধাবনে অনুকূল ভূমিকা পালন করে।
সাহিত্য সময়ের নান্দনিক সংবেদ। মহাকালের প্রবহমানতায় মানুষের অবস্থান জানার জন্য সাহিত্যের দ্বারস্থ হওয়ার বিকল্প নেই। ছোটোগল্প বাংলা সাহিত্যের সর্বকনিষ্ঠ প্রকাশ মাধ্যম। নাতিদীর্ঘ এই শিল্পমাধ্যমের শক্তি সময়ের মতো তাৎপর্যপূর্ণ। প্রবহমান জীবনের প্রত্যহ ভেসে চলা ‘সহস্র বিস্তৃত রাশি’ থেকে ‘দু চারিটি অশ্রুজল’-কে মূর্তিমান করে তোলাই এর প্রধান শিল্পকৌশল; অনেকটা সমুদ্রকে ধরে কলসিতে বন্দী করার মতো। ঠাকুরের হাতে গড়া এই ‘কালের পুত্তলিকা’ আজন্ম রূপবান হলেও পরবর্তী গল্পসাধকদের একান্ত অনুধ্যানে তা রঙে-রসে আরও পরিপুষ্ট হয়ে উঠেছে।
শাহনাজ পারভীন মূলত কবি; শান্ত স্বরের কবি। কাব্যসাধনার ধারাকে তিনি প্রবাহিত করেছেন কথাসাহিত্যের সমুজ্জ্বল সমুদ্রে। উপন্যাসের পাশাপাশি জীবন ঘষা অভিজ্ঞতাকে রূপ দিয়েছেন ছোটগল্পে। ‘একাত্তরের আগুন সময়’ তার দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ। এ-গ্রন্থে বাইশটি গল্প স্থান পেয়েছে। অবশ্য তাদের মধ্যে দু একটি বাদ পড়লেও এর বিশেষ অঙ্গহানি হোতো না বরং সৌন্দর্যের বাঁধন হোতো শক্ত। এ-গ্রন্থের নাম ‘একাত্তরের আগুন সময়’ হলেও এতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প আছে মাত্র দুটি। তাতে নামকরণের ব্যর্থতা খোঁজার সুযোগ নেই; কারণ এ-নামের মধ্য দিয়ে গল্পকার বিরূপ বিশ্বে বিযোড় মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জীবনযুদ্ধকে প্রতীকায়ীত করেছেন নিপুণ শিল্পকুশলতায়।
 ‘যুদ্ধ তাকে যুদ্ধ শিখিয়েছে’ (এ. আ. স., পৃ.-২২)
প্লট মূলত ঘটনা সাজানোর প্রক্রিয়া। এ-ক্ষেত্রে গল্পকার প্রায় প্রতিটি গল্পে ফ্ল্যাশব্যাক থিওরি অবলম্বন করেছেন। গল্পকার কবি হওয়ায় বোধহয় এ পদ্ধতি ব্যবহারেই তিনি সবচেয়ে সাচ্ছন্দ বোধ করেন। কারণ ‘কবিরা স্মৃতিজীবী। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ কবির কাছে জীবন্ত’। বর্তমানে বসে লেখক অতীতের বর্ণনা করেছেন। অনেকটা স্বপ্নের মতো সহজ তার যাওয়া-আসা। তবে তা মোটেও তরল বিবরণ নয়। গল্পের বয়ান পাঠকের গভীর মনোযোগ দাবী রাখে। বিষয়ের দিক থেকে আলাদা হলেও বিষয়ীর দিক থেকে সবগুলো গল্পই প্রায় কাছাকাছি। গল্পের আকৃতি ছোট হলেও অধিকাংশ গল্পের প্লটই মহাকাব্যধর্মী– আদি, অন্ত, মধ্য সম্বলিত। চরিত্রগুলো নানা জায়গা পরিভ্রমণ করে আবার একটি বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। সে-দিক থেকে দেখতে গেলে তার গল্পগুলো উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত।
আধুনিক সময়ে গল্পের বিষয়ের চেয়ে বিষয়ী অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই কাহিনীর চেয়ে করণকৌশলই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এ-গল্পগ্রন্থে কাহিনীর উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন লেখকের চারপাশে নিত্যদিন ঘটে যাওয়া নানান ঘটনাবলীকে। একান্ত ব্যক্তিগত জীবনাভিজ্ঞতাকে লেখক কাজে লাগিয়েছেন ধ্যানী শিল্পীর মহিমায়। মুক্তিযুদ্ধ, জীবন, নারীর সংগ্রাম, প্রেম-বিরহ, আনন্দ-বেদনা, ও মনোজাগতিক বিকার তার গল্পের মূল উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠেছে। গল্পের কাহিনী বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি উল্লম্ফনধর্মিতার আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে তার যাতায়াত হয়েছে অনায়াস ও সহজতর।
সাহিত্যে চরিত্র লেখকের প্রতিনিধিত্ব করে। চরিত্রের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে লেখক তার শিল্পস্বার্থ চরিতার্থ করেন। এককথায় চরিত্র লেখকের হাতের পুতুল। ছোটগল্পে চরিত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। চরিত্রকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় ছোটগল্পের ঘটনা-বলয়। ‘একাত্তরের আগুন সময়’-এ প্রায় সব কটি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুদর্শন, শিক্ষিত, মার্জিত, আধুনিক, রুচিশীল। কেন জানি মনে হয় লেখক এই চরিত্রগুলোকে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে পরিশুদ্ধ করে গল্পে স্থান দিয়েছেন।
