শিশির আজম-এর ৬টি কবিতা

আপডেট: 01:10:55 13/05/2017



img

চে গুয়েভারার মৃত্যুবার্ষিকীতে

নির্জন ঘড়িটি সহ্য করতো
নিভে যাওয়া আকাশের চিৎকার
ঘাসের শূন্য জগতের বিরুদ্ধতা
আমার অবরুদ্ধ বোনকে জিগ্যেস করে দেখেছি
বায়ুতে বালির উপস্থিতি সে টের পায়

হাঙর হাঁটতে হাঁটতে কুড়েঘর পেরোলো
কুড়েটার জন্য মায়া
তার আগ্রহ ও অবস্থান
সবুজ নিঃশ্বাসের দিকে শংকা
গোল ফুটবল
চুইংগামের মতো
লেগে আছে শার্টের কলারে
সুনামি স্তরের যোগাযোগ মাধ্যম
অনেক উচুতে উঠে গেল
যেন ঘড়িটি
দেখেনি তার নির্জনতা
 

জঙ্গল ও ঢালের গল্প

পথ কীভাবে উল্টো দিকে সেঁধিয়েছিল সেই শৈশব বেঁচে আছে এই মৃতদেহগুলোকে গিলে। হারিয়ে যাওয়া সুলতানার চোখে কুয়াশা। আর ভূগর্ভস্থ লাভার ছিটে তোমার হৃদপিন্ডে। এভাবে ভূতের প্রেমে তোমার ভবিষ্যৎ দেবশ্রী।

বুনো জন্তুরা সব সময়ই ভীতিকর। যদি খুলে পড়ে বিদ্যালয় ও সাদা পোষাকের বাকল! সেই উৎপাদন ও উদবৃত্ত থেকেই অধরা বটশাখা মালিক হয়েছিল খোমড়ের।

এ্যাশট্রেতে ছাই হয়ে আছে রুমাল। নখে শয়তানের গু।

সাদা পায়রাদের ডানা ছিড়ে বানালে কবিতা। এটা ভাবা বোকামী যে রাজা ও অভিনেতারা নির্বুদ্ধিতায় কখনো তিন নম্বর হয়না।

জঙ্গলে ও ঢালে ভূকম্পন। আতঙ্ক রাজপুরিতে।

থিয়েটার হলের ধোঁয়া পাক খেয়ে খেয়ে ছুটেছে নিরীহ পাজামাগুলোর অভ্যন্তরে। সুড়ঙ্গে মাংস পোড়ানো বাদ্য। তারা ঢেঁড়শশর্তে বৃত্ত পাকায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে থাকে। শরবত, ফরাসী চকলেট আর অপরিপক্ক দাঁতে মাছরাঙাথলে ভর্তি।

কী হবে, কী হবে সাহিত্য সম্পাদকের টেবিলে লিঙ্গপ্রদেশের গুচ্ছগুচ্ছ কেশ?

সুলতানা তার শরীর ও ক্ষত দিয়ে তোমাকে ঢাকছে।
 

জীবন কেন মজার হবেনা

আমার বৌ
আমার বন্ধুদের কারোর মতই না।
অবশ্য
তাকে আমি ভালবাসি।

যে কথা আমি বলিনে সেটাই আমার কথা
তারা আলো নিভিয়ে দেয়
আর আমি নেমে পড়ি অভিযাত্রায়
তারা আমাকে দেখতে পায় না।

আমি যেমন
আর যেদিকে পথ,
কেউ কি বলতে পারে
তার অভিমান
তার গেরস্থালি
তার পবিত্র স্তনজোড়া
তাই?

