স্কুলড্রেসহীন ছেলেটি প্রভাব ফেলে ডিসির চিন্তাজগতে

আপডেট: 05:26:41 08/10/2016



img

নূর ইসলাম : ঝিকরগাছা উপজেলার একটি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন যশোরের জেলা প্রশাসক। স্কুলের শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গে ছবি তুলতে চাইলে তিনি সানন্দে রাজি হন। ছবি তোলার এক পর্যায়ে তিনি লক্ষ্য করেন, চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ছবি তুলতে আসছে না, দূর থেকে দেখছে। জেলা প্রশাসক ওই শিক্ষার্থীর কাছে গিয়ে বলেন, 'তুমিও এসো, আমরা একসঙ্গে ছবি তুলি।' জবাবে সে বলে, 'আমার তো স্কুল ড্রেস নেই।'
দেশসেরা জেলা প্রশাসকের স্বীকৃতি লাভের পর সম্প্রতি যশোরের ডিসি ড. মো. হুমায়ুন কবীর তাকে দেওয়া সংবর্ধনার জবাবে বক্তৃতাকালে সংবাদকর্মীদের এ কাহিনি বলছিলেন প্রেসক্লাব যশোরে। জানান, এই ঘটনা তার চিন্তাজগতে কীভাবে পরিবর্তন এনেছিল। এবং তার ফল কী হয়েছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ওই ছেলেটির কথায় বেদনার্ত হয়ে ওঠেন নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ড. কবীর। তিনি ছেলেটির বিষয়ে স্কুলের শিক্ষকদের কাছে জানতে চান। শিক্ষকরা জানান, ছেলেটি মেধাবী। বাবা থেকেও নেই। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে খাবার জোগাড় করেন। ছেলেকে স্কুল ড্রেস বানিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই।
যশোরের কার্যালয়ে ফিরে জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এমন সব শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করতে, যারা আর্থিক দৈন্যের কারণে স্কুল ড্রেস পরতে পারছে না। পাশাপাশি তিনি যশোরের দানশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে থাকেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া বাবদ পাওয়া সম্মানীর টাকা নিজে খরচ না করে তাও জমাতে থাকেন জেলা প্রশাসক। কয়েক দিনের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া পান তিনি। স্থানীয় দানশীল অনেক ব্যক্তি তাদের নাম প্রচার না করেই জেলা প্রশাসকের এই কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। গরিব শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি হওয়ার পরের ছয় মাসে জেলার ১৫৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে দুই হাজার সেট স্কুল ড্রেস বিতরণ করতে সক্ষম হন জেলা প্রশাসক। এ  প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে বলে জানান ড. কবীর।
শুধু গরিব শিক্ষার্থীদের স্কুলড্রেস সরবরাহ করেই ক্ষ্যান্ত হননি জেলা প্রশাসক। শিক্ষা বিস্তার, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বহুবিধ কর্মকর্তা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। যশোরের জেলা প্রশাসকই প্রথম চিন্তা করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মাল্টিমিডিয়া সামগ্রী প্রদান করার। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যেকোনো বিষয় খুব সহজে শিখতে ও মনে রাখতে পারবে। তার এ চিন্তা বাস্তবায়ন করতে তিনি একইভাবে দানশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেন। সাড়াও মেলে। যার ফলে গত জুন মাস পর্যন্ত জেলার ১৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, স্ক্রিন ও ল্যাপটপ বিতরণ করতে পেরেছেন।
শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে মিড ডে মিল চালু করার উদ্যোগ নিয়েছেন জেলা প্রশাসক। এটিও যথারীতি সরকারি সহায়তা ছাড়াই স্কুলের নিজস্ব আয় ও স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের অনুদানেই পরিচালিত হবে। ইতিমধ্যে জেলার নয়টি স্কুলে মিড ডে মিল চালু করা হয়েছে।
উন্নত দেশগুলোর অনুকরণে ড. কবীর বাংলাদেশে প্রথম যশোরের তিনটি স্কুলে ‘স্টুডেন্ট অব দ্য মান্থ’ এবং ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচনের প্রথা চালু করেছেন। শৃঙ্খলাবোধ, নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতি, সহপাঠীদের সঙ্গে আচরণ, পড়াশোনায় মনোযোগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পাঠ্যবইবহির্ভূত অতিরিক্ত যোগ্যতা- এসব বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যেক শ্রেণিতে একজনকে স্টুডেন্ট অব দ্য মান্থ নির্বাচন করা হয়। তাদের দেওয়া হয় সার্টিফিকেট ও ব্যাজ। বিশেষ ওই ব্যাজটি পুরো এক মাস ওই শিক্ষার্থী তার ড্রেসে লাগিয়ে রাখে। এভাবে নির্ধারণ করা হয় ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’। গত বছর যশোর জিলা স্কুল, সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কালেক্টরেট স্কুলের অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত ১৮ জন শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোর ছয় শিক্ষককে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত খরচে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পাঠাচ্ছেন জেলা প্রশাসক। সেখানে তিন দিনের সফরে এসব শিক্ষক ও শিক্ষার্থী পশ্চিমবঙ্গের দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিজ্ঞতাবিনিময় করবে ও সেখানকার ঐতিহাসিক কিছু স্থান ঘুরে দেখবে। এসবের খরচও জেলা প্রশাসক তার নিজ উদ্যোগেই সংগ্রহ করছেন।
তিনি বলছেন, ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি স্কুলের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। বিষয়টি চূড়ান্ত হলেই শিগগির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই দলটি ভারত সফরে যাবে।
যশোরের জেলা প্রশাসক ড. মো. হুমায়ুন কবীরই দেশে প্রথমবারের মতো জেলার তিনটি স্কুলে অনলাইন স্কুল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করেন। একটি বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত এই সিস্টেমে শিক্ষার্থীদের ফলাফলসহ তাদের উপস্থিতি ও অন্য বিষয় সরাসরি তাদের অভিভাবকদের কাছে চলে যায়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসককে চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসকের উদ্যোগকে অনুসরণ করাতে বলা হয়।
ড. কবীর জানান, অনেক জেলা প্রশাসক অনলাইন স্কুল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করতে যশোরে যোগাযোগ করেছেন। তাদের সবরকম সহযোগিতা করা হয়েছে এবং সফটওয়্যারটিও দেওয়া হয়েছে।
অভাবের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হতে চলেছে, লেখাপড়ার খরচ যোগাতে না পেরে বাবা-মা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসা এমন সব সংবাদে চোখ রাখেন জেলা প্রশাসক। উদ্যোগ নেন সংশ্লিষ্টদের সমস্যা সমাধানের।
মেডিকেল কলেজের ছয়জন শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার সব খরচ তিনি নিজে বহন করছেন। এরমধ্যে দুই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের পুরোটা সময়ের সব খরচ তিনি বহন করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এককালীন সহায়তা দিয়েছেন কতজন শিক্ষার্থীকে, তার কোনো হিসেব নেই জেলা প্রশাসকের কাছে।
সরকারি ছুটির দিন ছাড়াও কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই ড. কবীর প্রায়ই তিনি ছুটে যান বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ছাত্রদের ক্লাস নেন অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে আসা এই সরকারি কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্ট শ্রেণির নির্ধারিত বিষয় ছাড়াও তিনি সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানদান করেন।
নিজের বাল্যজীবনের কাহিনি স্মরণ করে তিনি ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন। যেখানে যে অবস্থায় থাকেন না কেন, যতদিন সম্ভব এ ধরনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন ড. কবীর।

আরও পড়ুন