এ-গ্রন্থের বাইশটি গল্পের মধ্যে ষোলটি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী। তাদের মধ্যে তিন জন ডক্টরেট ডিগ্রিধারী, বাকিরা মোটামুটি শিক্ষিত– জীবনবোধে টইটম্বুর। তারা পত্রিকা পড়ে, ক্রোমোজোম বোঝে, চাকরি করে, জগতের হাল-হকিকত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এই চরিত্রগুলো গল্পকারেরই এক একটি ব্যক্তি ভাষ্য। গল্পকার তাদের সাথে গা ঘষাঘষি করে দাঁড়িয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কণ্ঠে লেখকের কণ্ঠস্বর পর্যন্ত স্পষ্ট। এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় গল্পকার তাদের জিতিয়ে দিয়েছেন কিংবা দিতে চেষ্টা করেছেন। তার নারীবাদী জীবনবোধ সচেতনভাবেই নারীকে পুরুষের সমতলে দাঁড় করিয়েছে।
‘ও নিজের অজান্তেই তাজুল হয়ে উঠতো’ (এ. আ. স., পৃ.-১৯)
সাহিত্য দুধ নয়; সাহিত্য ঘি। দুধ বেশিক্ষণ টেকে না কিন্তু দুধ থেকে তৈরি ঘি টিকে থাকে যুগ যুগ। আর পুরনো ঘি তো মহৌষধ। সাহিত্যের ভাষা তাই নিত্যব্যবহার্য সংবাদপত্রের প্রতিবেদনীয় ভাষা থেকে অনিবার্যভাবে আলাদা হওয়া বাঞ্ছনীয়। এছাড়া আধুনিক সময়ে বৈশ্বিক বিবিধ অভিঘাতে ব্যক্তি মানুষের অন্তর্জগৎ কাচের টুকরোর মতো মিছমার হয়ে ছড়িয়ে গেছে। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পুঁজিবাদ, প্রযুক্তির রমরমা আগ্রাসন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক যোগাযোগের বিকৃতি আত্মিক সংযোগকে শিথিল করে মানুষকে নৈরাশ্যের নীরব সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছে। এই বিশাল পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা আছড়ে পড়েছে হতাশাচ্ছন্ন মনোজগতের নিঃসঙ্গ উপত্যকায়। ‘যাদের আপাত গম্ভীর মুখচ্ছবির মেপে মেপে সূক্ষ্ম রেখার হাসি এবং বাহ্যিক গাম্ভীর্যের অতলে মূল সত্তাই লাপাত্তা’ (এ. আ. স., পৃ.-১০৬)। মানুষের এই অন্তর্জগতের জরাজীর্ণতাকে কি সাধারণ চলতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব? তাকে মূর্তিমান করার জন্য সাহিত্য কি আলাদা ব্যক্তিভাষার দাবি রাখে না? রাখে বৈকি! ব্যক্তি মানুষের অনুভূতিকে স্পর্শ করার মতো ভাষা শাহনাজ পারভীন তার ছোটগল্পে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
‘সে কোনটা ব্যাগে ঢুকায় আবার কোনটা গড়িয়ে পড়ে ব্যাগ থেকে। ব্যাগের চেন তাকে আটকে রাখতে পারে না। গড়িয়ে যায় ঘর ভর্তি। নড়াচড়া করে, এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়। হাঁটে, হাসে, কান্না করে’ (এ. আ. স., পৃ.-৪৮)।
জড় বস্তুতে মানবীয় অনুভূতি আরোপের এই প্রক্রিয়াকে নন্দনতত্ত্বে বলে এক্সপ্রেশনইজম। জীবনের বাস্তবতার সাথে সাহিত্যের বাস্তবতার মোটা দাগের পার্থক্য এখানেই স্পষ্ট। কল্পনা এবং বাস্তবতার মধ্যে যতটুকু পার্থক্য- ততটুকুই শিল্প; ততটুকুই সাহিত্য।
রসবোধসম্পন্ন অলঙ্কারপূর্ণ সুললিত বাক্য ব্যবহারেও গল্পকার দক্ষ শিল্পীর মতো পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
‘সে চেয়েছিল বাসন্তি লাল কিংবা কৃষ্ণচূড়ার সমাহারে ফুলে ফুলে শোভিত বিলোড়িত জীবনের হাতছানি’ (এ. আ. স., পৃ.-৪৮)।
তবে কোথাও কোথাও তিনি নির্বিচারে এলোপাতাড়ি ফেসবুকীয় ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত ভাষা ব্যবহার করেছেন। যদিও বাস্তবতা হচ্ছে বর্তমান সময়ের কিছু কিছু শিক্ষিত-অর্ধ শিক্ষিত মানুষ এ-ভাষায় কথা বলছেন বটে কিন্তু তা কি পুরো বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে? ভুলে যাইনি, ভাষার ধর্ম পরিবর্তনশীলতা। তবে এই ফেসবুকীয় ভাষাই কি বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ?
‘প্লিজ তোমরা তোমাদের কনসেপ্টটা পাল্টাও’(এ. আ. স., পৃ.-১৯)।
‘বাবা মায়ের মতো কে ওকে টেক কেয়ার করবে’(এ. আ. স., পৃ.-৪৬)।
‘ও নিজেই যেখানে গেস্টের মতো লাইফ লিড করছে’(এ. আ. স., পৃ.-৮২)।
‘বন্ধুরা সব সস্ত্রীক সেলিব্রেট করার জন্য মিলিত হয়’(এ. আ. স., পৃ.-৯৮)।
গল্পকারের অবচেতনে এই দেদার ইংরেজি শব্দের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে ভাষাকে ‘ছেড়া জুতোয় নতুন ফিতের মতো’ বেখাপ্পা করে তুলেছে। পড়তে পড়তে মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে বারবার; কল্পনা থেকে ছিড়ে পড়েছি বাস্তবে। এ বিষয়ে গল্পকারের নিজের বক্তব্যই তার বিপক্ষে অবস্থান করে। 
‘এক ঝাকুনি দিয়ে ওর ভাবনার ঝুলিটা এক হ্যাঁচকায় কেড়ে নেয়। অশুদ্ধ বাংলার এক লাইন তাকে আবার নামিয়ে আনে বাস্তবে’(এ. আ. স., পৃ.-৯২)।
গল্পগ্রন্থটি চলিত ভাষায় রচিত হলেও বেশ কয়েকটি সাধু ভাষার ক্রিয়া পদ ব্যবহার করেছেন। তবে সাধু-ভাষার গোটা আস্ত একটি বাক্য ব্যবহার করে গুরু-চণ্ডালী দোষ কুড়িয়েছেন শুধু একটি গল্পে।
‘আর একটু গরম কাথার ওমে শিহরণে চক্ষু মুদিয়া পড়িয়া থাকিতে চাহিয়াছিল’ (এ. আ. স., পৃ.-১৪৬)।
চরিত্রকে জীবন্ত করতে গল্পে চরিত্রানুযায়ী সংলাপ ব্যবহার করেছেন। প্রয়োজনমাফিক প্রমিত ও আঞ্চলিক কোনো ভাষা ব্যবহারেই তিনি কার্পণ্য করেননি। তবে আঞ্চলিক ভাষার সংলাপ কোথাও কোথাও ধারাবাহিকতা হারিয়েছে। চরিত্রের ভাষা আর লেখকের ব্যক্তি ভাষা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে ছোটগল্পের ধারণা বদলেছে। গল্পকারের সাধনার একাগ্রতা আছে। তার পড়াশুনা প্রশংসা করার মতো। প্রতিটি গল্পেই তার মননশীলতার গভীরতা টের পাওয়া যায়। সবগুলো গল্পের দেহসৌষ্ঠব নির্মাণে তিনি ঈশ্বরের মতো সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করেছেন। কোথাও কোথাও নীতিভ্রষ্ট হয়ে চরিত্রের সাথে একাত্ম ঘোষণা করে চরিত্রের দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করেছেন।
মানুষের অন্তরবাস্তবতার রূপায়নে তিনি যে বর্ণনাত্মক পরিচর্যা ব্যবহার করেছেন তা অনেকাংশে পরাবাস্তববাদ, চেতনাপ্রবাহরীতি কিম্বা যাদুবাস্তবতার সামিল।
‘চারিদিকে লাউয়ের ডগার মতো উদ্ধত কচি কচি সুগন্ধি ডগা ওর আশে পাশে ছেয়ে ফেলেছে। সমস্ত চর এলাকা যেন ওর মেঝো খালার সব্জির দীর্ঘ মাঠ হয়ে যায় ওর চোখের সামনে। ফনাতোলা সাপের মতন ক্রমাগত সেগুলো মৃদু বাতাসে দুলতে থাকে। কিন্তু সব্জির মাচান কিংবা লাউয়ের ডগায় তো ও কখনো এরকম সুগন্ধ পায়নি। মান্না-সালওয়ার সুগন্ধ সেটা, না ক্যাটবেরির ঝাঁঝালো নাকি স্ট্রবেরির মিহি গন্ধ সে তা আঁচ করতে পারে না। তবে এক ধরনের মাদকতা সৃষ্টি হয় ওর মধ্যে। সবকিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত ওর চারপাশে গরম ভাত আর আলুভর্তার ঘ্রাণ মৌ মৌ করে’(এ. আ. স., পৃ.-৯৫-৯৬)।
