সাব্বির জাদিদের গল্প

আপডেট: 02:01:42 22/12/2017



img

পড়শি

তোবারক আলির শরীর খারাপ। জ্বর আর গলার ভেতর খুশখুশানি কাশি। তার উপর বয়সের ভার। দুই সপ্তাহ যাবত বিছানায় শোয়া সে। চলাফেরার ক্ষমতা নেই। অথচ একটা সময় কত দাপটের সাথেই না সে সংসারের কাজকর্ম করে বেড়িয়েছে। মাঠে, গনগনে রোদে বসে গরুর ঘাস কেটেছে। ধান লাগিয়েছে। নদী সাঁতরে ওপার গেছে মাছ ধরতে। সে সব কথা আজ ভাবতে গেলেও হাত-পা অবশ হয়ে আসে।
তোবারক আলির মনে হচ্ছে এ-যাত্রা সে আর টিকবে না। এর আগেও সে কয়েকবার এমন সপ্তাব্যাপী বিছানায় পড়েছিল। বিছানা তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বারবার গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে। মোষ যেভাবে দীর্ঘ সময় ধুলোয় শুয়ে থাকার পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে গা ঝাড়া দেয়, তেমন। এবার আর সেই শক্তি নেই। অনেকে বলে, তোবারক আলি শুনেছে, কেউ কেউ নাকি মৃত্যুর আগে আজরাইলের গন্ধ পায়। তোবারক আলিও গন্ধ পাচ্ছে, তার সময় শেষ। কিন্তু চলে যেতে ইচ্ছে করছে না। কারই বা করে! তার মনে পড়ছে বড় ছেলের কথা। তালাক খাওয়া দুই মেয়ের মাকে বিয়ে করে বাড়ি উঠতে চেয়েছিল শরিফুল। তোবারক আলি মানেনি এই সম্বন্ধ। কী করে মানবে! সে গরিব হতে পারে, তাই বলে কি তার মানসম্মান জ্ঞান নেই! দুনিয়ায় কুমারী মেয়ের এতই আকাল পড়ল যে স্বামী খেদানো বুড়িকে তার বিয়ে করা লাগবে! শরিফুল বউ আর উপরি হিসেবে পাওয়া দুই মেয়েকে নিয়ে সেই যে গেল, আর ফেরেনি। কোথায় গেছে কেউ জানে না। ছোট ছেলে চোরাচালানির কেসে জেলে পচছে। ছেলে দুটোর একটাও যদি আজ পাশে থাকত, তোরাব আলি হয়ত এ-যাত্রায় বেঁচে যেত। না বাঁচুক, অন্তত দুই বোতল জ্বরের সিরাপ খেয়ে আরামে মরতে পারত। বিনা চিকিৎসায় মরা– এই লজ্জা থেকে রেহাই পেত।
সংসারে এখন তোবারক আলি আর তার বউ নবিছন। নবিছনেরও বয়স হয়েছে। এই বয়সে সে নিজেই হাল ধরেছে সংসারের। মুন্সি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করছে। বিনিময়ে যা পাচ্ছে– দুইবেলা ভাত আর মাস শেষে দুশো টাকা– এই আয়ে ওষুধ খাওয়ার বিলাসিতা অসম্ভব।
তোবারক আলির ঘরের সাথে ছুটিপুরের একমাত্র জামে মসজিদ। এতটাই লাগোয়া, দুই দেয়ালের মাঝে তৃতীয় কোন বস্তু নেই। তোবারকের টিনের বেড়া দেয়া ঘর। মসজিদের দেয়াল অবশ্য ইটের। তোবারকের ঘরের দিকে দুটো জানালা আছে মসজিদের। খোলাই থাকে প্রায় সময়। এই জানালা দিয়ে ভেতরের কথাবার্তা সবই শুনতে পায় তোবারক। এই যেমন এখন জুমার বয়ান চলছে। ইমাম সাহেব চিৎকার করে করে নামাজের ফজিলত শোনাচ্ছে মুসল্লিদের। মাঝে মাঝে সুবহানাল্লার ঢেউ উঠছে মসজিদজুড়ে। বিছানায় পড়ে থাকা তোবারক পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। সুস্থ থাকতে তোবারকও জুম্মার নামাজে শরিক হতো। যদিও নিয়মিত নয়। সংসারের হাজারটা কাজ। সব সামলে-সুমলে ওযু-গোছল করে পাকসাফ হয়ে জুমার জামাতে যেতে প্রায়ই তার দেরি হয়ে যেত। আর পাঁচ ওয়াক্তর জামাতে সে কোনদিনই নিয়মিত হতে পারেনি। এই নিয়ে কথাও কম শুনতে হয়নি তার। জালালুদ্দিন বকশ তো দেখা হলেই বলে, তোর মতো ভাগ্যবান আর কয়ডা আছে দুনিয়ায়! তুই হলি আল্লার ঘরের সপচে নিকটতম পোতিবেশি। তুই যদি নামাজটা নিয়মিত পড়িস, তোর জান্নাতে যাওয়া কিডা ঠ্যাকায়, ক!
তোবারকের খুব শখ জান্নাতে যাওয়ার। আর সে-জন্য সে ভাবে, নামাজটা তার শুরু করা দরকার। দুনিয়া কয়দিনের! কিন্তু জালালুদ্দিন বকশর সামনে থেকে সরে এসে আবার যখন সে লিপ্ত হয় সংসারের কাজে, সব ভুলে যায়। কখনো জালালুদ্দিন বকশর আক্ষেপের জবাবে সে বলে, মন তো চায় নামাজ ধরি, কিন্তু সুংসারের এতো কাম…।
জালালুদ্দিন বকশ কেড়ে নেয় মুখের কথা– সুংসারের কাম চেরকালই থাগবি। ইর ভিতর দিয়েই আল্লার কাম করা লাগবি।
আল্লাহর কাম আর করা হল না তোবারকের। এর আগেই ডাক পড়ে গেল বিছানার। তারপর হয়ত কবরের।
তোবারক খুব আশায় থাকে, ইমাম সাহেব একদিন হয়ত জুমার বয়ানে গরিব মানুষের কথা বলবে। অসুস্থ মানুষের সেবার উৎসাহ দেবে। ইমাম সাহেবের বয়ান শুনে হয়ত কিছু লোক ছুটে আসবে তাকে দেখতে। নবিসনের হাতে ওষুধ কেনার কয়টা পয়সা গুঁজে দেবে। সেই পয়সার ওষুধ খেয়ে তোবারক আবার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠবে। শেখের বাড়িতে কামলা খাটবে। নবিসনের জন্য একটা শাড়ি কিনবে। নিজের জন্য লুঙ্গি। আর শরীরের দুর্বলতা কাটাতে একটু মাছ। কিন্তু ইমাম সাহেব গরিব মানুষের কথা বলে না। প্রতি জুমায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কখনো নামাজ, কখনো মিলাদ, কখনো জিহাদের কথা বলে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে যে মানবসেবার কথা আছে, তোবারক জানে। না, সে লেখাপড়া করেনি কখনো। ইসলাম নিয়ে তো নয়ই। তবু সে জানে কিছুটা। সেই ঘটনা আরেকটু পেছনের। বারো বছর আগের। শরিফুল বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তোবারকের খুব অনুশোচনা হতো। প্রথম সন্তান শরিফুল। কত স্মৃতি, কত আদর জড়িয়ে আছে ছেলেটার গায়ে। অথচ অপছন্দের মেয়েকে বিয়ে করায় তোবারক তাড়িয়ে দিয়েছে ছেলেকে। প্রথম প্রথম তোবারকের মনে হতো, ছেলে ফিরে আসবে। অল্পদিনের ভেতর তার রাগ মুছে যাবে। যেভাবে স্লেট থেকে মুছে যায় চকের