শিক্ষার্থী নির্যাতনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই

আপডেট: 01:24:44 29/01/2018



img
img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় বেড়েই চলেছে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা। খবর এলে গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ফলাও করে রিপোর্ট হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না শিক্ষা প্রশাসন।
মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি তিন মাস অন্তর এবিষয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হলেও উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা তথ্য গোপন করছেন বলেও অভিযোগ। ফলে আক্রান্ত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে মাত্র একটি তথ্য পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ে। যে অভিযোগটি উঠেছিল সদর উপজেলার জিএন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে। ইতিমধ্যে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতিও পেয়েছেন। এছাড়া আর কোনো অভিযোগ প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের কাছে নেই।
আর মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে গত একবছরে কোনো তথ্য পাঠানো হয়নি।
জেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, ‘আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টও দেখা হয় না।’
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত ১৬ জানুয়ারি আশাশুনির দক্ষিণ চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শারমিন নাহার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী পাশের গ্রামের বিকাশচন্দ্র সরকারের মেয়ে বৃষ্টিকে মারপিট করেন। এ ঘটনায় বৃষ্টির বাবা স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে অভিযোগ করেন। সভাপতি মোহাম্মাদ আলি সে সময় ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বৃষ্টি তার সহপাঠীদের সঙ্গে কথাকাটাকাটি করে। সহকারী শিক্ষক শামিমা পারভীন তা জানতে পেরে তাকে মারপিট করেন। বৃষ্টির মা-বাবার অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসার শামছুন্নাহারকে অবহিত করা হয়।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওয়াদিয়া বেগম ছাত্রীকে মারের অভিযোগ নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু এই ঘটনায় আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেননি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার।
এর আগের দিন একই উপজেলায় অনুমতি ছাড়া বাইরে যাওয়ায় দীঘলারাইট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী তমা আক্তারকে পিটিয়ে মারাক্তক জখম করার অভিযোগ ওঠে সহকারী শিক্ষক রেশমা খাতুনের বিরুদ্ধে। ওই দিনই তমার বাবা আলমগীর হোসেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এসে অভিযোগ করে বলেন, ২০১৭ সালে দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা চলাকালে সহকারী শিক্ষক রেশমা খাতুন এক ছাত্রীর খাতায় লিখে দেন। বিয়ষটি ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মাজেদকে অবহিত করে তার মেয়ে তমা। এর পর থেকে এই শিক্ষক তমার ওপর ক্ষিপ্ত হন। চলতি বছরে তৃতীয় শ্রেণির নতুন ক্লাস শুরু হলে বিভিন্ন অজুহাতে তমাকে মারতে থাকেন শিক্ষক রেশমা। সবশেষ গত ১৫ জানুয়ারি অনুমতি না নিয়ে বাইরে যাওয়ায় তমাকে পিটিয়ে জখম করেন শিক্ষক রেশমা খাতুন। পরে স্কুল থেকে তমাকে উদ্ধার করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার সতত্য স্বীকার করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মাজেদ। তিনি বলেন, পরীক্ষার উত্তরপত্রে লিখে দেওয়ার কথা তমার বাবা আমার কাছে অভিযোগ করেছিল। কিন্তু প্রধান শিক্ষক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এমনকি তমাকে পিটিয়ে জখম করারও ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাও নেননি প্রধান শিক্ষক।  
গতবছর ১৭ সেপ্টেম্বর বানান ভুল করার অপরাধে কলারোয়ার জিকেএমকে পাইলট হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সুদীপ্ত ঘোষকে শ্রেণিকক্ষে পিটিয়ে আহত করেন ইংরেজির শিক্ষক মনিরুজ্জামান। আহত অবস্থায় তাকে কলারোয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আহত ছাত্রের বাবা উপজেলার তুলসীডাঙ্গা গ্রামের সুভাস ঘোষ সে সময় অভিযোগ করেন, তার ছেলে সুদীপ্ত ঘোষ কলারোয়া জিকেএমকে পাইলট হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সপ্তম শ্রেণিতে থাকার সময় স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক মনিরুজ্জামানের কাছে প্রাইভেট পড়তো। অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর থেকে মনিরুজ্জামান আবার তার কাছে প্রাইভেট পড়াতে ও নির্ধারিত গাইড অনুসরণ করতে চাপ দেন। শিক্ষক মনিরুজ্জামানের নির্দেশিত গাইড অনুসরণ না করা ও তার কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণে সুদীপ্তের ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন ওই শিক্ষক। ঘটনার দিন শ্রেণিকক্ষে একটি ইংরেজি শব্দের বানান ঠিক করে বলতে না পারায় শিক্ষক মনিরুজ্জামান বেতের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট করেন সুদীপ্তকে। এসময় ভয়ে শ্রেণিকক্ষের অন্য শিক্ষার্থীরা দৌঁড়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। পরে জানতে পেরে সহকর্মী শিক্ষকরা এসে সুদীপ্তকে উদ্ধার করে অফিস কক্ষে নিয়ে বাড়িতে খবর দেন। পরে আহত সুদীপ্তকে নিয়ে কলারোয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুদীপ্তর দুই হাতে ৮-১০টি আঘাতের চিহ্ন ও বাম বাহুতে আঘাতের ফলে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন কলারোয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শফিকুল ইসলাম।