এছাড়া কাব্যধর্মী পরিচর্যা ব্যবহার করেছেন দুটি গল্পে।
‘এগুলো অন্তর্গত, বহে অবিরত। যায় না দেখা, দেখা যায় না তারে...’(এ. আ. স., পৃ.-২৩)।
‘তোমার চোখ এতো লাল কেন?’(এ. আ. স., পৃ.-৭৮)।

অলঙ্কার ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। সাহিত্যের ভাষা তাই অলঙ্কারাশ্রয়ী। সাধারণ অলঙ্কারের মধ্যে উপমা এবং উৎপ্রেক্ষাই গল্পকার ব্যবহার করেছেন বেশি।

উপমা
‘জীবনটা সূর্যের মতো’(এ. আ. স., পৃ.-৪৫)।
‘মেঘের মতো লম্বা ডানা তার’(এ. আ. স., পৃ.-৬৮)।
‘ভরা জ্যোৎস্নায় জ্বলে থাকা জোনাকের মতো হাজার তারায় ভাতের প্লেটে সাদা সাদা ভাত ফুটে আছ’(এ. আ. স., পৃ.-৮৯)।
‘বারবার দুধের সরের মতো মায়ের স্মৃতি ওর চোখের ওপর ভেসে বেড়ায়’(এ. আ. স., পৃ.-১৪৪)।

উৎপ্রেক্ষা
‘প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েটির যেন সামনে বৃত্তি পরীক্ষা’(এ. আ. স., পৃ.-৭)।
‘সকালটা যেন হঠাত করেই কালো মেঘে ছেয়ে চোখের সামনে সন্ধ্যা হয়ে গেলো’(এ. আ. স., পৃ.-১১)।
‘ট্রেতে ধবধবে চকচকে পরিচ্ছন্ন এক গ্লাস পানি যেন হাসছে’(এ. আ. স., পৃ.-১৫৭)।


লোকবিশ্বাস এবং প্রবাদ প্রবচনের ব্যবহার তার রচনাকে শক্তিশালী করেছে। মানুষের মৌলিক চিন্তাকে বাস্তবমুখী করে তুলেছে।

‘আসলের চেয়ে সুদের দরদ বেশি’(এ. আ. স., পৃ.-৪৪)
‘রাজায় করিছে রাজ্য শাসন
রাজারে শাসিছে রানী’(এ. আ. স., পৃ.-৫৫)
‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলিও লাতি খাতি আয়’(এ. আ. স., পৃ.-৬৬)
‘কোথায় আগরতলা আর কোথায় চকিরতলা’(এ. আ. স., পৃ.-৮৪)
‘যত্ন করলে রত্ন মেলে’(এ. আ. স., পৃ.-৯৩)

শাহনাজ পারভীনের গল্প মোটা দাগে মফস্বলীয় নাগরিক উচ্চমধ্যবিত্ত ফ্লাটবর্তী মানুষের কথকতা। শহর কিম্বা গ্রাম কোনটাই এখানে সেই অর্থে উঠে আসেনি। একধরনের মেকি, ফাঁপা, তথাকথিত শ্রেণীচ্যুত জনগোষ্ঠী যারা আপাত শিক্ষিত-রুচিশীল কিন্তু অন্তরে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা আছে; তারাই হয়েছে পাত্রপাত্রী। যাদের নিজেদের ইতিহাসের কোন শক্ত ভিত নেই। অথচ সাহিত্য দাঁড়িয়ে থাকে ইতিহাসের এই শক্ত ভিতের উপর। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প দুটিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস তুলে ধরেছেন তা আসলে জাতীয় ইতিহাস। তার পরও তার গল্পের বিন্যাসে এবং সাধন পদ্ধতিতে একধরনের একাগ্রতা আছে। তার চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই।