সেলিম আল দীনের নাট্যপ্রসঙ্গ

আপডেট: 01:56:27 15/01/2018



img

অনুপম হাসান

বাংলা নাটকে নতুন ধারার প্রবর্তক নাট্যকার সেলিম আল দীন ২০০৮ সালের ১৪ই জানুয়ারি মাত্র ৫৯ বছরে মৃত্যুবরণ করেন। দেখতে দেখতে মাস বছর পেরিয়ে দশম মৃত্যু বার্ষিকী এসে গেল। বিগত দশ বছরে নাট্যকার সেলিম আল দীনকে অলিখিতভাবেই নাট্যাচার্য হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছে। শিল্পী-সাহিত্যিক, নাট্যকার, পণ্ডিত অধ্যাপকবৃন্দও তাঁর নাট্যাচার্য উপাধিকে কটাক্ষ করার মতো ধৃষ্টতা দেখাননি। নাট্যরচনায় প্রথমাবধিই ভিন্ন ধারার অনুসন্ধান সেলিম আল দীনকে আজ এই স্থানে নিয়ে এসেছে। বাংলা নাটকের শেকড়-সন্ধানী নাট্যকার হিসেবেই তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। কথাবাহুল্য, সেলিম আল দীনের আগে কোনো বাঙালি নাট্যকারই বলেননি যে, ইউরোপ থেকে থিয়েটারের ধারণা আসার আগে বাংলা জনপদে নাট্যরীতির প্রচলন ছিল। মধ্যযুগের সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সেলিম আল দীনই প্রথম আবিষ্কার করেন, উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে বেলগাছিয়ার ইউরোপীয় থিয়েটার আসার অনেক আগেই বাঙালির চেতনাজগতে নাট্যোপাদান ছিল এবং সেই উপাদানের সংমিশ্রণে সাহিত্যও আছে। বাঙালি জাতিরসত্তার নাট্যচেতনার শেকড় অনুসন্ধান করতে গিয়েই নাট্যকার, নাট্যগবেষক এবং নাটকের অধ্যাপক সেলিম আল দীন আমৃত্যু বাংলা নাটকের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। মাত্র ঊনষাট বছরের জীবনেই তিনি বাংলা নাটকের নিজস্বতা আবিষ্কার করেন এবং তা ইউরোপীয় নাট্যাঙ্গিকের সঙ্গে মিশিয়ে অভিনব বাংলা নাট্যনিরীক্ষা করেন। প্রচলিত ইউরোপীয় প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের রীতি-পদ্ধতির বাইরে বেরিয়ে সেলিম আল দীন বিশেষ এক ধরনের নাটক রচনায় ব্রতী হন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এসব রচনাকে ‘কথানাট্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর কথানাট্য মূলত আখ্যানধর্মী বা বর্ণনামূলক এক ধরনের রচনা; তবে বর্ণিত ঘটনায় ফল্গুধারার ন্যায় বহমান থাকে নাট্যোপাদান। তাঁর কথানাট্য পরবর্তী সময় নাট্য-পরিচালক এবং নাট্য-নির্দেশকের হাতে পড়ে আধুনিক নাট্যাঙ্গিকে মঞ্চায়িত হয়। এক্ষেত্রে নাট্য-পরিচালকেরও থাকতে হয় সৃজনশীল শৈল্পিক দক্ষতা; অন্যথায় সেলিম আল দীনের নাটকের মঞ্চায়ন যার-তার পক্ষে সম্ভব হয় না। অর্থাৎ সেলিম আল দীনের কথানাট্য মঞ্চায়নে নাট্যপরিচালকের সৃজনশীতা এবং নাট্যসংলাপ নির্মাণের জ্ঞান থাকা আবশ্যক কিংবা বলা যায়, অনিবার্য।
 বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেলিম আল দীনের কথানাট্য মূলত নাসিরউদ্দিন ইউসুফের সৃজনশীল সংলাপ-নির্মাণের অভাবনীয় একক দক্ষতায় মঞ্চস্থ করা সম্ভব হয়েছে। নাসিরউদ্দিন ইউসুফের আগে কোনো নাট্যপরিচালক, নাট্যনির্দেশনের পক্ষে তা করা সম্ভব হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অদ্যাবধিও সেলিম আল দীনের নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা নাসিরউদ্দিন ইউসুফকৃত