সুদীপ্তর বাবা-মা সে সময় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার দাবি করেন। কলারোয়া জিকেএমকে হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রব ঘটনা স্বীকার করে অভিযুক্তের বিরু্েধ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার উত্তর কাটিয়া দাসপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আনছার আলী (৪৫) কোচিং ক্লাসে পঞ্চম শ্রণির এক ছাত্রকে বেধড়ক মারপিট করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় আহত ছাত্রের বাবা বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি অভিযোগ দেন। আহত ছাত্রের নাম মো. আব্দুর রহমান পিয়াল (১২)। তার রোল নম্বর ছিল ২। সে উত্তর কাটিয়া এলাকার মো. আল মামুন মুন্নার ছেলে।
ওই দিন রাত দশটার দিকে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র পিয়াল ও তার অভিভাবকরা জানান, ওই ছাত্র অন্য দিনের মতো বিকেলে কোচিং ক্লাস করতে বিদ্যালয়ে যায়। বিদ্যালয়ের মাঠে সহপাঠীদের সঙ্গে খেলা করার এক পর্যায়ে এক সহপাঠীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় পিয়ালের। এসময় পিয়ালকে রুমে ডেকে বেধড়ক মারপিট করেন প্রধান শিক্ষক মো. আনছার আলী।
পিয়াল অভিযোগ করে, ‘স্কুল শেষে প্রতিদিন বিকেলে স্যারের কাছে কোচিং করতে হয়। আমরা এক সাথে প্রায় ২০-২৫ জন কোচিং করি। প্রতি জন ৩০০ টাকা হারে কোচিং বাবদ স্যারকে দিতে হয়। কোচিং ক্লাসে প্রতিদিন স্যার কাউকে না কাউকে মারে।’
পিয়ালের বাবা মো. আল মামুন মুন্না জানিয়েছিলেন, ঘটনার ব্যাপারে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। অভিযোগের তদন্ত করেন এসআই আসাদুজ্জামান। বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা অফিসারকেও তখন জানানো হয়।
মুন্না অভিযোগ করেছিলেন, বিষয় মীমাংসা করার জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা বিভিন্নভাবে তাকে চাপ প্রয়োগ করছেন। কিন্তু তিনি নতি স্বীকার করেননি। তবে বিচারও পাননি।
২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট শিক্ষকের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য ফিলিং স্টেশন থেকে পেট্রোল না আনায়  চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করার অভিযোগ ওঠে কালিগঞ্জ উপজেলার উত্তর কালিগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। আহত শিক্ষার্থীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। 
সে সময় আহত শিক্ষার্থীর বাবা সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী কালিগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের আব্দুল মান্নান জানান, তার ছেলে হাসিবুল হোসেন পলক উত্তর কালিগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র হিসেবে পড়াশুনা করছে। সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের জন্য পেট্রোল কিনতে হাসিবুল হাসান পলককে কালিগঞ্জ বাসটারমিনাল-সংলগ্ন কালিগঞ্জ ফিলিং স্টেশনে একটি বোতল দিয়ে পাঠান। পাম্প কর্তৃপক্ষ ছোট শিশুর কাছে পেট্রোল বিক্রি না করায় পলক পাশের জয়নুল আবেদীনের দোকান থেকে পেট্রোল কিনে নিয়ে যায়। পাম্প থেকে পেট্রোল না আনায় শিক্ষক কামরুল ইসলাম ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে গালিগালাজ করেন।
তিনি আরো জানিয়েছিলেন, সেই দিন ছুটি থাকায় সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম ঘটনার দিন সকাল সাড়ে আটটার দিকে স্কুলে কোচিং চলাকালে আগের ঘটনা তুলে ধরে পলককে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে জখম করেন। সহপাঠী রাকিব ও সুমন ঠেকাতে গেলে তারাও শিক্ষকের লাঠির আঘাতে আহত হন। আহত হাসিব বাড়ি ফেরার পর তাকে কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক হাবিবুল্লাহ বেলালী সে সময় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, হাসিবুল হোসেন পলকের পিঠে ও ডান হাতে লাঠির আঘাতের কয়েকটি চিহ্ন রয়েছে। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর  বাড়িতে বিশ্রামে পাঠানো হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটছে। কিন্তু শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্টদের একই কথা, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু অভিযোগ দিয়েও ন্যায্য বিচার না পাওয়ার ঘটনা অনেক।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নির্যাতনের যে কোনো অভিযোগ কিংবা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসংক্রান্ত খবর অভিযোগ আকারে গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে। কিন্তু সে নির্দেশনা উপেক্ষা করে তথ্য গোপন করছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসন।
এসব বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। তাই বিষয়টি পুরোপুরি আমার জানা নেই।  তবে, প্রকৃত তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো উচিৎ। যদি কোনো উপজেলা শিক্ষা অফিসার তথ্য গোপন করেন, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘এবিষয়ে এখনো অনেকের মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। প্রাথমিকভাবে বুঝিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকার থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখে বার বার সতর্ক করা হচ্ছে। তারপরও যদি কেউ না মানতে চায়, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন