সাতক্ষীরায় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নের ৫ কোটি টাকা হরিলুট

আপডেট: 01:15:33 26/07/2016



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : জেলার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-পিইডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় স্লিপ ও প্রাক-প্রাথমিকে বরাদ্দ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হরিলুট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দুএকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এসব টাকার সঠিক ব্যবহার করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ভুয়া বিল-ভাউচার করে টাকা আত্মসাৎ করছে।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধান এবং পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ আরো অনেকে কমিশনের ভিত্তিতে টাকা ভাগাভাগিতে লিপ্ত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরা জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা মিলে প্রতিষ্ঠান রয়েছে এক হাজার ১৭১টি। এর মধ্যে স্লিপ প্রকল্পের আওতায় ৪০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৭৭টি প্রতিষ্ঠানকে। আর প্রাক-প্রাথমিকের আওতায় পাঁচ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৮৬টি প্রতিষ্ঠানকে। স্লিপ প্রকল্প ও প্রাক-প্রাথমিকে জেলায় মোট বরাদ্দ হয়েছে চার কোটি ৮৫ লাখ দশ হাজার টাকা। এছাড়াও জেলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানকে ছোটখাটো মেরামত কাজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা করে।
সূত্র জানায়, বরাদ্দ করা এই টাকায় কেনা মালামালের তালিকা বিদ্যালয়ে জনসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু জেলার বেশ কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে কোনো তালিকা চোখে পড়েনি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বরাদ্দকৃত এ টাকার সবটা তাদের হাতে আসে না। এর মধ্যে একটি অংশ ভ্যাট বাবদ কেটে রাখা হয়। এছাড়াও তথাকথিত অফিস খরচ তো আছেই।
‘অফিস খরচের’ ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘স্লিপ প্রকল্পের ৪০ হাজার টাকা থেকে ৭০০, প্রাক-প্রাথমিকের টাকা থেকে ৩০০ এবং ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য বরাদ্দের মধ্যে ৫০০ টাকা করে টিও স্যারকে দিতে হয়। এছাড়া অন্যান্য খরচ তো আছেই। তবে, উপজেলা ভিত্তিক এ টাকা কম-বেশি হতে পারে। সম্প্রতি এই ঘুষ লেনদেন নিয়ে সদর উপেজলায় প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোস্তাক আহমেদ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন।’
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জানা যায়, এ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ২০০। এর মধ্যে পৌর এলাকায় অবস্থিত ৩৩টি এবং গ্রামে অবস্থিত ১৬৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানপ্রতি স্লিপ প্রকল্পের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা এবং প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ কেনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এ উপজেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯০ লাখ টাকা; যার মধ্যে স্লিপ প্রকল্পে ৮০ লাখ এবং প্রাক-প্রাথমিকে দশ লাখ টাকা। একইভাবে বরাদ্দ হয়ে জেলার অন্য উপজেলাগুলোতেও।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাওয়ালখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিউর রহমান বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। বিগত বছরে কী কাজ হয়েছে তা বলতে পারবো না। তবে বর্তমান বছরের কাজ এখনো শেষ হয়নি। কিছু ঝামেলা আছে তা মিটিয়ে কাজ করবো।’
শ্যামনগর হাবিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই বলেন, ‘যে টাকা পেয়েছি তা দিয়ে বেশ কিছু মালামাল কেনা হয়েছে। বাকি টাকার মালামাল কেনা হবে।’
সদর উপজেলার খড়িয়াডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি পরিমল মণ্ডল বলেন, ‘টাকা পেয়েছি। কাজ করার জন্য প্রধান শিক্ষককে বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু তিনি নানা অজুহতে কাজ করছেন না।’
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, ‘বরাদ্দ টাকা যাতে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়, সে বিষয়ে আমরা তৎপর আছি।’
দেবহাটা উপজেলা শিক্ষা অফিসার দেবাশীষ সিংহ বলেন, ‘জুনের আগে কাগজে-কলমে কাজ শেষ করা হয়েছে। তবে বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনো শতভাগ কাজ শেষ করা হয়নি। যারা শেষ করেনি তারা দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করবে। তবে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ না করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘জুনের আগে কাজ শেষে করে বিল-ভাউচার জমা দিয়েছে। তবে যদি কেউ সে মোতাবেক কাজ না করে তাহলে খোঁজ-খবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তবে তিনি অফিসে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফ হোসেন বলেন, ‘কিছু কিছু বরাদ্দের সাথে জেলা অফিসের কোনো যোগসূত্র থাকে না। সে কারণে অনেক বিষয়ে আমরা কিছু করতে পারি না। তবে যদি এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে সেগুলোর ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরও পড়ুন