দাগ। এ তো সেই ছেলে, হাটের দিন আব্বার কাঁধে চড়ে হাটে যেতে না পারলে ধুলোয় গড়াগড়ি দিতো। কেঁদে মাথায় তুলত পাড়া। এই ছেলে কি আব্বাকে ছেড়ে থাকতে পারে! কিন্তু তোবারকের অঙ্কে ভুল ছিল। বইয়ের অঙ্ক তো সে বোঝেই না, জীবনের অঙ্কেও কাঁচা। সে বোঝেনি, এই শরিফুল আর কাঁধে ওঠা শরিফুলের ভেতর দুই যুগের ব্যবধান। শরিফুল ফেরেনি। তিন বছর পার হয়ে গেলেও শরিফুল ফেরেনি। তখন ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হতে থাকে তোবারক। তার এই দগ্ধ বুকের ঘা আরো বাড়িয়ে দেয় নবিসন। প্রায়ই সে বলে, খোঁটা দেয়ার মতো করে বলে, তুমার জন্নি, খালি তুমার জন্নি ছাওয়াল থাকতিউ আজ আমি ছাওয়ালহারা। জানিনে খুকা আমার কুথায় আছে, ক্যাম্মা আছে! বউয়ের বিলাপে তোবারক আলির অনুশোচনা একগুণ দুইগুণ হতে হতে বহুগুণ বেড়ে যায়। আর তখন অপরাধবোধের তাড়নায় কাউকে কিছু না বলে সে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল ঢাকার পথে, ছেলের খোঁজে। কারণ, সে শুনেছে, এই দেশে যারাই বাড়িছাড়া হয়, ঢাকায় গিয়ে ওঠে। এমনি এক মহাআশ্রয়দাতা ঢাকা। কিন্তু সে জানত না, ঢাকা ছোট্ট কোন শহর নয়। সেখানে ঠিকানা ছাড়া মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। একশটা ছুটিপুর অনায়াসে ঢুকে যাবে ঢাকার পেটে তবু তার তেষ্টা মিটবে না। জানলে সে হয়ত এই বোকামিটা করত না। এবং এই সফরে বিস্ময়কর সেই মানুষটার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল তোবারকের। সে-কথা আসছে।
কুষ্টিয়া টার্মিনাল থেকে তোবারক আলি দৌলতদিয়ার বাসে চড়েছিল। দৌলতদিয়া নেমে লঞ্চে পাটুরিয়া ঘাট পার হয়ে বিআরটিসি বাসে পৌঁছে যাবে গাবতলি। রাস্তায় পরিচিত হওয়া এক লোক এভাবেই তার ঢাকা গমনের পথ এঁকে দিয়েছে। দৌলতদিয়া নেমে তোবারক আলি পেটের অসুখে পড়ে। বাসে তিন টাকা দিয়ে টক হয়ে যাওয়া একটা সিঙ্গারা সে খেয়েছিল ক্ষুধার তাড়নায়। সম্ভবত এই পচা সিঙ্গারা পেটের ভেতর গিয়ে শিংঅলা দানব হয়ে পেটের দেয়ালে ঘাই মারছে। তা না হলে এত ব্যথা উঠবে কেন পেটের ভেতর। পেটের ব্যথায় তোবারক নাম না জানা একটা গাছের নিচে পেট চেপে ধরে বসে থাকে। অথবা গাছের নামটা সে জানে। পেটের যন্ত্রনায় ভুলে গেছে কিংবা খেয়াল করেনি। তোবারক আলি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকে, তার যেন পায়খানা না চাপে। কারণ এই বিদেশ-বিভূইয়ে পায়খানার উপযুক্ত জায়গা তার চোখে পড়ছে না। এই বিপদের কালে একটা অপরিচিত মানুষ এসে দাঁড়ায় তার পাশে। এমন একটা লোকের সত্যিই খুব দরকার ছিল তখন। সে তোবারকের মাথায় হাত দিয়ে বলে, কী হয়েছে চাচা!