বললাম
অবশ্যই আমার মেয়ের
বাংলা নাম রাখবো।
আর আমার বৌ
রোদে পা ছড়িয়ে
চুলে তেল মাখে।



ষড়যন্ত্র

আমরা রয়েছি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে
অথবা বলা যায় একই জায়গায়

একটা ষড়যন্ত্রে সবাই কাছাকাছি

সেই মুহূর্তটি আসার আগ পর্যন্ত
এক হবে না দু’চোখের পাতা

র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের একটি দল
যে কোন দিন যে কোন মুহূর্তে এসে দাঁড়াবে
আমার উঠোনে

জিপে উঠিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হবে নির্জন কোথাও
তারপর ঠুস করে একটা শব্দ হবে

অবশ্য খবরের কাগজে ও টিভিতে
বরাবরের মতো
রিপোর্টটা আসবে একটু অন্যভাবে

‘পলায়নের সময় র্যা বের হাতে চরমপন্থী নিহত’
            অথবা
‘ক্রসফায়ারে নিহত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমুক’
            অথবা...

আসল ব্যাপারটা সবাই জানে

আর
একটা গুলিতে একটা ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে যায় না
 

ইবলিসের ছায়া

অন্ধকারে আমার ছায়া খেলছে আমার বনবিড়ালের সঙ্গে
সমস্ত দিনের ধুলোকালি
যেন ধাবিত নির্দিষ্ট আদিম শিলামুখে
শুধু কালো কালো ফুল
শিকড় কাটলে গাছ বাঁচেনা

মুরগির খাঁচার ভিতর ছোটমনিরা তখন খেলছিল
খাঁচার গায়ে রোদের বহুভাষাবিদ ভ্রুণ
তারা আমাকে ঠেলে দেয় তিন মাথাওয়ালা সমুদ্রে
নিভে গিয়ে ফের জ্বলে উঠি ছোট ডিঙিনৌকোর মতো

সেই অতৃপ্ত পৃথিবী মানুষের নাগালের বাইরে
এক ফোঁটা শিশির
নিঃশেষিত হয়েছিল সূর্যে
নাকি রোদে ছড়িয়ে দিয়েছিল নিজেকে
চুলোর ধারে বসে আছে বিড়াল
এখনই ঘুমিয়ে পড়বে গোঁফজোড়া বাইরে রেখে

রাত যত গভীর হয়
স্পষ্ট হয়ে ওঠে গাছ আর তারাদের নিশ্বাস
বাতাসে প্রবল উপস্থিতি
মাধ্যাকর্ষণ অনুজীবসমূহের

জীবিত থাকলে বলতাম
দেখ আমার জঙ্গলমহাল আর বনঝাউয়ের সরু গুঁড়ি
আমার বিশ্বাসঘাতকতার চেয়ে হিংস্র



সুশীল সমাজ

তোমরা নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক
তোমরা নিরপেক্ষ

আমরা বিশ্বব্যাংকের গোলাম হতে চাই না
আমেরিকার কথা যে শোনে না সে খারাপ
তোমরা নিরপেক্ষ

মায়ের সঙ্গে যে বেইমানী করে সে আমার ভাই না
ধর্মের মোড়কে ছুরি
তোমরা নিরপেক্ষ

সার এখন চাইতে হয় না চাষীকে গুলি খেয়ে মরতে হয় না
বিরোধী দলীয় নেতা একজন কালোবাজারী
তোমরা নিরপেক্ষ

নারীরা তেতুল
সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ী আগুনে ভষ্মীভূত
তোমরা নিরপেক্ষ

দেশ এখন তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে
শিক্ষা অবৈতনিক
তোমরা নিরপেক্ষ

এখন কোন পাখির ঠোঁট কেটে নেওয়া হয় না
পাখি ঠোঁট বন্দক দেন
তোমরা নিরপেক্ষ

এখন প্রত্যেকে ভরা পেটে ঘুমোতে যায়
মাঝরাতে আচমকা সারি সারি বুট এসে উঠোনে দাঁড়ায় না
তোমরা নিরপেক্ষ

এ সরকারকে আর কত দিন সময় দেওয়া হবে
তোমরা নিরপেক্ষ


(শিশির আজম: জন্ম ১৯৭৮সালের ২৭ অক্টোবর। কবির নিবাস ঝিনাইদহের এলাংগীতে । তার এপর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ ৪টি। ছাই (২০০৫), দেয়ালে লেখা কবিতা (২০০৮), রাস্তার জোনাকী (২০১৩) ও ইবলিস (২০১৬)। কবি চায়ের স্টলে আড্ডা দিতে পছন্দ করেন।)