শীতে হাঁপানি ও অ্যাজমায় করণীয়

আপডেট: 01:54:42 20/11/2016



img

ডা. একেএম মোস্তফা হোসেন : শীত এসে গেছে। এ সময়ই মানুষ বিশেষ কিছু রোগে আক্রান্ত হয় বা বিশেষ কিছু রোগের প্রকোপ বাড়ে। এমনই একটি রোগ হাঁপানি বা অ্যাজমা।
শ্বাসকষ্টের কারণে যে রোগ হয়, সাধারণত তাকেই আমরা হাঁপানি বা অ্যাজমা বলে থাকি। মানুষের দেহের একটি দুঃসহ ও জটিল রোগ হচ্ছে হাঁপানি। সারা বিশ্বের লাখো মানুষ বর্তমানে এ রোগে আক্রান্ত। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্ক এবং বৃদ্ধরাও যেকোনো সময় এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এক জরিপে দেখেছেন, বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ এ রোগে ভুগছেন। আমাদের দেশের সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত হাঁপানি বা অ্যাজমা নিরাময়ের কোনো যুগোপযোগী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ রোগের তাৎক্ষণিক উপশমের জন্য চিকিৎসকরা রোগীদের ট্যাবলেট বা বড়ি, ইনজেকশন, কখনো কখনো ইনহেলার দিয়ে থাকেন।

কী কারণে হাঁপানি হতে পারে
হাঁপানি রোগ সৃষ্টি হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের ফুসফুসের শ্বাসনালি সাধারণ লোকের তুলনায় অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয়ে থাকে। ঘরের ধুলাবালি, ধোঁয়া, ময়লা, মাইট জীবাণু যা পুরনো ধুলাবালি অ্যাজমা বা হাঁপানির প্রধান কারণ। এছাড়া সাইনোসাইটিস, সর্দি, কাশি, তীব্র গন্ধযুক্ত সুগন্ধি ব্যবহার, বুকে আঘাত লাগা, ঠাণ্ডাজাতীয় খাবার খাওয়া, রাতে মাত্রাতিরিক্ত খাওয়া, মানসিক উত্তেজনা, ধূমপান করা, এগুলো ছাড়া বংশগতভাবেও এ রোগ হয়ে থাকে।

অ্যাজমার উপসর্গ
অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগের কতগুলো লক্ষণ বা উপসর্গ রয়েছে, যেমন-
* শ্বাস টানা এবং ছাড়ার সময় বুকের ভেতর বাঁশির মতো শোঁ শোঁ আওয়াজ হওয়া।
* বুকে আঁটসাঁট বা দম বন্ধ ভাব হয়।
* অ্যাজমা রোগীদের শুয়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বসে থাকলে আরাম অনুভব হয়।
* অস্থিরতা বেড়ে যায়, গলার স্বরের পরিবর্তন হয়।
* হাঁপানি রোগীর বুকে প্রচুর কফ জমতে পারে। মাথাব্যথা হতে পারে।
* অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীর হাঁপানির সময় সর্দি হলে কাশি বেড়ে যায়।
* কোনো কোনো অ্যাজমা রোগীর কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।
* এ রোগের ফলে কারো কারো লো প্রেসার হতে পারে।
* মাঝেমধ্যে রোগী রাতে ঘুম থেকে উঠে বসে থাকতে পারে।