বসা তোবারক মাথা তুলে লোকটাকে দেখে নিয়ে বলে, প্যাটব্যতা।
লোকটা আন্তরিকতা নিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী খেয়েছেন?
তিন টাকার টক সিঙ্গারা।
লোকটা তখন তোবারককে বসিয়ে রেখে এক দৌড়ে ছুটে যায় একটা ফার্মেসিতে। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ আর এক গ্লাস পানি এনে তোবারকের হাতে দিয়ে বলে, এই ওষুধটা খেয়ে নেন। ব্যথা সেরে যাবে ইনশাআল্লাহ।
ঘটনা বড় রহস্যময় লাগে তোবারকের। সে ধারণা করে, এই অঞ্চলের মানুষ বোধহয় এমনই। পেট ব্যথা কম হলে সে লোকটাকে জিজ্ঞেস করে, আপনে কিডা!
লোকটা বলে, আমার নাম সিদ্দিক। ঢাকায় থাকি। ছুটিতে গ্রামে আসছিলাম। এখন ফিরে যাচ্ছি।
আমার উপকার কল্লেন যে!
মানুষ তো মানুষেরই জন্যে। আপনার বিপদে আজ যদি আমি এগিয়ে না আসি কাল আপনি কি আমার বিপদে এগিয়ে আসবেন! আসবেন না। তাছাড়া আমাদের নবীজি বলেছেন, কেউ যদি সকাল বেলা একটা অসুস্থ মানুষকে দেখতে যায়, সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। আর কেউ যদি সন্ধ্যাবেলা একটা অসুস্থ মানুষকে দেখতে যায়, সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। বলুন, আপনার কাছে এসে কি আমি খারাপ করেছি!
তোবারক আলি চোখ বড় বড় করে এবার লোকটাকে দেখতে থাকে। হ্যাঁ, ভুল সে দেখছে না। এই লোকই নবীর কথা বলছে। তোবারক এতদিন জেনে এসেছিল, যাদের মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি, গায়ে জুব্বা, হাতে তসবি থাকে– এরাই খালি নবীর কথা বলে। কিন্তু সিদ্দিক নামের এই লোকের মাথায় না টুপি আছে, না মুখে দাড়ি আছে। তোবারকের ঘোর যেন কাটতে চায় না। ঠিকানা হারিয়ে ফেলা কিশোরের মতো সে কেবল আমতা আমতা করতে থাকে। সিদ্দিক জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবেন আপনি?
সিদ্দিককে বড় আপন মনে হয় তোবারকের। সে সব কথা খুলে বলে সিদ্দিককে।
সিদ্দিক এবার বড় সতর্ক হয়ে ওঠে। বলে, আপনি এইভাবে ছেলেকে খুঁজতে কখনোই ঢাকা যাবেন না, চাচা। ঢাকা কোন ছোট শহর নয়। ঠিকানা ছাড়া সেখানে কোন মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তার উপর আপনি বয়স্ক মানুষ। ঢাকায় নির্ঘাত কোন বিপদে পড়বেন। তোবারক তবু গাঁইগুঁই করে। কিক্তু সিদ্দিকের দৃঢ়তার মুখে মাঝপথ থেকে ফিরে আসে তোবারক। সঙ্গে নিয়ে আসে এক টুকরো বিস্ময়। সে ভাবে, এই মসজিদের ইমাম সাহেব কি নবীর সেই হাদিসটা জানে না, যেটা বলেছিল সিদ্দিক, বারো বছর আগে, ঢাকায় যাওয়ার পথে, দৌলতদিয়া বাস টার্মিনালে!
