সাতক্ষীরা সীমান্তে খাটাল মালিকদের চাঁদার খাঁই

আপডেট: 02:05:31 29/08/2017



img
img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : ‘গরুর ব্যবসা করে এখন আর লাভ হয় না। তবে এই ব্যবসা করি কেন জানেন ? ভারতে অনেক টাকা পড়ে রয়েছে। এই টাকা আদায় করার জন্য লোকসান করে ব্যবসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ভারতীয়রা যে দাম ধরে গরু পাঠায় সেই দামে গরু বিক্রি করা খুবই কঠিন। আর পরে বাংলাদেশের মাটিতে গরু পা রাখার সাথে সাথে গুনতে হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি চাঁদা। এই টাকা যাচ্ছে খাটাল মালিক অসাধু বিজিবি-পুলিশ সদস্য আর রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে। যার ফলে কেউ এর প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।’
সাতক্ষীরার ঘোনা সীমাস্তে গরুর খাটালে দাঁড়িয়ে এসব আক্ষেপের কথা বলছিলেন ব্যবসায়ী বাবলু, ফিরোজ, মশিয়ার, আব্দুর রহমানরা। কুরবানি ঈদ উপলক্ষে এখন প্রতিদিন বহু গরু আসছে এই সীমান্ত খাটালে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে শোনা গেল, তারা চাঁদাবাজদের জুলুমের শিকার। চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট দফায় দফায় আদায় করছে চাঁদা। গরু ব্যবসায়ীদের মতে, রাজস্বের ৬-৭ গুন টাকা টাকা চাঁদা দিতে হয়। লাখ লাখ টাকার এই বেআইনি হাতবদল প্রকাশ্যেই হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর নেই এদিকে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্প্রতি ঘোনা সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বহু গরু আসছে ভারত থেকে। সাতক্ষীরার অন্য কোনো সীমান্ত দিয়ে এতো গরু আসে না। সুযোগ বুঝে ঘোনা সীমান্তে খাটাল মালিকরা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। আর ভারত থেকে গরু চোরাই পথে আসে বলে কেউ এর প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।
গরু ব্যবসায়ীরা জানান, নিয়ম অনুযায়ী ভারত থেকে একটা গরু বাংলাদেশে আসার পর ৫০০ টাকা রাজস্ব দিয়ে বৈধ করতে হয়। আর খাটাল মালিকদের দিতে হয় ৫০ টাকা। অথচ খাটাল মালিকরা গরুপ্রতি আদায় করছেন তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। আর ব্যবসায়ীদের নামে গরু ‘করিডোর’ না করে খাটাল মালিকরা নিজ নামে সব গরু ‘করিডোর’ করেন। উপার্জিত বেআইনি অর্থ অসাধু বিজিবি-পুলিশ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতার পকেটে যার যার প্রাপ্য অনুসারে পৌঁছে যায় ।
গরু ব্যবসায়ী তজিবব, শহিদুল, লতিফ জানান, শুধু ঘোনায় নয়, কালিয়ানি, শাখড়া, কোমরপুর, বৈকারি, তলুইগাছা, কাকডাঙ্গা, মাদরা হিজদি, চান্দুড়িয়া সীমান্ত দিয়েও ভারতীয় গরু আসে। তবে তা সংখ্যায় কম। ওই সব সীমান্তেও একই পদ্ধতিতে টাকা আদায় করা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতীয়রা পাঠানো গরুর দাম ধরে খুব চড়া। এতো উচ্চ দরে গরু কিনে ব্যবসা করা মুশকিল। তারপর আবার খাটাল মালিকদের নিয়মবহির্ভূত চাঁদাবাজির যন্ত্রণা। ফলে লোকসান দিয়ে ব্যবসা করতে হচ্ছে। আর ব্যবসা না করলে তাদের সে দেশে পড়ে থাকা লাখ লাখ টাকা আর আদায় হবে না।
ব্যবসায়ীরা আরো জানান, ভারত থেকে আসা সব গরুর বিপরীতে সরকারকে রাজস্ব দেওয়া হয় না। রাজস্ব প্রদানের পুরনো রশিদ দেখিয়ে বহু গরু পার করা হয়। খাটাল মালিকরা কাস্টমস করিডোরে নিজেদের লোক পাঠিয়ে শুল্ক রশিদ কেটে আনে। গরুর পিঠে সিল দেওয়া এবং নাম্বার দেওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব চলে গেছে খাটাল মালিকদের হাতে। গরু রাখার দায়িত্ব পেয়ে খাটাল মালিকরা সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছেন।
ঘোনা খাটালে চাঁদা আদায়ের মূল দায়িত্বে থাকা আনিস জানান, চেয়ারম্যান, তার ভাই হাবু আর তিনি এই খাটাল পরিচালনা করেন। তবে মূল দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন জাকির। গরু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খাটাল বাবদ আড়াই হাজার টাকা করে আদায়ের কথা স্বীকার করেন তিনি।
অতিরিক্ত টাকা নেন কেন?- এমন প্রশ্নে তার জবাব, ‘আমি নিজেও একজন গরু ব্যবসায়ী। অন্য কোনো খাটালে গরু আসলে এর চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে গরু আনতে হয়। বরং আমরা অন্যদের তুলনায় কম টাকা নিই।’
ঘোনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুবক্কর সিদ্দিকী জানান, তার দলের কোনো নেতাকর্মী এই খাটালের সঙ্গে জড়িত নেই। খাটাল চালান মোশা ও তার ভাই হাবু। সঙ্গে আছেন নাশকতা মামলার আসামি সবুজ, মনির, লিটন, রবিউল। তারা এর প্রতিবাদ করে হামলা মামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন।
‘এসব করে মোশা অনেক টাকার মালিক। তার সাথে পারা যায় না। এজন্য খাটালে গরু ব্যবসায়ীরা অসহনীয় চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে,’ বলেন আবুবক্কর।
ঘোনা ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান মোশা জানান, খাটালে গরু প্রতি আড়াই হাজার টাকার নেওয়া হয়। তার মধ্যে ৫০০ টাকা ভ্যাট খরচ। বাকি টাকা তার আনুষঙ্গিক খরচ। তবে জামায়াত-বিএনপি বা নাশকতা মামলার আসামি তার সঙ্গে নেই বলে দাবি করেন চেয়ারম্যান।
সাতক্ষীরা ৩৮ বিজিবির ঘোনা ক্যাম্পের সুবেদার আমিরুল ইসলাম জানান, বিজিবি শুধু স্লিপ লিখে দেয়। গরুপ্রতি কত টাকা আদায় করা হয়, বিজিবির এটা জানার বিষয় না। কোনো অবৈধ কারবারের সঙ্গে বিজিবি জড়িত না।
সাতক্ষৗীরা সদর থানার ওসি মারুফ আহম্মেদ বলেন, ‘পুলিশ খাটালের অনুমতি দেয় না। যারা অনুমতি দেয় তাদের জিজ্ঞেস করেন কীভাবে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। যারা অনুমতি দেয় তারা যদি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আমরা সাথে থাকবো।’
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক আবুল কাসেম মো. মহিউদ্দীন জানান, তারা শুধু খাটাল পাহারা দেওয়ার অনুমতি দেন।
তার প্রশ্ন, অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়টি কে দেখবে? যাদের দেখার দায়িত্ব তারা এর সাথে জড়িত কি না খোঁজ-খবর নেন । তবে তার কোনো লোক এর সঙ্গে জড়িত নন বলে জানান জেলা প্রশাসক।

আরও পড়ুন