সুুন্দরবনে আরো চারটি পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে

আপডেট: 10:03:07 29/09/2018



img
img

মো. শহিদুল ইসলাম, বাগেরহাট : ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনে ইকোট্যুরিস্টদের (প্রতিবেশ পর্যটক) ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে ও ট্যুরিজম আরো বিকশিত করতে নতুন করে আরো চারটি পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
নতুন এই চারটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের আলীবান্ধা ও চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক এবং খুলনার পশ্চিম সুন্দরবন বিভাগের শেখেরটেক ও কৈলাশগঞ্জে। আর এই ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র নির্মাণে বন বিভাগের খরচ হবে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
নতুন এই চারটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র হরিণ ও কুমিরসহ বন্যপ্রাণীর মুক্ত বিচরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি থাকছে ভ্রমণ পিপাসুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সুন্দরবন বিভাগ এতথ্য নিশ্চিত করেছে।
১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো সুন্দরবনের তিনটি পর্যটন এলাকাকে ৭৯৮তম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করার পর থেকে প্রতিবছরই দেশি-বিদেশি ইকোট্যুরিস্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে চলেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে সুন্দরবন দেখতে আসেন দেশি-বিদেশি এক লাখ ৮৩ হাজার ৪৯০ প্রতিবেশ পর্যটক, সেখানে গত অর্থবছরে সুন্দরবনে প্রতিবেশ পর্যটক বা ইকোট্যুরিস্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২১ হাজার ৯৬৯ জনে।
সুন্দরবন বিভাগ জানায়, বৈচিত্র্যের আধারে ঘেরা, নানান প্রজাতির গুল্ম, শৈবাল, হরেক রকম বন্যপ্রাণী ও পাখ-পাখালির আবাসস্থল পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট হচ্ছে সুন্দরবন। এখানে প্রধান উদ্ভিদ সুন্দরীসহ রয়েছে ৩৩৪ প্রজতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড। সুন্দরবনে ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। এরমধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল ও মায়া হরিণ, বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতীসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন, লোনা পানির কুমির, কচ্ছপ ও কিং-কোবরাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ রয়েছে। রয়েছে ৩১৫ প্রজাতির পাখি। সুন্দরবনের এক হাজার ৮৭৪ দশমিক এক বর্গকিলোমিটার জলভাগের নদ-নদীতে রয়েছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা ও এক প্রজাতির লবস্টার। বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের কটকার বাদামতলা সমুদ্রসৈকত থেকে দেখা যায় সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টায় সুন্দরবন ছয় বার তার রূপ বদলায়।
দেশের মোট বনাঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি অংশ জুড়ে আছে সুন্দরবন। বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এসব কারণে সুন্দরবনের প্রতি পর্যটকদের রয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
সুন্দরবনের পূর্ব অভয়ারণ্য কটকা-কচিখালী, নীলকমল দক্ষিণ অভয়ারণ্য ও পশ্চিম অভয়ারণ্যের এক লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর বনকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো ৭৯৮তম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করে। এর পর থেকে সুন্দরবনের করমজল, হারবারিয়া, কটকা, জামতলা, টাইগার পয়েন্ট, বাদামতলা সমুদ্রসৈকত, কচিখালী, দুবলা শুটকীপল্লী, দোবেকী, কলাগাছিয়া, মান্দারবাড়ীয়া, হিরণপয়েন্ট, নীলকমল পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে দেশি-বিদেশি ইকোট্যুরিস্টের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে।
গত অর্থবছরে পর্যটন খাত থেকে সুন্দরবন বিভাগের রাজস্ব আয় হয় প্রায় দুই কোটি টাকা। এই অবস্থায় সুন্দরবনে পর্যটকদের ক্রমবর্ধমান চাপ ও ইকোট্যুরিজমকে আরো বিকশিত করতে নতুন করে আরো চারটি পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন এই চারটি ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র হরিণ ও কুমিরসহ বন্যপ্রাণীর মুক্ত বিচরণ ব্যবস্থার পাশাপাশি থাকছে ইকোট্যুরিস্টদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নদী থেকে ইকোট্যুরিস্টদের এসব পর্যটন কেন্দ্রে উঠতে আধুনিক গ্যাংওয়ে বা জেটি, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক রূপ দেখতে ওয়াচ টাওয়ার, পায়ে হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত উডেন ট্রেইল ও বিশ্রামাগারসহ আধুনিক ওয়াশরুম নির্মাণ করা হবে। এতে করে সুন্দরবনে আসা দেশি-বিদেশি ইকোট্যুরিস্টের সুযোগ-সুবিধা অনেক বাড়বে।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান জানান, সুন্দরবন হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। পৃথিবীর হাতে গোনা মাত্র কয়েটি বন হচ্ছে হেরিটেজ সাইট। সুন্দরবন তার একটি। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের প্রতি মানুষের রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। এই ম্যানগ্রোভ বনকে ১৯৯৭ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করার পর ইকোট্যুরিস্টের সংখ্যা প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। জলবায়ু পরির্বতনের প্রভাব, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে নেমে আসা মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ও মানুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে রয়েছে। এই অবস্থায় বন্যপ্রাণীর আধিক্য থাকা করমজল, হারবারিয়া, কটকা, জামতলা, টাইগার পয়েন্ট, বাদামতলা সমুদ্রসৈকত, কচিখালী, দুবলা শুটকীপল্লী, দোবেকী, কলাগাছিয়া, মান্দারবাড়ীয়া, হিরণপয়েন্ট, নীলকমলের মতো পর্যটন এলাকায় দেশি-বিদেশি ইকোট্যুরিস্টের চাপ বাড়ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণসহ বন্যপ্রাণীর প্রজনন। এই অবস্থায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের অধিকতর সুরক্ষা দিয়ে পরিবেশ-প্রতিবেশ বান্ধব পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজমে গুরুত্ব দিচ্ছে বন বিভাগ।

আরও পড়ুন