সমুদ্রে যাওয়ার জোর প্রস্তুতি পাইকগাছার জেলেপল্লীতে

আপডেট: 02:09:19 09/10/2018



img
img

এস এম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা) : শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য পাইকগাছার জেলে পল্লীগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে।
নতুন নৌকা ও ট্রলার তৈরি এবং পুরনো নৌকা মেরামত, জাল বোনা ও জাল শুকানোর ধুম পড়েছে। জেলেপল্লীর নারী-পুরুষরা সুন্দরবনের দুবলার চরে যাওয়ার জন্য কর্মব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন। সুন্দরবন ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতির সাফল্যের মধ্য নিহিত সারা বছরের জীবিকা অর্জনের বিষয়টি।
উপজেলার বোয়ালিয়া, হিতামপুর, মাহমুদকাটী, নোয়াকাটি, কপিলমুণি, কাটিপাড়া, রাড়–লী, শাহাপাড়া, বাঁকাসহ বিভিন্ন গ্রামের জেলেপল্লীর প্রায় ২৪০টি নৌকা বা ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। নতুন নৌকা বা ট্রালার তৈরি, পুরনো ট্রলারগুলো সংস্কার, জালবোনা, নৌকায় রঙ করা, জালে গাব কুটে তার রস লাগানোসহ সমুদ্রে যাওয়ার বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে জেলেপল্লীর নারী-পুরুষরা ব্যস্ত।
উপজেলার বোয়ালিয়া মালোপাড়ার বিশ্ব বিশ্বাস, দীপংকর বিশ্বাস, সীতারাম, তাপস বিশ্বাস, কেনা বিশ্বাস, জয়দেব, সুজন, দয়াল মণ্ডল, প্রদীপ বিশ্বাসের নতুন নৌকা তৈরি ও পুরনো নৌকা মেরামত চলছে কপোতাক্ষ নদের তীরে বোয়ালিয়া ব্রিজের দুই পাশে।
বিশ্ব বিশ্বাস ও দীপংকর বিশ্বাস জানান, নতুন একটি ট্রলার তৈরি করতে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। ৬০ ফুট লম্বা ১৭ ফুট চওড়া একটি ট্রলার তৈরি করতে প্রায় ৪০০ সিএফটি কাঠ লাগে। সব কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরি হয় না। এলাকায় পাওয়া যায় এমন চম্বল, বাবলা, শিরিশ, মেহগনি, খই কাঠ দিয়ে তারা ট্রলার তৈরি করছেন। প্রতি সিএফটি খই, বাবলা ও চম্বল কাঠ ৫০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা দরে কিনছে। নৌকা বা ট্রলার তৈরি করতে বিভিন্ন স্থান থেকে কারিগর আনতে হয়। সাতক্ষীরা জেলার, দওগাহপুর গ্রামে ট্রলার-নৌকা কারিগর শেখ আব্দুল হাফিজ, শেখ মিরাজ হোসেন তাদের দুটি দলে চারজন সহকারী নিয়ে নতুন ট্রলার তৈরির কাজ করছে। কারিগর শাহ আলম, রবিউলসহ এলাকার জনবল দিয়ে পুরনো ট্রলার মেরামত করা হচ্ছে। কারিগরদের থাকা-খাওয়া বাদে প্রতিটি নতুন ট্রলার-নৌকা তৈরি বাবদ মজুরি গড়ে ৭০ হাজার টাকা। নৌকা বা ট্রলার তৈরির পর তাতে রঙ করতে প্রায় ১২ টিন আলকাতরা লাগে। পুরনো ট্রলার-নৌকা মেরামত করতে ২০-৭০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। একটি নতুন ট্রলারে প্রায় তিন মণ পেরেক, ১০০ কেজি বলই প্রয়োজন হয়। নৌকা বা ট্রলার তৈরি পর ইনজিন বসাতে এক লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। মাছ ধরার একেকটি জাল তৈরি করতে খরচ হচ্ছে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত।
জেলেরা বলছেন, সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য প্রতি ট্রলারে দুটি জাল প্রয়োজন হয়। প্রতি ট্রলারে জাল ধরার জন্য ৫-৬ জন কর্মী দরকার হয়। তাদের থাকা-খাওয়া বাদে প্রতি মাসে ৮-১০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য নৌকাপ্রতি ৫-৬ মাসে সব কিছু মিলে খরচ পড়ে প্রায় ৫-৬ লাখ টাকা।
তারা আরো জানান, এলাকার মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার নিতে হয়। ছয় থেকে সাত মাসের জন্য তারা সুদে টাকা নেন। প্রতি এক লাখ টাকায় মহাজনদের প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা সুদ দিতে হয়।
জেলেপাড়ার অজয় বিশ্বাস জানান, সরকার যদি ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে তাদের মাছ ধরে উপার্জিত টাকা ঘরে আনা সম্ভব। তা না হলে মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া চড়া সুদের টাকা শোধ করার পর উদ্বৃত্ত কিছুই থাকে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলেরা মহাজনের অধীনে থেকে সমুদ্রে মাছ ধরেন। মহাজনরা জেলেদের পাশ-পারমিট করে রাখেন। দুবলার চরে রওনা দেওয়ার আগে মোংলা থেকে পাশ-পারমিট নিয়ে জেলেরা মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য রওনা দেন। মোংলা হয়ে বলেশ্বর নদী দিয়ে দুবলার চরে যান তারা। এতে করে পাইকগাছার জেলেদের প্রায় তিন দিন বাড়তি সময় লাগে। খরচও বেড়ে যায়। সমুদ্রে যাওয়া জন্য বনবিভাগ থেকেও পাশ-পারমিট নিতে হয়। সব কিছু ঠিক থাকলে দুর্গাপূজা শেষে জেলেরা মাছ ধরার জন্য সুন্দরবনের দুবলার চরের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৩টি চর নিয়ে জেলেরা যে মৎস্যপল্লী তৈরি করেন, বন সুরক্ষার জন্য এবার তা সীমিত করা হতে পারে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ বলছে, বঙ্গোপসাগর উপকূলে মাছ ধরার মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে বনবিভাগ ব্যবস্থা নেবে।
বোয়ালিয়া জেলে পল্লীর দীপংকর বিশ্বাস ও বিশ্বজিৎ বিশ্বাস জানান, দুর্গাপূজার পর উপজেলার সব ট্রলার একসঙ্গে রওনা দেবে। মংলা হয়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে গিয়ে বাসা বেঁধে অবস্থান নেবেন তারা।

আরও পড়ুন