সিরিয়ায় পশ্চিমাদের জোটবদ্ধ আগ্রাসন

আপডেট: 02:15:03 14/04/2018



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : সিরিয়ায় এবার মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট সম্মিলিতভাবে আগ্রাসন শুরু করেছে। পূর্ব গৌতায় বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত সর্বশেষ শহর দৌমায় ‘রাসায়নিক হামলা’র জন্য বাশার আল আসাদের বাহিনীকে দায়ী করে দেশটির সরকার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন স্থাপনায় একযোগে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার প্রথম প্রহরে হোয়াইট হাউজ থেকে এই আক্রমণ শুরুর ঘোষণা দেন, যার হুঁশিয়ারি তিনি আগেই দিয়ে রেখেছিলেন।
ঘোষণার পরপরই সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে বড় ধরনের বিস্কোরণের শব্দ পাওয়া যায়।
ট্রাম্প বলেছেন, আসাদ সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের প্রতিক্রিয়া বজায় রাখার প্রস্তুতি আছে তার। 
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও সিরিয়ায় একযোগে হামলার কথা নিশ্চিত করেছেন।
মে বলেছেন, সিরিয়ায় হামলা না চালিয়ে যুক্তরাজ্যের উপায় ছিল না।
নিরাপত্তা পরিষদের তিন স্থায়ী সদস্যের চালানো যৌথ এ হামলা ‘ব্যর্থ’ হয়েছে বলে দাবি করেছে সিরিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম। একে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লংঘন’ হিসেবেও অভিহিত করেছে তারা।
২০১৫ সাল থেকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আসাদবাহিনীকে সমর্থন দিয়ে আসা রাশিয়া হামলার পাল্টা জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
জাতিসংঘে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত অ্যানাটমি অ্যান্টন বলেছেন, মস্কো সতর্ক করছে, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পরিণতির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না’।
যুক্তরাষ্ট্র আর তার পশ্চিমা মিত্রদের এই পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে সিরিয়ায় গত সাত বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্পের হামলার ঘোষণার পর এক প্রত্যক্ষদর্শী দামেস্কে অন্তত ছয়টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা ও আকাশে ধোঁয়া দেখতে পাওয়ার কথা জানান।
অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী দামেস্কের অন্তর্গত বারজাহ শহরেও বিস্ফোরণের খবর নিশ্চিত করেছেন। বারজাহ সিরিয়ার বৈজ্ঞানিক গবেষণার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। 
“কিছুক্ষণ আগে আমি যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীকে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের রাসায়নিক অস্ত্রের স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দিয়েছি। (সিরিয়ায়) বর্বরতার বিরুদ্ধে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রতিক্রিয়া সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের ক্ষমতাকে সংহত করবে,” টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে বলেন ট্রাম্প।
আট মিনিটের ওই ভাষণে দৌমায় গত সপ্তাহের ‘রাসায়নিক হামলা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না’ মন্তব্য করে আসাদকে ‘দানব’ আখ্যা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।  সিরিয়ার ‘স্বৈরশাসককে’ সমর্থন দেওয়ায় রাশিয়া ও ইরানেরও সমালোচনা করেন তিনি।   
পরে পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে জয়েন্ট চিফ অব স্টাফসের চেয়ারম্যান জেনারেল জোসেফ ডানফোর্ড সিরিয়ার তিনটি স্থাপনায় একযোগে হামলা চালানোর কথা জানান। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি গবেষণাগার ও রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ করে রাখা হয়েছে এমন একটি কারখানা ছিল বলেও তার দাবি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস জানিয়েছে, হামলায় সিরিয়ার তিনটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে দুটির অবস্থান দামেস্কে, অন্যটি হোমসে। 
মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জিম ম্যাটিস বলেছেন, গত বছরের এপ্রিলে  সিরিয়ার খান শেইখুনে হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রসহ যত অস্ত্র ছিল, শনিবারের হামলায় তার দ্বিগুণ ব্যবহৃত হয়েছে।
হামলা বড় হলে তা রাশিয়ার সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে বলে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিতর্কে ম্যাটিস বারবার সতর্ক করেছিলেন।
মার্কিন এ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরে বলেছেন, আসাদ যেন (রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের) পুনরাবৃত্তি না ঘটান, সে জন্যই এ ‘এককালীন হামলা’।
দৌমায় আসাদবাহিনী সারিন গ্যাস ব্যবহার করেছে বলেও দাবি করেন তিনি; নার্ভ গ্যাস সারিন ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি থাকায় ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পরিকল্পনা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মনুষ্য পরিচালিত বিমানগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ‘সীমিত হামলা’ চালায় বলে জানান ডানফোর্ড।
এতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহৃত হয়েছে বলে মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহিনী দামেস্কের দক্ষিণে কিসওয়া এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন হামলায় ব্যবহৃত ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তিন বেসামরিক নাগরিকের আহত হওয়ারও খবর দিয়েছে তারা।
দামেস্কের এক অধিবাসী জানান, সরকারি বাহিনীকে তিনি অন্তত ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী গোলা ছুড়তে দেখেছেন।
“সেগুলো আকাশে পাক খাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল তারা লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ করছে। আমি কোনো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দেখেনি, তবে কাছাকাছি এলাকায় সামান্য ধ্বংসস্তূপ দেখেছি,” বলেছেন তিনি।
গত বছর মার্কিন বাহিনী তাদের দুটো ডেস্ট্রয়ার থেকে সিরিয়ার খান শেইখুন বিমানঘাঁটিতে ৫৯টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যা দেশটির সরকারি বাহিনীর ক্রিয়াশীল বিমানের অন্তত এক পঞ্চমাংশের ভয়াবহ ক্ষতি করেছিলে বলে সেসময় দাবি করেছিল পেন্টাগন।
এবারের হামলাকে তারচেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে সিরিয়া ও তাদের মিত্রবাহিনীগুলো বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্ব গৌতায় সেনা অভিযান শুরু করে। তাদের আক্রমণে বেশিরভাগ বিদ্রোহীগোষ্ঠী পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এ মাসের শুরুতে বিভিন্ন আন্তর্জতিক সংবাদমাধ্যম সিরিয়ায় উদ্ধার ও চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত কয়েকটি দাতব্য সংস্থার বরাত দিয়ে দৌমায় রাসায়নিক হামলার খবর প্রকাশ করে। বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সেখানে ৪৩ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানায়, লক্ষণ দেখে বিষয়টি বিষাক্ত রাসায়নিক গ্যাস হামলা বলেই মনে হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর অসন্তোষের মধ্যেই গত সোমবার হোমসের কাছাকাছি সামরিক বিমানঘাঁটি তিয়াসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে অন্তত চারজন ইরানের নাগরিক বলে পরে জানায় আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ফারস।
শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করলেও দামেস্ক পরে ইসরায়েলি জঙ্গিবিমান থেকে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে দাবি করে। ইসরায়েল হামলার বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার- কোনোটিই করেনি।

সূত্র : রয়টার্স, বিবিসি, বিডিনিউজ

আরও পড়ুন