স্ক্রিপ্ট। সেলিম আল দীনের কোনো কথানাট্য যা, আগে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ করেননি, তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো নাট্যপরিচালক মঞ্চায়ন করেছেন বলেও আমার জানা নেই। এই বিবেচনায় বলা ভুল হবে না,  সেলিম আল দীনকে আধুনিক মঞ্চ-নাট্যকার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর দক্ষ নাট্যব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফের অসামান্য অবদান অনস্বীকার্য। কেননা সেলিম আল দীন ‘কেরামতমঙ্গল’,‘কিত্তনখোলা’,চাকা’,‘হরগজ’, ‘যৈবতীকন্যার মন’, ‘হাতহদাই’, ‘বনপাংশুল’ প্রভৃতি রচনা করলেও জোর দিয়ে এসব রচনাকে নাটক হিসেবে দাবি করেননি। তিনি এসব রচনাকে প্রচলিত কোনো বিশেষ সাহিত্য শাখার অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁর রচনা সাহিত্যের কোন্ শাখার অন্তর্ভুক্ত হবে, তা তিনি পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন— নির্ধারণ করার জন্য।‘বনপাংশুল’-এর ভূমিকা লিখতে গিয়ে সেলিম আল দীন সেখানে স্পষ্টভাবেই তাঁর রচনাটিকে— উপাখ্যান, নাটক, গাথাকাব্য যেকোনো নামেই গ্রহণের স্বাধীনতা পাঠককে দিয়েছেন। তাঁর অভিনব আঙ্গিকের ‘চাকা’ সম্পর্কে সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক জীবদ্দশায় লিখেছেন : ‘সেলিম আল দীন এই কথানাট্যের রচয়িতা, বাংলা নাটকের এক প্রধান পুরুষ; সেলিম অনবরত সন্ধান করে চলেন প্রকাশের নতুনতর মার্গ; নতুন, কিন্তু বাংলা ভাষার সৃষ্টি এবং হাজার বছরের ধারাবাহিকতার অন্তর্গত অবশ্যই।’ এ কথার মধ্য দিয়ে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট যে, সেলিম আল দীন নাটক রচনায় বিশেষ রচনাকৌশল অবলম্বন করেছিলেন। বাংলা নাটকে নবতর প্রকরণ ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি নিজে লিখেছেন :
আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে বাংলা কবিতার চেয়ে নাটকের যে দীনতা, উপন্যাসের চেয়ে নাটকের যে সীমাবদ্ধতা সেটাকে ঘোচাতে হবে। সেটা ঘোচাতে যদি যাই তাহলে আমাকে নতুন ভূমি, নতুন মানুষ, নতুন শিল্প দর্শন আবিষ্কার করতে হবে। এই ভূমি আবিষ্কার করতে গিয়ে আমার কাছে প্রচলিত কাঠামোগুলোকে কঠোরভাবে বর্জন করতে হয়েছে। ফলে আমার লেখা পড়ে হুট করে নাটক মনে হয় না। কিন্তু এটাও তো সত্য যে, মূলত আমি নাটকই লিখতে চেয়েছি।
সেলিম আল দীন নাটকের বিষয়বস্তু গ্রহণ করেছেন বাংলার প্রান্তিক মানুষের [গ্রাস রুট লেবেল] জীবনযাপন, আচার-আচরণ ও সমাজ-সংস্কৃতি থেকে। তাঁর নাটকের বিষয়-উপাদান বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লুৎফর রহমান জানিয়েছেন : ‘অধরা শিল্পের নিত্য পূজায় ধ্যানমগ্ন শিল্পীর চৈতন্যে অনুক্ষণ এক সুর খেলে। অস্তিত্বের বীণা তারে— বাণীর দেবী ঝংকার তোলেন নবরূপে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। মূর্ত-বিমূর্তের জগতে তাঁর সার্বক্ষণিক বিচরণ ভূমি। শিল্পের সৃজন-কর্ম সেজন্যেই সাধন সত্য। প্রকৃত শিল্পী তাঁর নন্দনবিশ্বে মগ্নচিত্ত সাধক। সেলিম আল দীন সাধক শিল্পী-শিল্পের ব্রতচারী। একনিষ্ঠ সাধকের প্রাত্যহিক কৃত্যের অপরিহার্যতার তুল্য তাঁর শিল্প সৃজন কৃত্য।’ সেলিম আল দীন যেমন নাটকের উপস্থাপনায় স্বতন্ত্র, তেমনি তাঁর নাটকের বিষয়-প্রেক্ষাপট ও জীবনচিত্রও প্রচলিত নাট্যধারণা থেকে পৃথক। তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণের দ্বারা বাংলা জনপদের সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভিন্ন ভিন্ন নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সামাজিক-পারিবারিক জীবনচিত্র নাট্যঘটনায় তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন। তাঁর নাট্যচেতনার উৎস বাঙালি সমাজ ও বাংলার প্রাচীন জনপদের প্রান্তিক মানুষজন। তিনি বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন এসব কথানাট্য রচনার মাধ্যমে।
বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যে সেলিম আল দীন নাটকের বিষয়-প্রেক্ষাপট নির্বাচনে যেমন নতুনত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি নাট্যঘটনা উপস্থাপনেও অভিনব রীতি-পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। সেলিম আল দীনের নাটকে সাধারণত থাকে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি এবং বাংলার গ্রামীণ জনপদের মানুষ, তাদের সামাজিক-সংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের আবহমান চিত্র। সংক্ষেপে বলা যায়, গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সেলিম আল দীন মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটে নাগরিক সুধীজনের সামনে আলোক সজ্জিত আধুনিক রঙ্গমঞ্চে উপস্থাপন করেন এবং জানিয়ে দেন— বাংলার বিবিধ শ্রেণী-পেশার সাধারণ সুখ-দুঃখের সাতকাহন। তিনি একান্ত নিষ্ঠায় প্রান্তিক জনমানুষের নিত্যকার জীবনকথা  শিল্পিত দক্ষতায় কথানাট্যে তুলে ধরেছেন। বাংলা নাটকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সেলিম আল দীন স্বীয় স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় যেমন দিয়েছেন, তেমনি বাংলা নাট্যসাহিত্যকেও সমৃদ্ধ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, মধ্যযুগের সাহিত্যে নাট্যোপাদান বিষয়ক পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা করতে গিয়ে মূলত বাঙালির গ্রামীণ জনপদের লোকসমাজ ও সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হন। তিনি এ সময় বাংলার প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন। প্রসঙ্গত একথাও উল্লেখ্য যে, উপকূলীয় অঞ্চল ফেনী জেলার সেনেরখিল হচ্ছে সেলিম আল দীনের জন্মস্থান। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে উপকূল ঘেঁষা জনমানুষের সঙ্গে। ফলে তাঁর জীবনে বাংলা জনপদের উপকূলীয় প্রান্তিক মানুষের সমাজ সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে তিনি উপলব্ধি করেন গ্রামীণ মানুষের জীবনাচরণে রয়েছে প্রচুর নাটকীয় উপাদান। তিনি বাঙালি জাতির এই নিজস্ব নাট্যোপাদান আবিষ্কার করে তা সম্পূর্ণ এক নতুন কৌশলে রঙ্গমঞ্চে উপস্থাপন করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলা নাটকের যে বিকাশ-বিবর্তন ও সমৃদ্ধি ঘটেছে, সেই ইতিহাসে এককভাবে