সতী নারীর পতি মরে না, মরে শুধু সতী

আপডেট: 09:04:19 28/07/2018



img

এন ইসলাম

‘নারী যদি হয় অসতী
স্বামী ছাড়া জন্ম দিলে শিশু
মেরি কেন সতী তবে
জন্ম দিয়ে যিশু?
একাধিক পত্নী পুরুষের
উপপত্নী শতখানা
তবু তার ভোগের ক্ষুধা মিটে না।
নারীকে থাকতে হয় একে সন্তুষ্ট
আরেক চাইলেই কুলটা
হাজার নারী ভোগ করেও
পুরুষ হয় মহান-সাধু
মহান-দেবতা।’

সে অনেকদিন আগের কথা, এক রাজার রাজত্বে ইয়া বড় এক বটগাছ ছিল, প্রজারা বংশপরম্পরায় বটগাছটাকে পুজো দিত। ঝড়-বৃষ্টি-রোদে গাছের নিচে আশ্রয় নিত। পাখিদেরও নিরাপদ আশ্রয়, খাবার জুটতো। সবাই খুব সুখ ও শান্তিতে বাস করতো।
সেই সুন্দর রাজ্যে বটগাছটা হঠাৎ করে শুকিয়ে যেতে শুরু করলো। প্রজারা ভীতসন্ত্রস্ত দিশেহারা হয়ে রাজার কাছে ছুটে গেল। রাজা মশাই মন্ত্রী ও রাজগুরুর সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করলেন হিমালয় থেকে সিদ্ধ পুরুষ এনে জানতে হবে বটগাছ শুকিয়ে যাবার কারণ।
রাজার হুকুমে হিমালয় থেকে সিদ্ধপুরুষ আনা হলো। সব দেখে-শুনে সন্ন্যাসী বললেন, যদি কোনো সতী নারী বটগাছটাতে নিয়মিত জল দেয়, তাহলে গাছটা জ্যান্ত হয়ে উঠবে।
এই কথা শুনে রাজা বললেন, ‘ও এই ব্যাপার! ঠিক আছে, আমার সাত স্ত্রী কাল সকাল থেকে পালা করে রোজ সূর্যোদয়ের পর বটগাছে জল দেবে।’
রাজা মশাই রাতে রানিদের বিষয়টি বললেন। রানীরা তো রেগেই অস্থির, ‘কী! তুমি আমাদের সন্দেহ করো? আমাদের পরীক্ষা নেবে?’
রাজা মশাই আর কথা না বাড়িয়ে পরদিন মন্ত্রী, উজির-নাজির, সেনাপতি, রাজ পণ্ডিত-রাজ পুরোহিত সবাইকে বললেন, তাদের সতী স্ত্রীরা যেন বটগাছের গোড়ায় জল ঢালে। কিন্ত তাদের কারো স্ত্রীই রাজি হলেন না
নিরুপায় রাজা রাজ্যময় ঢ্যাড়া পিটিয়ে দিলেন- ‘যে সতী নারী জল ঢেলে বটগাছ বাঁচাতে পারবে, তাকে পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার দেওয়া হবে।’
কিন্ত কোনো সতী নারী এগিয়ে এলো না। রাগে ক্ষোভে দুঃখে রাজা মশাই নির্দেশ দিলেন তার রাজ্যে যত অবিবাহিত পুরুষ আছে সবাইকে খোঁজা করে দিতে।
এহেন রাজা-বাদশাদের সমাজে, যাকে আমরা সামন্ত সমাজ, সেখানে নারীর তথাকথিত সতিত্ব নিয়ে যত বাড়াবাড়ি, দুঃশ্চিন্তা, সন্দেহপ্রবণতা জেঁকে বসেছিল, এমনটা মানুষের ইতিহাসের আর কোনো সমাজে দেখা যায়নি। এমনকি দাস সমাজেও নারীর সতিত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি চোখে পড়ে না।
কেননা ভোগবাদী সামন্ত সমাজে সামন্ত প্রভু ও অভিজাত শ্রেণির কাছে অব্যবহৃত সতী নারী দখলে রাখা, ও সম্ভোগ করা আভিজাত্যের একটা প্রতীক ছিল।
তাই নারীর সতিত্ব শুধু তার সতীচ্ছদের উপরেই নির্ভর করতো না, সারাজীবন অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে যৌনসংসর্গ না হওয়াও সতিত্বের প্রতীক বিবেচিত হতো।