একদিন সকালে মসজিদের জানালা দিয়ে ভেসে আসে মাংসের ঘ্রাণ। ঘ্রাণ বলে দেয়, মশলাপাতি দিয়ে খুব যত্ন নিয়ে রান্না করা হয়েছে মাংস। এলার্জির রোগি হঠাৎ রোদে গেলে যেমন চামড়া চিড়বিড় করে ওঠে, তোবারকের পেটের ভেতরটাও অমন চিড়বিড়িয়ে ওঠে ক্ষুধায়, মাংসের সুবাস পেয়ে। নবিসনকে সে হাত ইশারায় ডাকে। নবিসন প্রথমে টের পায় না। সে ঘরের বাইরে হাতের তালুর মতো এক টুকরো উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল তখন। তোবারক দুর্বল হাতে চোকির উপর দুটো ঘুসি মারে। ধুম করে শব্দ হয়। নবিসন ঝাঁটা ফেলে ছুটে আসে ঘরে, স্বামীর কাছে– কী হইছে?
গোশ রানছে কারা? খুব বাস্না বারাইছে।
মসজিদি তবলিগ আইছে। তাগোর গোশ।
তোবারক তার তেল চিটচিটে বালিশের মতো চ্যাপ্টা পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, কতকাল গোশ খাইনে!
গোশ খাওয়া লাগবিনেন। গোশের বাস্না পাচ্ছ এই ম্যালা! নবিসন মুখ ঝামটা দিয়ে বেরিয়ে যায়। তার অনেক কাজ।
তোবারক ভাবে, সময় ফুরিয়ে গেলে কি স্বামীরা অসহ্য হয়ে ওঠে বউদের কাছে!
রাতে তোবারকের জ্বর বেড়ে যায়। খুশখুশানি কাশিটাও। নবিসন বালতি ভরে পানি এনে তোবারকের মাথায় ঢালে। দীর্ঘ সময় রোদের তাপে পুড়তে থাকা পানির মতো গরম হয়ে ওঠে মাথাধোয়া পানি। সেই পানির স্পর্শে নাবিসনের বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করে। জ্বরে লোকটা এতো পুড়ছে!
জ্বরের প্রকোপে সেই রাতে এক মুহূর্ত ঘুমাতে পারে না তোবারক। সারারাত কাতরায়। পাগলের মতো ছেলেদের নাম ধরে ধরে ডাকে। প্রথম প্রথম নবিসনের খুব মায়া লাগে মানুষটার জন্য। বালিশের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। গামছা ভিজিয়ে মুখ-গলা-বুক মুছে দেয়। ভেজা গামছার স্পর্শে তোবারকের একটু আরাম লাগে। জট পাকিয়ে যাওয়া মাথাটা একটু খোলাসা হয়। তখন আড়াল থেকেও সে টের পায়, মসজিদে ইশার নামাজ শেষ হয়েছে। তাবলিগের লোকেরা ফাজায়েলে আমাল থেকে তালিম করছে। একজন উঁচু গলায় হযরত আবু হুরায়রার ক্ষুধার কাহিনি পড়ছে। আবু হুরায়রা ক্ষুধার তাড়নায় বেহুঁশ হয়ে মসজিদে নববিতে পড়ে থাকতেন। আর মানুষেরা পাগল ভেবে তাকে মাড়িয়ে চলে যেত– এমন কাহিনি। শ্রোতাদের কেউ কেউ আবু হুরায়রার দুঃখে আহ করে ওঠে। তালিম শেষ হলে তারা খাওয়ার আয়োজন করে। মসজিদের ভেতর থেকে ভেসে আসে জগ-গ্লাস-প্লেট নাড়াচাড়ার টুঙটাঙ আওয়াজ আর খাবারের সুবাস। যিনি তালিম করছিলেন, খেতে খেতে বলেন, ইব্রাহিম সাব, কাল সকালে আমি উত্তরপাড়ায় যাব। সেখানে আমাদের তিনচিল্লার এক সাথীভাই আছে। খুব অসুস্থ। তাকে দেখতে যাব। আপনি থাকবেন আমার সাথে।
তোবারক ভাবে, হায়, সেও যদি তাবলিগে সময় দিত, আজ এই মানুষগুলোর সাহায্য সে নিশ্চয় পেতো।
তাদের খাওয়া শেষ হয়। কেউ একজন প্লেট ধোয়া পানি জানালা দিয়ে ফেললে তোবারকের টিনের বেড়ার উপর এসে পড়ে। তোবারকের মনে হয়, এঁটো পানি তার বেড়ায় নয়, বুকের উপর এসে পড়ল। এবং তার পরপরই তোবারকের কাতরানি বেড়ে যায়। নবিসনের এবার রাগ হয়ে যায়। জ্বর মানষির হয় না! এতো চিল্লও ক্যাঁ! মসজিদ ভরা লোক, তারা শুনলি কী মনে করবি! যত্তসপ!
