সাতক্ষীরা মেডিকেলে চাকরির নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ

আপডেট: 09:20:03 23/02/2018



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আউট সোর্সিং পদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গত কয়েক মাস ধরে মেডিকেল কলেজের প্রকল্প পরিচালক থেকে প্যাথলজিস্ট পর্যন্ত অনেকেই আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিয়োগের নামে পরিচয়পত্র দিয়ে কাজে যোগদান করিয়েছেন অসংখ্য চাকরিপ্রত্যাশীকে। মেডিকেলের প্যাথলজিস্ট সুব্রতকুমার দাস ও তার সহযোগী বশির আহম্মেদের বিরুদ্ধে রয়েছে এসব ভুয়া নিয়োগ ও পরিচয়পত্র প্রদানের গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও। প্রতারণার শিকার হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হলেও সেখানেও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। প্রতারক নিয়োগ চক্রটি লাখ লাখ টাকা লুটে নিয়ে এখন চাকরিপ্রার্থীদের জীবননাশের হুমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে।
বাগেরহাটের রণভূমি গ্রামের খান শওকাত আলীর ছেলে খান আসাদুজ্জামান জানান, একটি ব্যাংকে চাকরি সূত্রে সাতক্ষীরা শহরের পলাশপোল গ্রামে অবস্থানকালে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের সুকুমার দাসের ছেলে সুব্রত দাসের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরিচয় সূত্রে বন্ধুত্ব। এরপর মেডিকেলে চাকরির টোপ দেন আসাদুজ্জামানকে। তিনি প্রথমে নিজের স্ত্রী ও পরে শ্যালিকার চাকরির জন্য যোগাযোগ করতে থাকেন। এরপর ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে সুব্রত তার শহরের খুলনা রোড এলাকার ভাড়াবাড়িতে বসে তার কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নেন।
এরপর পর্যায়ক্রমে বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ খানপুর গ্রামের আব্দুল গনির ছেলে মিলন শেখের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা, একই থানার রণভূমি গ্রামের আজহার আলির ছেলে সাইফুল ইসলামের কাছ থেকে তিন লাখ, উত্তর খানপুর গ্রামের আবু তালেবের ছেলে আবু হাসানের কাছ থেকে তিন লাখ, খোকন শেখের ছেলে তানভীর হোসেনের কাছ থেকে তিন লাখ, বাগমারা গ্রামের ফজলুল রহমানের মেয়ে মনিরা খাতুনের কাছ থেকে তিন লাখ, চুলকাটি গ্রামের ইব্রাহিম শেখের ছেলে ইবাদুল হোসেন টিপুর কাছ থেকে তিন লাখ টাকা এবং ফকিরহাট উপজেলার দাড়িয়া গ্রামের জাফর শেখের ছেলে হাসানুর রহমানের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নেন। হিসেবে দেখা যায়, এই ব্যক্তি মোট ২৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন চাকরি দেওয়ার নামে।
খান আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানান, এসব টাকা লেনদেনের সময় শহরের পলাশপোলের মৃত তোফাজ্জেল বিশ্বাসের ছেলে ফিরোজ বিশ্বাস, একই এলাকার মৃত আব্দুল আনাম খানের ছেলে ইউসুফ খান পলাশ, নারিকেলতলার আশরাফুল ইসলাম ঝড়ু, জেলার দেবহাটার কুলিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে হাসানুর জামান কারিগরসহ অনেকে সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরো জানান, বিপুল অংকের এসব টাকা গ্রহণ করে মাস্টার রোলে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে তাদেরকে ভুয়া নিয়োগ ও পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। আবেদনকারীরা পরিচয়পত্র পেয়ে এক থেকে দেড় বছর 'চাকরি'ও করেন। কিন্তু এক-দুই মাস ছয় হাজার টাকা করে বেতন দেওয়ার পর আর তাদের বেতন দেওয়া হয় না। এসময় তাদের জানানো হয় মাস্টার রোল শেষ হলে তারা স্থায়ী চাকরি পাবেন। কিন্তু চাকরি না হওয়ায় বিপাকে পড়ে অনেকে এলাকা ছাড়তে শুরু করেন।
শহরের পলাশপোলের মৃত তোফাজ্জেল বিশ্বাসের ছেলে ফিরোজ বিশ্বাস জানান, ইতিমধ্যে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সরকারিভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলে নতুন নতুন প্রার্থী এনে তাদের কাছে থেকে আবার লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে চাকরি দেওয়ার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে এই চক্রটি। পরিস্থিতি বুঝে এসব টাকা প্রদানকারীরা বেতন না পাওয়ায় সাতক্ষীরা ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য হয়। তখন তাদের কাছ থেকে লিখে নেওয়া হয়, 'আমি চাকরি করব না, স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছি'। প্রার্থীদের কেউ কেউ টাকা ফেরতের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে তাদেরকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। টাকা গ্রহণের সময় সামনে থাকা আশরাফুল ইসলাম ঝড়ু ও তার লোকজনকে দিয়ে নানাভাবে জীবননাশের হুমকিসহ মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে শহরছাড়া করার পরিকল্পনাও করেন প্যাথলজিস্ট সুব্রত ও তার কথিত ক্যাডার ঝড়ু।
