শ্রমিকশ্রেণির ত্যাগ বনাম প্রাপ্তি

আপডেট: 02:40:09 01/05/2018



img

সৈয়দ আবুল মকসুদ

ঊনিশ শতকে আধুনিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে উপমহাদেশে তথা বাংলায় শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকা শুধু অর্থনীতিতে নয়, রাজনীতিতেও গৌরবের। শ্রমিকশ্রেণির অংশগ্রহণ ছাড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন সফল করা শুধু মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণে রাজনীতিবিদদের পক্ষে সম্ভব হতো না। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণির ভূমিকা অবিস্মরণীয়। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমিক ও ছাত্রদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন শ্রমজীবী মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের সন্তানেরাই বেশি। তাঁরা অকাতরে জীবন দিয়েছেন। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ শুধু স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ছিল না, তা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম। বাংলাদেশে স্বাধিকার সংগ্রাম ও স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণির ত্যাগের পরিমাণ যতটা, প্রাপ্তির পরিমাণ কি তাই? অন্তত মে দিবসে সেই প্রশ্নটা করতে পারি।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়ন ছিল শক্তিশালী। সেকালের শ্রমিকনেতা ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের আত্মত্যাগ এখনকার ভাগ্যবান নেতারা ভাবতেও পারবেন না। ১৯৫০ পর্যন্ত বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন পরিচালনা করতেন কমিউনিস্ট ও বাম নেতারা। তবে ১৯৫৭ পর্যন্ত বামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত শ্রমিক সংগঠন প্রকাশ্যে ছিল না। আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট নেতারা শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের দাবিদাওয়া আদায়ে তাঁদের সংগঠিত করতেন। সে জন্য তাঁদের ওপর নেমে আসত সরকারি নিপীড়ন। কারাগারগুলো ভরে গিয়েছিল শ্রমিকনেতা ও বামপন্থী কর্মীদের দ্বারা।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন’। তার নেতৃত্বে ছিলেন ডা. আবদুল মোতালেব মালিক (একাত্তরে অধিকৃত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর) ও আলতাফ আলী। অবিভক্ত ভারতবর্ষে তাঁরা কলকাতায় শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে বামপন্থীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান মজদুর ফেডারেশন’, যার প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মাওলানা ভাসানী এবং সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা ও সাধারণ সম্পাদক স্টিমার শ্রমিকনেতা কাজী মহিউদ্দিন (বরিশাল)। কমিউনিস্ট নেতাদের অনেকেই এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর এর অফিসে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
পঞ্চাশের দশকে নিবেদিত ও অভিজ্ঞ হিন্দু শ্রমিকনেতাদের অনেকেই ভারতে চলে যান। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। ষাটের দশকে আইয়ুবের সময় গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক পরিষদ’। ১৯৬৬ সালে গঠিত হয় বামপন্থী নেতাদের দ্বারা ‘পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন’, যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মাওলানা ভাসানী। ষাটের দশকে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠতে থাকায় শিল্পশ্রমিকের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। পূর্ব পাকিস্তান শিল্পোন্নয়ন করপোরেশনের অধীনে পাটকল, বস্ত্রকল, চিনিকল, কাগজ, ইস্পাত প্রভৃতি শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল কয়েক লাখ। শ্রমিকনেতারা তাঁদের সংগঠিত করেন।
১৯৭০ সাল নাগাদ শ্রমিক আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন বিপুল শক্তি অর্জন করে। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় শ্রমিকদের শক্তির প্রকাশ ঘটে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের ভূমিকা গৌরবের, যদিও সেই স্বীকৃতি তাঁরা পাননি। কলকাতায় গঠিত ‘বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’র অধিকাংশই ছিলেন শ্রমিকনেতা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডা. সাইফ-উদ্ দাহার, ডা. মারুফ হোসেন, অমল সেন, আবুল বাশার, শান্তি ঘোষ, দেবেন সিকদার, কাজী জাফর আহমদ প্রমুখ।