সেলিম আল দীন সেই সমৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার ও নাট্যব্যক্তিত্ব। তাঁর স্বতন্ত্র নাট্যনির্মাণের রীতি বিবেচনায় নিয়ে, তাঁকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নাট্যপুরুষ আখ্যায়িত করলেও অত্যুক্তি হয় না। সমকালীন নাট্যসাহিত্যে তাঁর পাণ্ডিত্য সুগভীর, জীবনবোধ, নাট্যনির্মাণ রীতির সচেতনতা এবং নাট্যনিরীক্ষায় তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। তিনি বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ভিতর বাংলা নাটকের শেকড় সন্ধান করে আবিষ্কার করেছেন— বাঙালির নিজস্ব নাট্যরীতি। নাটক রচনার শুরু থেকেই তিনি পাশ্চাত্য নাট্যাঙ্গিক ত্যাগ করতে চেয়েছেন। তবে তাঁর প্রথম দিকের রচনায় পাশ্চাত্যের প্রভাব তিনি পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারেননি; কিন্তু নিরন্তর পাশ্চাত্য নাট্যরীতি অতিক্রমের প্রয়াস অব্যাহত থাকায় ঠিকই তিনি বাঙালির নিজস্ব গল্পগাথা এবং যাপিত জীবনের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন নাট্যোপাদান। তাঁর এই নাট্যানুসন্ধানের ফসল ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’ ‘হরগজ’, ‘হাতহদাই’, ‘চাকা’, ‘যৈবতীকন্যার মন’ প্রভৃতি। নাট্যরীতি বিষয়ক তাঁর সচেতনতা সম্বন্ধে জানাতে গিয়ে সাজেদুল আউয়াল মন্তব্য করেন :
এ যাবৎ কাল ধরে আমরা যে ইউরোপীয় একক নন্দন ভাবনার আওতায় ছিলাম, তিনি তার মধ্যে নিজেকে বিলীন করেন নি, তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা ও যৌথ অবচেতনার জগৎকে বিনির্মাণ করে চলেছেন তাঁর কাজে, তাঁর পাঠকৃতিতে। এবং এই সূত্রে তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শুধু পুনঃনির্মাণই করছেন না, তাকে উন্নীতও করেছেন। তাঁর কাজে যে স্ট্রাকচারাল এপিকের লক্ষণ দৃষ্ট হয়, তা তাঁকে আজ ভিন্ন বাচনে তুলে ধরতে বাধ্য করে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেলিম আল দীন বাংলা অঞ্চলের মানুষ ও তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতির বিনির্মাণ করেছেন এবং শিল্পীর সৃজনপ্রতিভায় বাংলার গ্রামীণ জনপদের তথা ভূমি-সংলগ্ন সাধারণ মানুষের জীবনকথা নাট্যঘটনায় তুলে ধরেতে চেয়েছেন। প্রাচীন বাংলা জনপদের তথা গ্রামীণ মানুষের জীবনচিত্র তিনি মহাকাব্যিক বিশালতায় নাটকে ব্যক্ত করেছেন। নাটকে তিনি বাঙালি জাতিকে তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন; অধিকন্তু তিনি প্রাচ্যের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিও যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন নাট্যকার সেলিম আল দীন। তবে নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বাস করতেন বাঙালি জীবন এবং সামাজিক রীতিনীতি এবং সংস্কৃতির মধ্যেই নাট্যোপাদান রয়েছে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে সেকথা স্পষ্ট জানিয়েছেন :
