সংঘাত না ভোট-উৎসব‍!

আপডেট: 02:06:58 27/12/2017



img

পীর হাবিবুর রহমান

বছরের শেষ ভোটযুদ্ধ রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষক মহলের কাছে প্রশ্ন নিয়ে আসছে  নতুন বছর ২০১৮ সাল। এ বছর নির্বাচন ও ভোট রাজনীতির বছর। ডিসেম্বরে হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলে এই জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে নিয়ামক শক্তি। জাতীয় নির্বাচনের আগেই দেশের পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও একটি উপ-নির্বাচন হয়ে উঠবে জনমত যাচাইয়ের অ্যাসিড টেস্ট।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের অকাল মৃত্যুতে তার শূন্যপদে উপনির্বাচন, গাইবান্ধা-১ আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফার আকস্মিক মৃত্যুতে শূন্য আসনের উপনির্বাচন দিয়ে ভোট রাজনীতির অভিষেক ঘটবে। ঢাকা উত্তরে নির্বাচন হলে নগরপিতার আসন নিয়ে ভোটযুদ্ধের মুখোমুখি হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। প্রার্থী সংকটে পতিত আওয়ামী লীগ এখানে বিজিএমইএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট আতিকুল ইসলামকে প্রার্থী করতে যাচ্ছে। সরকার তাকে প্রস্তুতির সবুজ সংকেত দিয়েছে। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিগত নির্বাচনে মধ্য দুপুরে ভোট লড়াই বর্জন করা তরুণদের মধ্যে আকর্ষণ সৃষ্টি করা দলের তরুণ নেতা তাবিথ আউয়ালকেই প্রার্থী করছে। ভোটের দিন মধ্যদুপুরে ভোট বর্জন করে এলেও আনিসুল হকের মতো শক্তিশালী প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করে তিন লক্ষাধিক ভোট পেয়েছিলেন। সেই সময় বিএনপি নেতাকর্মীরা ছিল হয় কারাগার, নয় পলাতক। এখন বিএনপি অনুকূল পরিবেশে মাঠে রয়েছে। আওয়ামী লীগ যাকে প্রার্থী করছে সেই আতিকুল ইসলামেরও ক্লিন ইমেজ রয়েছে। এই ভোটযুদ্ধ বছরের শুরুতেই জনমত যাচাইয়ের পরীক্ষায় তুমুল আলোড়নই তুলবে না, সারা দেশের দৃষ্টিও কাটবে। এরপর একে একে অনুষ্ঠিত হবে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল কোনো শিবিরেই প্রশ্ন নেই। জয়-পরাজয় মেনে নিয়েই সরকার ও বিরোধী দল যেমন পথ চলছে, তেমনি পর্যবেক্ষকমহল ও দেশবাসী এর গ্রহণযোগ্যতাকে সমর্থন দিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি জোটের অবস্থান এখনো অমীমাংসিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর বলে আসছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে সকল দলের অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। বর্তমান সংসদের শতাধিক সদস্য মনোনয়ন বঞ্চিত হচ্ছেন এ খবর মানুষের মুখে মুখে। বিএনপি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের নামে তত্ত্বাবধায়ক চাইলেও সরকারের তরফ থেকে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে, সংবিধান থেকে একচুলও তারা নড়বেন না। নির্বাচন পরিচালনাও সম্পন্ন করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার হবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার, যারা রুটিনওয়ার্ক করবেন। এমনকি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সরকারের তরফ থেকে বিএনপিকে আলোচনার প্রস্তাব, অন্তর্বর্তী সরকারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় গ্রহণের যে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সেসব প্রস্তাবও বাতিল হয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচনে আসবে। কারণ নির্বাচনের বাইরে থাকলে দলটি অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের ৯ বছর ও ওয়ান-ইলেভেনের দুইবছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির জন্য নেমে আসা মহাদুর্দিনের অবসান হয়নি।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা আলাপকালে বলেছেন, তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনা চান এবং সহায়ক সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে অংশ নিতে অনড়। তারা মনে করেন, জনমত সরকারবিরোধী, যা ভোটযুদ্ধে তাদের পক্ষেই আসবে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার আলোচনার প্রস্তাব ও সহায়ক সরকারের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন। পর্যবেক্ষকরা আরো মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সমঝোতার দরজা খোলার আভাস বিদায়ী বছরের গোধূলি লগ্নেও পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন বছরের শুরুতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিচারের রায় ঘোষণা হবে। সেই রায়ে দণ্ডিত হওয়ার আশঙ্কা বিএনপি থেকেও করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সরকার খালেদা জিয়াকে দণ্ডিত করে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, একে তো খালেদা জিয়া তার আপসহীন নেত্রীর ইমেজ রক্ষায় সহায়ক সরকার দাবি থেকে তিনি সরবেন না। অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া দণ্ডিত হয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হলে নানা মামলায় বিএনপির আরো নেতাদের ভোটযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে হতে পারে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বছরের শেষ সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে বলেছেন, আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে। আদালতের রায় যদি বিএনপি নেত্রীর ভোটযুদ্ধের পথকে রুদ্ধ করে, নেতাদের অনেকেই যদি মামলার রায়ে অযোগ্য ঘোষিত হন, তাহলে বিএনপি কোন্ পথে হাঁটবে? বেগম খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ নেতাদের বাদ দিয়েই ভোটযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবে নাকি আন্দোলনের পথ নেবে? সরকারপক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, আন্দোলনে নামলেই কঠোর হস্তে দমন। ঢাকার বাইরে এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সে ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিমও সেন্স অব হিউমার থেকে কায়দা করে বলেছেন, বিএনপির জন্য ভিটামিন তৈরি করবেন। পর্যবেক্ষদের সামনে মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। নতুন বছরের রাজনীতি কোন্ পথে হাঁটবে? সংঘাত না ভোট উৎসবের পথে?
[মানবজমিন থেকে]

আরও পড়ুন