সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী শুক্রবার

আপডেট: 04:45:48 09/08/2018



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী ১০ আগস্ট শুক্রবার।
দিবসটি উপলক্ষে দিনজুড়ে নড়াইলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শিল্পীর কবর জিয়ারত, পুষ্পস্তবক অর্পণ, কোরআন খানি, দোয়া মাহফিল, শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী।
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট সুলতান নড়াইল শহরতলীর মাছিমদিয়ায় এক গরিব পরিবারে জন্ম নেন। তার বাবা মেছের আলী, মা মাজু বিবি ।
১৯২৯ সালের দিকে রাজমিস্ত্রি বাবা সুলতানকে ভর্তি করে দেন নড়াইল আশ্রম স্কুলে। কিন্তু স্কুলের শৃঙ্খলাবদ্ধ একঘেয়ে পড়াশুনা তার ভালো লাগতো না। প্রায়ই স্কুল পালিয়ে বনের ধারে কিংবা চিত্রা নদীর পাড়ে নির্জন বসে কাঠ-কয়লা, হলুদ, পুঁইশাকের বিচির রঙ দিয়ে ছবি এঁকে সকাল-দুপুর এমনকি বিকেল পার করে দিতেন সুলতান। ১৯৩৩ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালে স্কুল ভিজিটে আসেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। রিসিভশনের সময় গেটে দাঁড়িয়েই তার ছবি এঁকে ফেললেন শিশু সুলতান। রাশভারী উপাচার্য নিজের সুন্দর ছবি দেখে শিশু সুলতানের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘সাবাস’। এভাবে নড়াইলের তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের সুদৃষ্টিতে পড়েন এবং ১৯৪১ সালে তিনি লাল মিয়াকে কলকাতায় নিয়ে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও শিল্প-সমালোচক কলকাতা আর্ট স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য অধ্যাপক শাহেদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। সোহরাওয়ার্দির বিশেষ অনুরোধে অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা বিচার না করেই ১৯৪১ সালে অষ্টম শ্রেণি পাস লাল মিয়াকে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি করা হয়। কলেজে তার নাম দেওয়া হয় এস এম সুলতান।
১৯৪৪ সালে কলেজের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করে চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হলেও সুলতান কলেজ ছেড়ে চলে যান কাশ্মীরের পাহাড়ি অঞ্চলে। সেখানে উপজাতীয়দের সঙ্গে বসবাস ও তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে চিত্রাংকন শুরু করেন। এরপর শিল্পী সুলতান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেন এবং এসব দেশে প্রখ্যাত চিত্রকরদের সঙ্গে তার ছবি প্রদর্শিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের সিমলায় তার প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবি সমকালীন বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পলক্লি, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। ১৯৫১ সালে নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন সুলতান। ১৯৫৫ সালে সবার অলক্ষে করাচি থেকে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং মাটির টানে জন্মস্থান নড়াইলে ফিরে আসেন।
শিল্পী সুলতান শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। ১৯৭৮ সালের দিকে নিজস্ব উদ্যোগে জন্মস্থান নড়াইলের মাছিমদিয়ায় ফাইন আর্ট স্কুল এবং ১৯৮৭ সালে নড়াইলের কুরিগ্রামে ‘শিশুস্বর্গ’ নামে শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাদের জন্য তৈরি করেন বড় নৌকা। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, এই নৌকায় চড়ে নদীতে শিশুদের নিয়ে ছবি আঁকবেন। তিনি বলতেন, ‘শিশু প্রকৃতিকে চিনবে। তারা প্রকৃতির ছবি আঁকবে।’
যাযাবরের মতো জীবন-যাপন করা এই শিল্পী নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য ছবি আঁকলেও অধিকাংশ ছবি নষ্ট এবং হাতছাড়া হয়ে গেছে। বর্তমানে নড়াইলের সুলতান কমপ্লেক্সে তার আঁকা ২২টি ছবি রয়েছে।
বরেণ্য এই শিল্পী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। এভাবে লাল মিয়া থেকে সুলতান হয়ে তিনি বিশ্ব কাঁপান।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান লাল বাউল।

আরও পড়ুন