সরকারি টাকায় ‘ব্যক্তিগত রাস্তা’, বঞ্চিত গ্রামবাসী

আপডেট: 02:15:39 06/06/2018



img
img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : ৫০ গজ এর ব্যবধানে দুটি পিচঢালা পাকা রাস্তা বেরিয়ে গেছে ঝিনাইদহ-শৈলকুপা ভায়া গাড়াগঞ্জ সড়কের হাবিবপুর এলাকা থেকে। যার একটি গিয়ে মিশেছে প্রকৌশলী খন্দকার আসাদুজ্জামানের বাড়ির দরজায়। আরেকটি তারই বড় ভাই খন্দকার শহিদুল ইসলামের দরজায়। ৩০০ মিটার দীর্ঘ এই দুই বাড়ির দরজা পর্যন্ত রাস্তা পাকা করার পর অবশিষ্ট ১০০ মিটার পাকা হয়েছে গ্রাম অভিমুখে।
সড়ক দুটি নির্মান করেছে ঝিনাইদহ এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। ২২ লাখ টাকা খরচ করে নির্মাণ করা এই সড়কটি প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আর তার পরিবারের সুবিধার জন্য করা হলেও মূল গ্রামের রাস্তা দিয়ে চলাচলের উপায় নেই। গোটা গ্রামের রাস্তাই বর্তমানে ভাঙাচোরা। গ্রামবাসী বলছেন, প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান গ্রামের রাস্তা পাকা না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ পরিবারের সদস্যদের বাড়ির চারপাশ পাকা করেছেন।
শৈলকুপা এলজিইডি অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘খুলনা বিভাগ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় এই সড়ক দুটি পাকা করা হয়েছে। প্রকল্পের নাম রয়েছে ‘শৈলকুপা উপজেলাধীন হেড কোয়ার্টার খন্দকার সড়ক মুড়াতলা সড়ক উন্নয়ন’। দৈর্ঘ্য আছে ০০ থেকে ৪০০ মিটার। এই দুইটি সড়ক পাকা করতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২২ লাখ ৯৪ হাজার ৩১৬ টাকা। চুক্তি মূল্য ২০ লাখ ৬৪ হাজার ৮৮৪.৪০ পয়সা। ‘মোল্লা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করেছে। কাজটি শুরুর কথা ছিল ২৮ অক্টোবর ২০১৭, শেষ হওয়ার কথা ১৭ জুলাই ২০১৮ তারিখের মধ্যে। নির্ধারিত দিনের আগেই কাজটি শেষ করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এক মাসের বেশি সময় হলো রাস্তাটি পাকা করার কাজ শেষ হয়েছে।
সম্প্রতি শৈলকুপার হাবিবপুরে গিয়ে দেখা গেছে, আনুমানিক ৫০ গজ ব্যবধানে দুটি নতুন পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। একটি রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর রাস্তাটি শেষ হয়ে যায়। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর নির্মাণ করা এই রাস্তাটি একটি বাড়ির প্রধান ফটকের সঙ্গে মিশেছে। প্রধান রাস্তা থেকে ওই বাড়ির ফটকের দূরত্ব আনুমানিক ১৫০ মিটার। ওই বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রবিউল ইসলাম খন্দকার জানান, এই বাড়িটি তার ভাই প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান খন্দকারের। তিনি এই রাস্তাটি পাকা করার ব্যবস্থা করেছেন।
এবার পশ্চিম পাশের রাস্তা ধরে আরো কিছুদূর এগিয়ে গেলেই দেখা যায় রাস্তাটি গ্রামের মধ্যে চলে গেছে। আনুমানিক ১২০ মিটার যাওয়ার পর পাকা রাস্তাটি পূর্ব দিকে নেমে আরেকটি বাড়ির প্রধান ফটকে মিশেছে। প্রধান রাস্তা থেকে এই বাড়ির ফটকের দূরত্ব আনুমানিক ১৫০ মিটার। বাকি প্রায় ১০০ মিটার পাকা করা হয়েছে গ্রামের অভিমুখে চলে যাওয়া রাস্তায়। ভাই শহিদুল ইসলাম খন্দকারের বাড়ির গেটে দেখা যায়, পাকা ওই সড়কের ওপর ধান মেলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে এক নারী ধান শুকানোর কাজ করছেন।
গ্রামের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে এই বিষয়ে কথা হয়। তারা নাম প্রকাশ করতে চান না। বলছেন, গাড়াগঞ্জ-শৈলকুপা সড়কের হাবিবপুর থেকে যে রাস্তাটি তাদের গ্রামের মধ্যে গেছে, এটি আনুমানিক দেড় কিলোমিটার। এরপর রাস্তাটি গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকে অন্য রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। এই রাস্তাটি ইটের খোয়া দিয়ে দশ থেকে ১২ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে খোয়ার রাস্তা ভেঙেচুরে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। মাঝে মধ্যেই ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটে। তারা এই দেড় কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করার জন্য নানা সময় এলজিইডি দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করে দেখতে পান রাস্তাটি পাকা করার কাজ শুরু হয়েছে। তারা আশা করেছিলেন, গ্রামের রাস্তাটি এবার চলাচলের যোগ্য হবে। কিন্তু দেখা গেল, এক পরিবারের বাড়িতে যাওয়ার জন্য দুটি রাস্তা পাকা করা হচ্ছে। সামান্য রাস্তা পাকা করা হয়েছে গ্রামের দিকে। এভাবে গ্রামের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে পাকা রাস্তা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে শৈলকুপা উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মো. সানাউল হক জানান, রাস্তা দুটির প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় তিনি এই উপজেলায় যোগদানের আগেই। ফলে তিনি বিস্তারিত বলতে পারছেন না।
এভাবে ব্যক্তি স্বার্থে রাস্তা পাকা করা ঠিক হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি প্রকৌশলী সানাউল।
আর ঝিনাইদহ জেলা এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক জানান, কাজটি অনৈতিক হয়েছে। জনগণের কল্যাণে নয়, ব্যক্তির স্বার্থে এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করা রাস্তা করা ঠিক হয়নি। তিনি বিষয়টি অবগত ছিলেন না বলে উল্লেখ করেন। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান।

আরও পড়ুন