শেষ সময়ে জমে উঠেছে খুলনার ২৭ পশুহাট

আপডেট: 01:58:13 01/09/2017



img

খুলনা অফিস : খুলনা মহানগর ও জেলার ২৭টি হাটে শেষ সময়ে জমে উঠেছে কুরবানির পশু বেচাকেনা। কুরবানি দিতে ইচ্ছুক মুসলিমরা শেষ মুহূর্তে পশু কেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পশুর দামও সহনীয় বলে ক্রেতারা জানিয়েছেন।
এদিকে, এসব হাটকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি বা হয়রানির বড় ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া না গেলেও নীরবে বিচ্ছিন্ন কিছু ছোট খাটো ঘটনার অভিযোগ রয়েছে। তবে হাট ও মহাসড়কে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
খুলনার পশুর হাটগুলো হলো, কয়রা উপজেলার আমাদী, হোগলা, ঘুগরাকাঠি, গিলেবাড়ী, হায়াতখালী, বানিয়া ইউনিয়ন পরিষদ, দাকোপ উপজেলার চালনা, বাজুয়া, ফুলতলা উপজেলা সদরের তাজপুর, তেরখাদা উপজেলা সদরের ইখুড়ি কাটেঙ্গা, দিঘলিয়া উপজেলার পথের বাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বারাকপুর স্কুল মাঠ, মোল্লা জালাল উদ্দিন কলেজ মাঠ, রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ পূর্বপাড়া, বাগমারা, আমতলা, পাইকগাছা উপজেলার বাকা, গদাইপুর, চাঁদখালী, কাছিকাটা, ডুমুরিয়া উপজেলার বানিয়াখালী, খর্নিয়া, চুকনগর, সাহাপুর, আঠারো মাইল, বটিয়াঘাটা উপজেলার বারোরিয়া ছাগলের হাট ও খুলনা মহানগরীর জোড়াগেট।
পুলিশের সূত্র জানায়, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহাসড়ক ও হাটগুলোতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পশু, পেঁয়াজ, রসুন ও কাঁচা মরিচ বহনকারী যানবাহন কোথাও তল্লাশি করা যাবে না। পশুর চামড়া অবৈধভাবে বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। চামড়া পাচার প্রতিরোধে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশি টহল থাকবে।
এদিকে, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নিয়ন্ত্রিত নগরীর একমাত্র জোড়াগেট পশুর হাটে শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে কুরবানির পশু বিক্রি। ২৬ আগস্ট থেকে এ পশুর হাট শুরু হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাট শুরুর পর বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত জোড়াগেট পশুর হাটে ৭৭৩টি পশু বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে ৬৩৭টি গরু ও ১০৬টি ছাগল। এ থেকে গত চারদিনে হাসিল আদায় হয়েছে ১৯ লাখ ৮৮ হাজার ২৬০ টাকা। গত বছর এ হাট থেকে হাসিল আদায় হয়েছিল ৫৪ লাখ ৪৬ হাজার ৩৪৫ টাকা।
রূপসা উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের জিল্লুর রহমান জোড়াগেট পশুর হাটে বিক্রির জন্য আটটি গরু নিয়ে এসেছেন। এরমধ্যে ‘বাহাদুর’ নামে বিশাল সাইজের একটি গরু রয়েছে। চার বছর বয়সী এ গরুটির ওজন হবে প্রায় ১৪ মণ। তিনি গরুটির দাম হেঁকেছেন তিন লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত গরুটির দাম উঠেছে আড়াই লাখ টাকা। তবে দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা হলে তিনি গরুটি বিক্রি করবেন বলে জানিয়েছেন।
জিল্লুর বলেন, ‘আমার আটটি গরুর মধ্যে দুটি গরু বিক্রি হয়ে গেছে। এখনো ছয়টি গরু বিক্রি বাকি আছে।’
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এ হাটে গরুর দাম কম। এখানে গরু না এনে গ্রামের হাটে বিক্রি করলেও দাম বেশি পাওয়া যেত।’
তেরখাদা উপজেলার কোলা গ্রামের ইব্রাহিম শিকদার জোড়াগেট পশুর হাটে বিক্রির জন্য বুধবার রাতে বিশাল সাইজের একটি গুরু এনেছেন। তিনিও গরুটির দাম হেঁকেছেন তিন লাখ টাকা। তিনি জানান, ১২ মণ ওজনের এ গরুটির দাম উঠেছে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে তিন লাখ টাকার কাছাকাছি গেলে তিনি গরুটি বিক্রি করবেন।
ডুমুরিয়া উপজেলার মৌখালী গ্রামের রফিকুল ইসলামের গরুটি দেখতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। ১৩ মণ ওজনের এই গরুটির দাম উঠেছে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। তিনি জানান, দুই লাখ টাকা পেলে তিনি গরুটি বিক্রি করবেন।
নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পেড়লি গ্রামের রফিকুল ইসলাম হাটে চারটি গরু এনেছিলেন। এরমধ্যে তিনটি গরু বিক্রি হয়ে গেছে। বিক্রি হতে বাকি আছে আর মাত্র একটি গরু। আড়াই বছর বয়সী এই গরুটির ওজন ১২ মণ।
রফিকুল বলেন, ‘এ গরুটির দাম উঠেছে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে আড়াই লাখ টাকা হলে গরুটি বিক্রি করবো।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে জোড়াগেট পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রাকে ও নৌপথে গরু-ছাগল আসছে। সেই সঙ্গে হাটে ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে। তবে ক্রেতারা পশু দেখছেন, দরদাম হাঁকছেন, কিন্তু কিনছেন না। এ নিয়ে পশুর মালিকদের কষ্ট রয়েছে। তারা বলেন, এ বছর খৈল ও ভুষির দাম বেশি। তাই গরুর পেছনে খরচও বেশি পড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতারা দাম বলছেন খুব কম।
জোড়াগেট পশুর হাটে হাসিল আদায়ে কর্মরত কেসিসি’র কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন শেখ বলেন, ‘শনিবার ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত জোড়াগেট হাটে কুরবানির পশু বিক্রি হবে। বৃহস্পতিবার থেকেই এখানে পশু বিক্রি জমাজমাট হয়ে উঠেছে। আশা করছি, গত বছরের তুলনায় এ বছর পশু বিক্রি বেশি হবে। সেই সঙ্গে আমাদের হাসিল আদায়ও গত বছরের তুলনায় বেশি হবে।’
অপরদিকে তেরখাদা উপজেলা সদরের ইখুড়ি কাটেঙ্গা হাটে ছোট বড় ষাঁড়, বলদ, বকনা, গাভী এবং প্রায় সাত হাজার গরু ও প্রায় চার হাজার ছাগল আনা হয়।
উপজেলার নাচুনিয়া এলাকার খামারি লিটু হাটে বিক্রির জন্য একটি ষাঁড় এনেছেন। যার দাম উঠেছে এক লাখ ৪৫ হাজার টাকা। কিন্তু তিনি দাম চেয়েছেন এক লাখ ৭০ হাজার টাকা।
অপর খামারি নড়াইলের বড়নাল এলাকার মো. মিন্টু মল্লিক দুটি গরু বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন হাটে। তিনি জানান, প্রতি বছর ৪-৫টি করে ষাঁড় পালন করেন। অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার গরুর দাম একটু বেশি বলে জানান তিনি।
অপর খামারি রহিম চৌধুরী বলেন, ‘গরুর খাদ্যের প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। গত বছর মাংসের দাম ছিল ৪২০ টাকা, তা এখন ৫০০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সারা বছর একটি গরুর পেছনে দশ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এ অবস্থায় প্রতিটি গরু গড়ে ৬০ হাজার টাকা বিক্রি করতে না পারলে পোষাবে না।’
হাটে গরু কিনতে আসা উপজেলার তেরখাদা এলাকার লাভলু শেখ ও ছাগল কিনতে আসা ইখড়ি দশভাইয়া এলাকার লিয়াকত বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার দেশি পশুর সংখ্যা বেশি, তবে ক্রেতাও বেড়েছে। গরুর পাশাপাশি ছাগলের চাহিদাও বেশ।’
ছাগল বিক্রেতা মিঠু মোল্লা বলেন, ‘এবার ছাগলের বাজার ভালো। ঈদে বড় ছাগলের চাহিদা বেশি।’
সিলেটের গরু ব্যবসায়ী টুকু মোল্যা, এহিয়া শেখসহ বেশ কয়েকজন জানান, কুরবানির ঈদের সময় তারা এই অঞ্চল থেকে গরু কিনে সিলেটে বিক্রি করেন। সিলেটে গত কুরবানির ঈদের তুলনায় এবার গরুর দাম একটু কম বলে জানান তারা।
খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোয়েন্দা) সিএ হালিম জানান, পশুর হাটে নিরাপত্তায় একজন অফিসারের নেতৃত্বে ৫-৬ জন পুলিশ সদস্য টহলে রয়েছেন। পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে সড়কে পশুর নিরাপত্তায় র‌্যাবও দায়িত্ব পালন করছে।
বিজিবি খুলনা সেক্টরের মেজর আনিছুর রহমান জানান, দিন-রাত টহল শুরু হয়েছে। ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টহল চলবে। সীমান্ত এলাকায় পশুর চামড়া ব্যবসায়ীদের তালিকা সংরক্ষণ করা হয়েছে। সাতক্ষীরার নীলডুমুর থেকে কলারোয়া পর্যন্ত চামড়া পাচার প্রতিরোধে চেকপোস্ট বসানো হবে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।

আরও পড়ুন