অ্যালার্জিজনিত অ্যাজমা
অ্যালার্জি ও অ্যাজমা যেন এক মায়ের দুই সন্তান।
অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী অ্যালার্জেনগুলো হলো, ফুলের রেণু, ঘরের ও পুরনো ফাইলের ধুলো, কোনো কোনো ফলমূল-শাকসবজি-খাদ্যদ্রব্য, দূষিত বাতাস ও ধোঁয়া, বিভিন্ন ধরনের ময়লা, কাঁচা রঙের গন্ধ, ঘরের চুনকাম প্রভৃতি।
অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী আরেকটি অ্যালার্জেন হচ্ছে ছত্রাক। ইস্ট-জাতীয় ছত্রাক দিয়ে তৈরি হয় পাউরুটি ও কেক। আলু ও পেঁয়াজ ছাড়া আরো নানা রকম খাদ্য ছত্রাক দ্বারা দূষিত হয়।
এসব অ্যালার্জেন অ্যালার্জিক বিক্রিয়া করে হাঁপানি রোগের সৃষ্টি করে। হাঁপানি রোগীদের অবশ্যই এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। মাইট নামে এক ধরনের অর্থোপড জাতীয় জীব ঘরের অনেক দিনের জমে থাকা ধুলাবালিতে থাকে। তাই অ্যালার্জিক অ্যাজমার বা হাঁপানির প্রধান কারণ হচ্ছে পুরনো জমে থাকা ধুলোবালি। রাস্তার ধুলোবালিতে হাঁপানির তীব্র কষ্ট হয় না। কারণ, অজৈব পদার্থ এতে থাকে। আমরা আমাদের দিনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় কাটাই বিছানায়। আর এ বিছানা, বালিশ ও আর্দ্রতাপূর্ণ আবহাওয়া হচ্ছে মাইট বেড়ে ওঠার যথার্থ পরিবেশ।
অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগীদের প্রধানত দিনের চেয়ে রাতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। রাতের বেলায় বিছানায় শোয়ার সময় আমরা মাইটের সবচেয়ে কাছে আসি। মাইটের মল নিশ্বাসের সঙ্গে দেহে ঢুকে অ্যালার্জির সৃষ্টি করে, যা পরে অ্যাজমায় পরিণত হয়।

বিভিন্ন খাদ্যের কারণে অ্যালার্জি সৃষ্টি হতে পারে
গরুর মাংস, ইলিশ মাছ, বোয়াল মাছ, চিংড়ি মাছ, পাকা কলা, আনারস, বেগুন, নারকেল, হাঁসের ডিম প্রভৃতি খাদ্য থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। আবার গরুর দুধ শিশুদের অ্যালার্জির কারণ হতে পারে।
ঠাণ্ডা পানীয় বা খাবার কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে।
তাই যেসব পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও খাদ্যদ্রব্য অ্যাজমা বা হাঁপানি সৃষ্টি করতে পারে, তা পরিহার করা শ্রেয়।

ঠাণ্ডা লাগা প্রতিরোধে যা করবেন
* ঠাণ্ডা খাবার ও পানীয় খাওয়া একেবারে বাদ দিতে হবে।
* কুসুম কুসুম গরম পানি পান করা ভালো।
* হালকা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করা উচিত।
* প্রয়োজনমতো গরম কাপড় পরা।
* তীব্র শীতের সময় কান ঢাকা টুপি পরা এবং গলায় মাফলার ব্যবহার করা।
* ধুলাবালি এড়িয়ে চলা।
* ধূমপান পরিহার করা।
* ঘরের দরজা-জানালা সব সময় বন্ধ না রেখে মুক্ত ও নির্মল বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা।
* হাঁপানির রোগীরা শীত শুরুর আগেই চিকিৎসকের পরামর্শমতো প্রতিরোধমূলক ইনহেলার বা অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন।
* যাদের অনেক দিনের শ্বাসজনিত সমস্যা আছে, তাদের জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোক্কাস নিউমোনিয়ার টিকা নেওয়া উচিত।
* তাজা, পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা, যা দেহকে সতেজ রাখবে এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করবে।
* হাত ধোয়ার অভ্যাস করা। বিশেষ করে চোখ বা নাক মোছার পর পর হাত ধোয়া।

সব সময়ই যে শীতে রোগব্যাধি বাড়বে তাও সত্য নয়। সাধারণভাবে শীতকালে আমাদের রোগ কম হয়। তাই বাড়তি সতর্কতার পাশাপাশি অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

লেখক : বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