সতী বা বিশুদ্ধ নারী ভোগের আভিজাত্য থেকেই ভারতীয় সামন্ত সমাজে সতীদাহের প্রচলন ও বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ হয়েছিল। বাল্যবিবাহের প্রচলনও হয়েছিল সতী ধারণা থেকে। একজন পুরুষ যাতে সতী নারীর স্বামী হিসেবে সমাজে বুক ফুলিয়ে চলতে পারে এবং সতী নারীর পুণ্যি স্বামী ও সংসারের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, সামাজিক ও ধর্মীয় এই ধারণা থেকেই বাল্যবিবাহ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মধ্যযুগে রাজা-বাদশা-জমিদার-সম্রাটদের স্ত্রী ও হেরেমের রক্ষিতাদের পাহারা দিত খোজা প্রহরীরা। দাসদের মধ্য থেকে কোনো দেশে পুরুষাঙ্গসহ অণ্ডকোষ, কোনো দেশে শুধু পুরুষাঙ্গ আবার কোনো দেশে শুধু অণ্ডকোষ কেটে খোজা করা হতো।
দখলে থাকা নারীরা যাতে কোনোভাবেই পরপুরুষের সঙ্গে যৌনক্রিয়া করতে না পারে তা পাহারা দেবার জন্য বহু মানুষের মৃত্যু ঘটতো খোজা করতে গিয়ে।
সম্ভবত মানুষের অণ্ডকোষ কেটে খোজা করার এই পদ্ধতি পরবর্তীতে গরুকে দামড়া, ছাগলকে খাশি ও মোরগকে রাতা করতে অনুসরণ করা হয়।
নারীর সতিত্ব বন্ধনীর প্রচলনটা হয় সামন্ত সমাজের গর্ভে জন্ম নেওয়া উদীয়মান বণিক শ্রেণি তথা সওদাগর শ্রেণির হাতে। সেসময় বাণিজ্যবহর নিয়ে একদেশ থেকে আর এক দেশে পাড়ি জমাতো বণিকরা। বাণিজ্যের এই সফর শেষ করতে ছয় মাস, এক বছর লেগে যেত।এই দীর্ঘ সময় বাইরে থাকায় ঘরে থাকা পত্নী-উপপত্নীদের সতিত্ব ও পবিত্রতা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার অন্ত থাকতো না। ধারণা করা হয়, সৈনিকদের বক্ষবর্ম থেকেই নারীর সতিত্ব বন্ধনীর ধারণাটা পায় তারা। এবং সত্যি সত্যিই ধাতব বক্ষবর্ম থেকে ধাতব সতিত্ব বন্ধনী দারুণ কাজে দেয়। দর্জিকে দিয়ে দেহের মাপ নিয়ে পোশাক বানানোর মতোই কারিগরদের দিয়ে সতিত্ব বন্ধনী বানিয়ে তাতে লাগিয়ে নিশ্চিন্তে বাণিজ্যে যেতেন সওদাগররা। ক্ষেত্রবিশেষে নিজেকে সতী প্রমাণ দিতে নারীরাও সতিত্ব বন্ধনী পরে স্বামীর হাতে চাবি তুলে দিতেন।
পুঁজিবাদী সমাজ নারীর সতিত্ব নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাই বলে নারীর সতিত্বের কোনো মূল্য নেই তা কিন্ত নয়। পুঁজিবাদী সমাজে সবকিছু যেহেতু পণ্য, তাই পণ্য হিসেবে নারীর সতীচ্ছদের একটা মূল্য অবশ্যই আছে।
ইনটেক বা অব্যবহৃত বিশুদ্ধ পণ্য হিসেবে নারীর সতিত্ব বা ভার্জিনিটি খুচরা বাজারে প্রচুর চাহিদা এবং বেশ চড়া দামেই বিক্রি হয়। পাইকারি বা থামকো বাজারে দেনমোহর (এককালীন মূল্য) হিসেবে ভার্জিন নারী যতটা দামে বিকোয়, ব্যবহৃত নারী ঠিক অতোটা দামে বিকোয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিকশিত পুঁজিবাদী সমাজও বিশুদ্ধ নারী খোঁজে। কেননা সে পয়সা দিয়ে ঘরে ব্যবহারের জন্য চড়াদামে সেকেন্ডহ্যান্ড জিনিস কিনতে রাজি না।