স্বাধীনতার পরে সব শিল্পকারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত হয়। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিতে সেগুলোর শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। আগের শ্রমিকনেতারাই শ্রমিকস্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম করেন; কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে না। মুদ্রাস্ফীতির কারণে তাঁদের জীবনযাত্রা নির্বাহে অবনতি ঘটে। ঐতিহ্যবাহী পাটকল, সুতাকল, কাপড় কল, চিনিকল প্রভৃতি বন্ধ হয়ে গেলেও আশির দশকে তৈরি পোশাকশিল্পের বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশের শ্রম জগতে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তৈরি পোশাকশিল্পের আগে নারী শ্রমিক ছিল না। লাখ লাখ নারী আজ এই শিল্পে নিয়োজিত। এখনই প্রয়োজন ছিল নির্লোভ, সৎ ও নিবেদিত নেতৃত্বের।
স্বাধীনতার আগে ছিল রেল ও নৌপথের শ্রমিক। বর্তমানে পরিবহন খাতে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন এবং তাঁদের একটি বড় অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। বহু শিশু-কিশোর পরিবহনে কাজ করছে সামান্য বেতনে অথবা পেটে-ভাতে। বাস-ট্রাক প্রভৃতি যানের মালিকদের সীমাহীন লোভ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থাকে আজ বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নানা প্রলোভনের মধ্যেও শ্রমিকনেতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গঠিত হয়েছিল ১৯টি শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ। তারা একটি পাঁচ দফা দাবিনামা তৈরি করেছিল। ১৯৮৪ সালের ২১ মে ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই পাঁচ দফার ১ নম্বর দফায় ছিল ১৩টি দাবি, ২ নম্বর দফায় ছিল ২০টি দাবি, ৩ নম্বর দফায় ছিল ১৯টি দাবি, ৪ নম্বর দফায় ছিল ১৮টি দাবি এবং ৫ নম্বর দফায় ছিল ৯টি দাবি।
নব্বইয়ে সামরিক একনায়কের পতন ঘটে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর দুই মেয়াদে বিএনপি এবং একবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। ওই তিন সরকার যে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সেই পাঁচ দফা দাবি পাঠ করেছে, তা মনে করার কারণ নেই। তবে ওই ১৫ বছরে সরকার শ্রমিকদের কল্যাণে কিছু কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
গত ২৫ বছরে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে, বিদেশি ক্রেতাদের চাপে কারখানার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও উন্নতি হয়েছে, কর্মপরিবেশেও অনেকটা ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে, তা সত্ত্বেও শ্রমিকদের বহু সমস্যা রয়ে গেছে অমীমাংসিত। আমাদের মতো দেশে শ্রমিকের স্বার্থ সরকার ও মালিকেরা স্বেচ্ছায় দেখবেন, সেটা দুরাশা। দাবি আদায় করে নিতে হয়। তা করতে পারেন শ্রমিকনেতারা। সুবিধাবাদী নেতৃত্ব নিজেদের কল্যাণ করে নেন শ্রমিকদের ব্যবহার করে। কোনো দাবি আদায়ে রাস্তায় নামলে নিগৃহীত হন সাধারণ শ্রমিকেরা, যাঁদের একটি বড় অংশ নারী।
শ্রমিক নেতৃত্ব দুই ভাগে বিভক্ত। সরকারের সহযোগী ও শ্রমিকবান্ধব। সরকারের সহযোগীদের ক্ষমতা ও প্রভাব বেশি। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সঙ্গে বিদেশ সফর করার সুযোগ পান। দামি হোটেলে থাকেন। শ্রমিকবান্ধব নেতাদের মনে করা হয় তাঁরা মালিকবিরোধী ও সরকারবিরোধী। তাঁদের কথা মালিক ও সরকার শুনতে আগ্রহী নয়।
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রমোশন পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছে। সে জন্য আমরা গর্বিত। সরকার আরও বেশি গর্বিত। কিন্তু এই পদোন্নতির পেছনে কার অবদান বেশি, তা কি সরকার ভেবে দেখেছে? বাংলাদেশকে উঁচুতে তুলে ধরেছে যে হাত, তা শ্রমিকের হাত। দেশটি মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল, কিন্তু তার শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান মানবেতর, তা এক বিরাট পরিহাস। এই মুহূর্তে খুলনায় পাটকলের শ্রমিকেরা বকেয়া বেতন না পেয়ে আন্দোলন করছেন। আমরা গিয়ে স্বচক্ষে দেখেছি, তাঁদের অবস্থা শোচনীয়।
দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে হলে শ্রমিকশ্রেণির কথা ভাবতে হবে। যেসব নদী শিকস্তি কৃষক ও ভূমিহীন মানুষ-নারী ও পুরুষ একবার শহরে এসে কারখানায় কাজ নিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশ আর গ্রামে ফিরে যেতে পারবেন না। কোনো কারণে তৈরি পোশাকশিল্প খাতে বিপর্যয় দেখা দিলে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি তাঁরা চাকরি হারান, তাঁরা চাকরিপূর্ব জীবনের চেয়ে শোচনীয় অবস্থায় পড়বেন। বেঁচে থাকার তাগিদে পুরুষদের অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। অল্পবয়স্ক নারীদের সন্তানসন্ততিকে বাঁচিয়ে রাখতে যেকোনো ধরনের কুপথ বেছে নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
অর্থাৎ, শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও ভালো জীবনের নিশ্চয়তা না দিলে শুধু অর্থনীতি বিপর্যস্ত হবে না, রাজনৈতিক অস্থিরতা তো বটেই সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি হবে। এখনই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়।
[লেখক : গবেষক ও লেখক। প্রথম আলো থেকে।]

আরও পড়ুন