গত বছরের ১৪ নভেম্বর সাতক্ষীরা সদর থানায় খান আসাদুজ্জামান প্রতারিতদের পক্ষে একটি অভিযোগ দাখিল করেন। সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মারুফ আহম্মদ বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দেন এএসআই শাহিনুর রহমানকে। এএসআই শাহিনুর প্রাথমিক তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পান। এক পর্যায়ে শাহিনুর রহমান ভুয়া চাকরিদাতা সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্যাথলজিস্ট সুব্রত দাস ও তার আরেক সহযোগীকে আটক করে থানায় নিয়ে যান।
এসময় চাকরিপ্রার্থী আরো অনেকে থানায় হাজির হন টাকার দাবিতে। প্যাথলজিস্ট সুব্রত দাসের উপস্থিতিতে পুলিশি তদন্তে এবং চাকরিপ্রার্থীদের সামনে হিসেব করে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা দাবি করেন প্রতারিতরা। এএসআই শাহিনুরের সামনে সেখানেই টাকা প্রদানকারীদের সবাইকে ২০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে ৫০০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে থানা থেকে মুক্তি পান সুব্রত দাস। স্ট্যাম্পে উল্লেখ থাকে যে, ৪ ডিসেম্বর ২০১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে দুই কিস্তিতে ২০ লাখ টাকা এএসআই শাহিনুরের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ফেরত দেবেন সুব্রত দাস।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শর্তসাপেক্ষে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে দিয়ে থানা থেকে মুক্তির পর শুরু হয় নতুন খেলা। নির্ধারিত সময়ে থানায় টাকা জমা না দিয়ে পুলিশকে পক্ষে নেওয়ায় এবার চাকরিপ্রত্যাশী টাকা প্রদানকারীরা আর থানায় পাত্তাই পান না। টাকা চাইলে তাদেরকে নানাভাবে হুমকি-ধামকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন খান আসাদুজ্জামান ও ফিরোজ বিশ্বাস।
এব্যাপারে এএসআই শাহিনুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, সুব্রতর ব্যাপারে দাখিলকৃত অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আমাকে নিযুক্ত করার পর আমি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাই। সে মোতাবেক সুব্রতকে থানায় এনে অভিযোগকারীদের সামনেই টাকা ফেরতের শর্তে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
''এরপর লিখিত স্ট্যাম্প ও আনুসঙ্গিক কাগজপত্র ওসি স্যার আমার কাছ থেকে নিয়ে নেন। আর আমাকে জানান, 'তুমি থামো, আমি দেখছি।''
অভিযোগ রয়েছে মোটা অংকের সুবিধা নিয়ে পুরো ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছেন কোনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি। ফলে প্রতারিতরা এখন পথে পথে ঘুরছেন।
এব্যাপারে সাতক্ষীরা মেডিকেলের প্যাথলজিস্ট সুব্রতর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমি চাকরি দেওয়ার কে? এখানে কাজ শেখার জন্য কয়েকজন এসেছিল। যেহেতু কোটি কোটি টাকার মেশিন রয়েছে, তাই জামানত হিসেবে ২০ হাজার করে টাকা নিয়েছিলাম ৫-৬ জনের কাছ থেকে। পরে তারা আসেনি। এলে এবং টাকা ফেরত চাইলে যেকোনো সময় ফেরত দেওয়া হবে।'
থানায় বসে আলোচনা হলেও কোনো লেখাজোখা নেই বলে দাবি করেন সুব্রত।
টাকা গ্রহণের চেক ও ভুয়া পরিচয়পত্র কীভাবে দিলেন?- এমন এক প্রশ্নে সুব্রত বলেন, 'এসব কোনো ব্যাপার না।'
এবিষয়ে মেডিকেল কলেজের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ডা. দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে তার নাম্বারে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ না করে কেটে দেন।
মেডিকেল কলেজের বর্তমান সুপার ডা. শাহজান আলী বলেন, 'আমি সম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি। তেমন কিছুই জানি না। তবে কম বেশি এসব সমস্যার কথা শুনেছি।'
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত প্রতারক চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

আরও পড়ুন