শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বাদশা ভারতে অস্ত্রসহ গ্রেফতার!

আপডেট: 10:24:18 28/05/2018



img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোর পুলিশের তালিকাভুক্ত ও পুরস্কারঘোষিত ‘মাদক ব্যবসায়ী’ বাদশা মল্লিককে ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ থানা পুলিশ অস্ত্রসহ গ্রেফতার করেছে। ওপারের বিভিন্ন সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী বাদশা ধরপাকড়ের ভয়ে ভারতে গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে গত রোববার বনগাঁ থানা পুলিশ সেদেশের কালুপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে। তার কাছ থেকে একটি দেশি বন্দুক ও এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়।
ভারতীয় পুলিশের বলছে, বাদশা এক বছর আগে বাংলাদেশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে চোরাপথে ভারতে পালিয়ে যান। কালুপুর এলাকায় এক যুবতীকে বিয়ে করে নাম পাল্টে পাকাপাকি আস্তানা তৈরি করেন সেখানে। তাকে বনগাঁ আদালতে তুলে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ।
ভারতের গোয়েন্দা সূত্রে বলা হয়েছে, বাদশা বাংলাদেশের ত্রাস ছিলেন। তার নামে বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় অসামাজিক কাজকর্মের অভিযোগ রয়েছে। বিচারক তাকে দশ দিনের পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন।

কে এই বাদশা মল্লিক
ভারত সীমান্তবর্তী যশোরের বেনাপোল পোর্ট থানার রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত কেরামত মল্লিকের ছেলে বাদশা। এই ব্যক্তি দেশে ফেনসিডিল চোরাচালানের অন্যতম প্রধান হোতা বলে পরিচিত। র‌্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক মাদক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, বাদশা ১৯৯৬ সালে তখনকার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরে তিনি স্থানীয় এমপি শেখ আফিল উদ্দিনের প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। বছর দুয়েক আগে বাহাদুরপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় স্থানীয় এক নেতা তার বিরুদ্ধে কথা বললে তিনি এমপিকে ত্যাগ করে প্রতিদ্ব›দ্বী বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটনের পক্ষে ভিড়ে যান। তাকে আটক করা হলে শাসক দলের সঙ্গে যুক্ত বাদশাকে ছাড়াতে পুলিশের ওপর নানাভাবে চাপ দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। কিন্তু যশোর পুলিশের শীর্ষ কর্তারা বাদশার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।
২০১৬ সালের ৪ জুন শার্শায় অনুষ্ঠেয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মারপিটসহ হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২০১৬ সালের ৩১ মে রাতে তাকে আটক করা হয়। ঢাকার রমনা থানার একটি ছিনতাই মামলার গ্রেফতারি পারোয়ানামূলে যশোর ডিবি পুলিশ তাকে আটক করে। ওই মামলায় জামিনের পর তিনি আবার পক্ষ ত্যাগ করে এমপির পক্ষে অবস্থান নেন।
মাদক পাচারের মতো জঘন্য পেশায় জড়িত থাকলেও দান-খয়রাতে সিদ্ধহস্ত বাদশার রয়েছে অনেক ভক্ত। কয়েক মাস আগে বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশ তাকে ধরে আনলে এলাকার কয়েকশ’ লোক থানা ঘেরাও করে। মেয়রের সমর্থকরা বেনাপোল বাজারে তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে পুলিশ তাকে থানা থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। চোরাচালানের টাকায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা বাদশা বেনাপোলের কাছে নারায়ণপুরে একটি পাঁচ তলা বাড়ি বানিয়ে সপরিবারে বসবাস করেন। দুর্গাপুর রোডে তার একটি ইলেক্টনিক্সের দোকানও রয়েছে।
সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকার সাত খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূর হোসেন বেনাপোল সীমান্তের চোরাপথে ভারতে পালিয়ে যান। সে সময় এই বাদশাই তাকে পালাতে সহযোগিতা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠে। নূর হোসেনকে মাদক ব্যবসায়ী বাদশার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন শার্শার শ্যামলাগাছি গ্রামের কামাল হোসেন ও মশিউর রহমান নামে দুই মাদক ব্যবসায়ী।
নূর হোসেন বেনাপোলের রঘুনাথপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি দেওয়ার আগে সীমান্তের চোরাপথে কড়াকড়ি থাকায় কামাল ও মশিউরের বাড়িতে দুই রাত কাটান বলে সে সময় মিডিয়ায় খবর বের হয়। ২০১৪ সালের ১৫ মে বিকেলে যশোর ও নারায়ণগঞ্জ পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে বেনাপোলের দুর্গাপুর রোডে বাদশার দোকানের সামনে থেকে কামালকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে যায়। পরে মশিউরকে আটক করে নারায়ণগঞ্জ নেওয়া হয়। মশিউর ছিল নূর হোসেনের মাদক সিন্ডিকেটের কথিত ম্যানেজার। বাদশার মাদক পৌঁছে যেত মশিউরের সিন্ডিকেটে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩ মে সকালে কামালকে ফোনে ডেকে পাঠান মশিউর। এ সময় মশিউর একটি মোটরসাইকেল আনতে বলেন কামালকে। কামাল মোটরসাইকেল আনলে নূর হোসেনকে ওই মোটরসাইকেলে উঠিয়ে নিয়ে রঘুনাথপুর সীমান্তের দিকে চলে যান মশিউর। যাওয়ার সময় তিনি মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেট প্রধান বাদশাকে বাইকে উঠিয়ে নেন। এই দুই ব্যক্তি মিলে রঘুনাথপুর সীমান্ত দিয়ে নূর হোসেনকে ভারতে পাড়ি জমাতে সহায়তা করেন।
এ খবর প্রকাশ হওয়ার পর কিছু দিনের জন্য গা-ঢাকা দেন বাদশা। কিছুদিন পর আবার ফিরে আসেন এলাকায়। এবং যথারীতি ফেনসিডিল পাচারের ব্যবসায় মনোযোগী হন। নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত নূর হোসেনের সঙ্গে তার যোগাযোগ মূলত ফেনসিডিল চোরাচালান ব্যবসার সূত্র ধরে।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী বাদশা মল্লিকের বিরুদ্ধে যশোর কোতয়ালী থানায় ২০১২ সালে ২৯ আগস্ট, ঝিকরগাছা থানায় ২০১৪ সালের ২১ মার্চ, শার্শা থানায় ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ও ২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়। পুলিশ নতুন কৌশল হিসেবে বাদশার বাড়িতে পাহারা বসায় কয়েকদিন। যাতে তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। তারপরও তিনি আত্মসমর্পণ করেননি।
সে সময় জানতে চাইলে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেছিলেন, ‘‘বাদশা ‘মাদক সম্রাট’। তাকে আটক করায় প্রভাবশালী একটি মহল নাখোশ হয়েছিল। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নেওয়ার পর পরই বাদশা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এই ব্যবসায় যুক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’’
২০১৭ সালের ২৪ মে যশোরের শীর্ষ ১৪ মাদক ব্যবসায়ীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেন পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান। এই তালিকার ১৩ নম্বরে নাম ছিল বাদশা মল্লিকের। তাকে ধরিয়ে দিতে দশ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেন পুলিশ সুপার। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণা করার আগেই বাদশা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যান। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আস্তানা গেড়ে বসবাস করা অবস্থায় রোববার ধরা পড়েন সেদেশের পুলিশের হাতে।

আরও পড়ুন