আমাদের নাগরিক জীবনের অনুষঙ্গ তো পাশ্চাত্যের অপঘাতের আলো। এটাকে অবলম্বন করে যদি শিল্পচর্চা করি তাহলে সেটা নিশ্চিতভাবেই ভুল দিকে ধাবিত হবে। কারণ, ইউরোপে রিয়েলিজম-কিউবিজম ছাড়া আর কোনো আন্দোলন পজিটিভ কিছুর জন্ম দেয়নি। এক্সপ্রেশিনিজম, ইম্প্রেশানিজম, দাদাইজম—ক্ষয়িষ্ণু সমাজ থেকে উঠে আসা এইসব শিল্পতত্ত্ব আমাদেরকে যেন গ্রাস না করে।
নিজের বিশ্বাসকে সেলিম আল দীন স্বীয় মেধামননের মাধ্যমে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন এবং ইউরোপীয় নাট্যরীতি থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ বাঙালি ধারার নাটক রচনা করতে সমর্থ হয়েছেন। আজীবন তিনি বাংলা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধান করেছেন এবং নাট্যোপাদান সংগ্রহ করেছেন। ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর সঙ্গে সেলিম আল দীন-এর যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তাও তাদের নাট্যচেতনাকে কেন্দ্র করেই। কারণ ‘ঢাকা থিয়েটার’ খুঁজে বেড়ায় বাংলা ও বাঙালির শেকড়ের শিল্পচেতনা। নাট্যসংগঠন ‘ঢাকা থিয়েটার’ বিশ্বাস করে :
বাংলাদেশ একটি সংগ্রাম ক্ষুব্ধ অকুতোভয় জনপদের নাম। যুদ্ধ ঝড় জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে এই জনপদ সমুন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রজ্জ্বলিত করেছে তার সামুদ্রিক দুই চোখে। এই দেশ, তার ইতিহাস, সংগ্রাম, সংস্কৃতি, সবকিছুকে আমরা সম্মান করি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, আত্রাই, ধরলার কূলে কূলে নামহীন গোত্রহীন মানুষের সংগ্রামী জীবন আমাদের নাটকের  বিষয়বস্তু।
সেলিম আল দীনের নাটকসমূহ ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর এই নাট্যনীতির সমার্থক। মনে হয়, তিনি যেন এই নাট্যসংগঠনের ভাবনাকে তুলে ধরতেই নাট্য রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর নাট্যনীতি অনুসরণেই সেলিম আল দীন ‘হরগজ’ কথানাট্যে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত এক গ্রামীণ জনপদের লণ্ডভণ্ড চিত্র অঙ্কন করেন। ‘কিত্তনখোলা’-য় বহেমিয়ান বেদেগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের প্রাত্যহিকতার গল্প তুলে ধরেন শহুরে নাগরিক মানুষের সামনে। ‘কেরামতমঙ্গল’-এ গ্রামের সহজ-সরল মানুষের বিবিধ জটজটিলতা, সমস্যা-সংকট-বিশ্বাস, এবং সেসব থেকে উত্তরণ প্রয়াসী মহাকাব্যিক কেরামতকে উপস্থাপন করেন। ‘চাকা’য় এক বেওয়ারিশ লাশের গ্রাম থেকে গ্রামে ভ্রমণ এবং গাড়োয়ানদের মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ সম্পর্কিত অসাধারণ এক হৃদয় ছোঁয়া কাহিনি বিদ্যমান।
 বাঙালির নিজস্ব জীবনচেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তথা গ্রামীণ মানুষের জীবন ও সমাজবাস্তবতা তুলে ধরার পক্ষপাতী ছিলেন নাট্যকার সেলিম আল দীন। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাঁর নাট্যপ্রতিভার মূল ঝোঁক ছিল বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক জীবন, জীবনের কথা ও সংগ্রাম এ দেশীয় আবহে পরিবেশন করার দিকে। ফলে তাঁর দ্বিতীয় পর্বের নাটকগুলো স্পষ্টভাবে বাঙালি জীবন সংস্কৃতির স্বাদ-গন্ধ, পরিবেশনা পদ্ধতি প্রভৃতি স্তরে বাঙালিয়ানার শতভাগ ছাপ লক্ষণীয়।  
[বাংলা ট্রিবিউন থেকে]