শুকুর আলীর ইস্ত্রি-ভাগ্য!

আপডেট: 07:09:06 29/03/2018



img
img

জহর দফাদার : গ্রামের বাজারের মধ্যে ছোট্ট একটি দোকান। তার মধ্যে দুটো টেবিল আর দেওয়াল ঘেঁষে জমিয়ে রাখা হয়েছে কয়লা। এই কয়লার আগুন ইস্ত্রির ভেতর ঢুকিয়ে কাপড় চোপড় ইস্ত্রি করেন শুকুর আলী (৬২)। ৪০ বছরের অধিককাল ধরে তিনি এই কাজটিই করে চলেছেন একনাগাড়ে।
এই আয় দিয়েই কিনেছেন দুই বিঘা ধানিজমি, ছোটছেলে জামির হোসেনকে পড়াচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শুকুর আলী তখন যুবক। গ্রামে বিজলির প্রশ্নই ওঠে না! ছোটভাই চট্টগ্রাম থেকে একটি কয়লার ইস্ত্রি এনে দেন। নির্দিষ্ট করে সালটা মনে নেই। দেশ স্বাধীনের ৬-৭ বছর পরের কথা। এরপর তিনি সেই ইস্ত্রি দিয়ে জামা-কাপড় ইস্ত্রি করেন, এখনো করে চলেছেন।
যশোরের শার্শা উপজেলার বসতপুর এক নম্বর কলোনি এলাকার বাসিন্দা শুকুর আলীর বাবার নাম আব্দুর রহিম মিজি। মায়ের নাম নূরজাহান বেগম। দুজনই গত হয়েছেন।
শুকুর আলী (৬২) জানান, দেশ স্বাধীনের নয়-দশ বছর পর ছোটভাই মনসুর আলী চট্টগ্রাম থেকে পিতলের তৈরি এই কয়লার ইস্ত্রিটি নিয়ে আসেন। ১২শ’ টাকা দাম। সেই থেকে বসতপুর বাজারে কাপড় ইস্ত্রির কাজ শুরু, এখনো চলছে।
বছর দুই আগে বসতপুর বাজারে ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নেন শুকুর আলী। মাসে ৫০০ টাকা ঘরভাড়া আর পাশের দোকান থেকে লাইন টেনে একটি বাল্ব জ্বালান। দোকানিকে মোটে ৩০ টাকা দেন!
এরআগে তিনি বাজারের বিভিন্ন দোকানের সামনে লোকজনকে বলেকয়ে একটু জায়গা নিয়ে এই কাজ করতেন।
তিনি বলেন, ইস্ত্রির কাজ শুরুর বছর খানেক পর একই উপজেলার ঘিবা গ্রামের মেয়ে জবেদা বেগমের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসারজীবনে তার দুই মেয়ে এবং দুই ছেলে। দুটো মেয়ে ও বড়ছেলের বিয়ে হয়েছে। ছোটছেলে জামির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিবিএ অনার্স পাশ করেছে) পড়াশুনা করেন। সামনের এপ্রিলে তিনি মাস্টার্স পরীক্ষা দেবে।
তিনি জানান, প্রথমদিকে কাপড় প্রতি আট আনা পরে এক টাকা করে নিতেন; এখন পাঁচ টাকা। আর শাড়ি প্রতি দশ টাকা। তখন প্রতিদিন ২০ থেকে ৫০ টাকা আয় হতো। সংসার চলে যেতো।
বিয়ের পর বাড়িতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন করতেন স্ত্রী। সংসারের খরচ থেকে টুকটাক জমিয়ে প্রথমে কেনেন পাঁচ কাঠা জমি। এরপর আবার কিছু সঞ্চয়, তারপর আস্তে আস্তে এখন দুই বিঘা ধানি জমির মালিক তিনি। সেই জমিতে নিজেরাই উৎপাদন করেন ধান। এতে তাদের বছরের খোরাকিটা হয়ে যায়!
সদা প্রাণোচ্ছল, হাসিমুখ এই মানুষটির জীবনে একটিই চাওয়া ছিল, অন্তত একটা ছেলেকে তিনি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। তার সেই আশা এখন পূরণের দিকে।
ছোট ছেলে জামির লেখাপড়ায় বেশ ভালো, এসএসসিতে ৪ দশমিক ৯৪, এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে বিবিএ অনার্স কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেছেন, সামনে মাস্টার্স দেবেন। এরইমধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিসিএসে বসার। তিনি চান একটা ভালো চাকরি জুটিয়ে পরিবারের হাল ধরতে। তার মতে, বাবা হচ্ছেন সহজ সরল মানুষ। খুবই সৎ আর কর্মঠ। কখনো তিনি কোনো বিষয়কে জটিল করে দেখতে চান না।
শুকুর জানান, এলাকায় কোনো বাড়িতে বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান হলে তিনি সেখান থেকে বস্তায় ভরে কয়লা সংগ্রহ করেন। সংকট দেখা দিলে মাঝেমধ্যে বস্তা প্রতি ১৬০ টাকা দরে কেনেনও।
ইস্ত্রি কেনার পর একবার হাত থেকে পড়ে কাঠের হাতলটি ভেঙে যায়। ওই একবারই সেটি মেরামত করতে হয়েছে। এছাড়া আর কোনো সমস্যা হয়নি।
প্রতিবেশী কলেজশিক্ষক আবু আব্দুল্লাহ বলেন, মানুষটা খুব নিরীহ। কারো সঙ্গে কোনোদিন উচ্চস্বরে কথা বলেননি। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে বিশেষ করে তার সততার জন্যে। এই বাজরে একমাত্র তারই ইস্ত্রির দোকান রয়েছে। বসতপুর ছাড়াও আশপাশের গ্রামের লোকজন তার কাছে কাপড় ইস্ত্রি করাতে আসেন।
ছবি : তারিক হাসান বিপুল

আরও পড়ুন