তাই সতিত্বের জায়গাটা দখল করে নিয়েছে বিশ্বস্ততা বা বিশ্বাস। স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করে বা পরপুরুষের বিছানায় যায়, তাহলে আইনত স্বামী তাকে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ডিভোর্স দিতে পারে। এইক্ষেত্রে স্ত্রী বেশকিছু অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ধীরে ধীরে নারীর বাজারদর কমতে কমতে স্বাভাবিক বাজারদরে চলে আসে এবং একপর্যায়ে অন্যসব পণ্যের মতোই নারী তার বাজারদর হারিয়ে ফেলে। তখন একজন নারীকে পুরুষের মতোই কায়িক শ্রম বিক্রি করে অথবা সারাজীবনের অর্জন সন্তানের ওপর ভর করে বেঁচে থাকতে হয়।
পুঁজিবাদী সমাজ যেহেতু সবদেশে সমভাবে বিকশিত হয়নি, তাই বিকশিত পুঁজিবাদী দেশে নারী নিজেকে যেভাবে বিক্রি করতে পারে, আমাদের মতো আধা সামন্ততান্ত্রিক নয়া ঔপনিবেশিক দেশে নারী অতটা স্বাধীনভাবে নিজেকে বিক্রি করতে পারে না। তাকে তার অভিভাবকের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। এখনো আমাদের মতো যেসব দেশে পুঁজিবাদের বিকাশ হয়নি, সেসব দেশে সামন্ত মানসিকতা এতটাই প্রবল যে, মধ্যযুগের মতোই নারীর সতীচ্ছদের সঙ্গে তার চেহারা-সুরতকেও সতিত্বের অংশ ধরা হয়। পার্থক্য এই যে, মধ্যযুগে নারীকে সতিত্ব বন্ধনী পরানো হতো, এখন ‘কাপড় বন্ধনী’ পরিয়ে পুরো শরীরটাকেই তালা দিয়ে রাখা হয়। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে, আগে নারীকে বাধ্য করা হতো। এখন আমাদের মতো আধা পুঁজিবাদী সমাজের অধিকাংশ নারী নিজের দুর্বলতা, অক্ষমতা, মূর্খতা ঢেকে রাখতে নিজেই নিজেকে কচ্ছপের মতো কাপড়ের নিচে লুকিয়ে রাখে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবার সনদ নিয়েও রূপ-লাবণ্যকেই জীবনের একমাত্র অবলম্বন মনে করে এবং তা সযত্নে লালনপালন করে চড়া দামে বিক্রির আশায়।
যদিও এই দায় সমাজের, চলমান সমাজই আমাদের মা-বোন-কন্যাদের বিশুদ্ধ পণ্য হবার শিক্ষা দেয়, সতী থাকার জন্য কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার শিক্ষা দেয় এবং বাধ্য করে।
একমাত্র সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাতেই নারী মানুষের মর্যাদা পায়। তাই মানুষ হতে হলে, মানুষের মতো মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে হলে সমাজকে বদলানোর দায়টা নারীদেরকেও নিতে হবে। অনেকে হয়তো মনে করে নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীমুক্তি হবে। তবে জেনে রাখুন :
বিশ্বময় যত আছে নারী রাষ্ট্রনেতা
এরা কেউ নয় নারীবাদী
নারীর মুক্তিদাতা,
যতই বাজাক মধুর বাঁশি
তারা নিকৃষ্ট পিতৃতন্ত্রের
উৎকৃষ্ট সেবাদাসী।