এতক্ষণ সে কপালে জলপট্টি দিচ্ছিল। পট্টি সরিয়ে সে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে শুয়ে পড়ে গজগজ করতে করতে। সারাদিনের পরিশ্রমের পর শোয়ার সাথে সাথে তার ঘুম এসে যায়। চোকির উপর একলা শুয়ে থাকে তোবারক। চোখের কোণা বেয়ে তার জল গড়ায়। গলা দিয়ে বেরোয় কাতরানি। বড় ছেলেটার কথা মনে পড়ে। ছোট ছেলেটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে নবিসনের সাথে বিয়ের প্রথম দিনগুলোর কথা। তখন কত প্রাণময় ছিল জীবন। গতরে শক্তি ছিল। ইনকাম করত। ভাত-কাপড়ের অভাব ছিল না। খালি মুখে ঘুমোতে হয়েছে এমন কোন রাত আসেনি। একটু গুড়মুড়ি কিংবা একটু চিড়ে হলেও প্লেটে সাজিয়ে দিতো নবিসন। অথচ আজ সামান্য রাগে নবিসন শুয়ে পড়ল না খেয়ে। তোবারককেও বলল না খাওয়ার কথা।
জ্বরের সাথে লড়াই করে করে শেষরাতে তোবারক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আগুন-গরম গা। ধান ফেললে খই ফুটে যাবে অবস্থা। জ্বরের ঘোরে সে প্রলাপ বকতে থাকে। কয়েকবার নবিসনকে ডাকার চেষ্টা করে পানি খাবে বলে। কিন্তু গলার ভেতর যেন গাবের কষ, আওয়াজ বের হয় না। তাবলিগের লোকেদের তাহাজ্জুদের ওযু বানাতে টিউবয়েল জেগে উঠলে রাতের নীরবতা ভেঙে পড়ে, খানখান হয়ে যায়। টিউবয়েলের শব্দ তোবারকের পর্দাপড়া মস্তিষ্কে আছাড় খেয়ে তার পানির পিপাসা দ্বিগুণ করে দেয়। তার মনে হতে থাকে, সে মারা যাচ্ছে অথচ মুখে পানি দেয়ার লোক নেই, কানে আল্লাহর নাম দেয়ার মানুষ নেই। সে বড় শঙ্কিত হয়ে পড়ে। বেঈমান হয়ে মরার ভয়ে তার বুকের ভেতরটা আছাড়ি বিছাড়ি করে। ঠিক তখন, কেউ একজন খুব মিষ্টি সুরে কোরআন তেলাওয়াত শুরু করে মসজিদে। এমন মধুর সুর আগে কখনো শোনেনি তোবারক। হাওয়ায় দোলা ধানক্ষেতের মতো সুরের মিষ্টি ঢেউ তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সে তখন স্বস্তি পায়। ভাবে, মসজিদের পড়শি হওয়ার কারণে সে মৃত্যুর আগে আল্লাহর কালাম শুনে যেতে পারছে।
[বিডিনিউজ থেকে]