স্টিয়ারিং হাতে লোহাগড়ার সংগ্রামী নারী মিলিয়া

আপডেট: 03:47:14 05/06/2018



img

ফয়সাল আতিক : বাংলাদেশে পেশাদার নারী গাড়ি চালকের সংখ্যা যেখানে হাতে গোনা, সেখানে নিজের দক্ষতা-যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নড়াইলের মেয়ে মিলিয়া খানম হয়ে উঠেছেন দৃষ্টান্ত।
আট বছর ধরে এ পেশায় জড়িত মিলিয়া এখন থিতু হয়েছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (ডিএনসিআরপি) গাড়িচালক হিসাবে।
ডিএনসিআরপির ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তারা যে ডাবল কেবিন পিকআপ নিয়ে প্রতিদিন অভিযানে যান, তার চালকের আসনে থাকেন মিলিয়া।
গত মে মাসে ৭৫ জন প্রতিযোগীকে ডিঙিয়ে ডিএনসিআরপির ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে গাড়িচালক হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পর অল্প দিনেই কাজের দক্ষতা দিয়ে ঊর্ধ্বতনদের নজর কেড়েছেন এই সংগ্রামী নারী। আগামীতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গেলে তাকে এসইউভি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে কর্মকর্তারা আশ্বাস দিয়েছেন।
ডিএনসিআরপির উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, “গত ২০ দিনে চালক হিসাবে অধিদপ্তরে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন মিলিয়া। তার গাড়ি চালনার হাত খুবই ভালো। তাছাড়া ছোটখাটো যান্ত্রিক সমস্যার সমাধান নিজেই করতে পারে।”
তবে বাংলাদেশে নারীদের জন্য পেশা হিসাবে গাড়িচালনা বেছে নেওয়া খুব সহজ নয়। মিলিয়ার ভাষায়, নারী চালকদের চাকরি পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সাধারণ মানুষ চালকের আসনে নারীদের দেখলে ‘অন্য চোখে’ তাকায়।
“আমি অনেক জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছি। পরীক্ষায় ভালো করলেও কেউ নারীদের চালকের চাকরি দিতে আগ্রহী হয় না।... মাঝে একবার ব্যক্তিগত গাড়ির চালক হিসাবে চাকরি পেয়েছিলাম, বেশিদিন টেকেনি। এখন সরকারি অফিসে চাকরি হয়েছে; নিজের ভেতর অনেক আনন্দ লাগছে।”
চাকরি নিয়ে ঢাকায় আসার আগে দেশের উত্তরাঞ্চলে বেসরকারি সংস্থা কেয়ারের গাড়িচালক হিসাবে প্রায় আট বছর কাজ করেছেন মিলিয়া।
২০১০ সালে গাড়িচালক হিসেবে পেশার শুরুতে তার মাসিক বেতন ছিল ১৩ হাজার টাকা। আট বছরের অভিজ্ঞতা হতে হতে তিনি মাসে ৩৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন। কিন্তু কেয়ারের সেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন চাকরির খোঁজে নামতে হয় মিলিয়াকে।
অবশ্য শেষ পর্যন্ত যোগ্যতার প্রমাণ রেখেই স্টিয়ারিংয়ের পেছনে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি।  

মিলিয়ারা কোথায়
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে ১৭ লাখ লাইসেন্সধারী চালকের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ২২৫ জন।
তাদের মধ্যে অপেশাদার লাইসেন্স রয়েছে ২৩ হাজার ৫২২ জন নারীর। আর পেশাদার নারী চালক হিসেবে লাইসেন্স নিয়েছেন মাত্র ৭০৩ জন।
পেশাদার চালকের লাইসেন্সধারী নারীদের মধ্যে ভারি গাড়ি চালনার অনুমতি রয়েছে ১৪ জনের। আর ১৮ জন মাঝারি মানের গাড়ি, ৬১৩ জন হালকা গাড়ি এবং ৫৮ জন দুই চাকার বাহন চালানোর লাইসেন্স নিয়েছেন।
বাংলাদেশে সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ গতবছর দশ নারী চালক নিয়োগ দেয়। সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, নারী চালকদের হাতে গাড়ি অনেক বেশি নিরাপদ থাকে। 
ডিএনসিআরপির উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, “মিলিয়ার মতো অন্য মেয়েদেরও এই পেশায়  সুযোগ করে দেওয়া উচিত। এসব ক্ষেত্রে মেয়েরা এগিয়ে এলে সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন আসবে।”

মিলিয়ার সংগ্রাম
পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম মিলিয়া খানমকে বহু আগেই কেয়ার বাংলাদেশে গাড়িচালকের চাকরি নিয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল। তার ছোট ভাই এখন পড়ছেন খুলনা বিএল কলেজে। বোনদেরও বিয়ে হয়ে গেছে।
নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মেয়ে মিলিয়া জানান, অভাবের কারণে স্কুল থেকে ঝরে পড়তে হয়েছিল তাকে। পরে কেয়ারে গাড়িচালকের চাকরি করতে করতেই ২০০৫ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। একইভাবে ২০১৩ সালে পার হন এইচএসসির গণ্ডি।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে গাড়ি চালনার পরীক্ষা দিয়ে ৭৫ জনের মধ্যে যে সাতজনের চাকরি হয়েছে, তাদের মধ্যে মিলিয়াই একমাত্র নারী। গত ২০ মে তারা কাজে যোগ দিয়েছেন।

গাড়িচালনাকে কেন পেশা হিসেবে বেছে নিলেন মিলিয়া?
তিনি বলেন, ২০০৩ সালের দিকে তার গ্রামের একটি মেয়ে কেয়ার থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেখানেই চাকরিতে যোগ দেন। তারই পরামর্শে ২০০৮ সালের মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গাড়িচালনার প্রশিক্ষণ নেন মিলিয়া।
তবে চাকরি জোটাতে প্রায় দুই বছর ঘুরতে হয়েছে তাকে। পরে কেয়ারের একটি প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে তিনি যুক্ত হন। ২০১০ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ১৭ মে পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কেয়ারের গাড়ি চালান মিলিয়া। শুরুতে মাইক্রোবাস চালালেও পরে এসইউভি চালানোর অভিজ্ঞতা হয় তার।
মিলিয়া বলেন, দক্ষতা ও যোগ্যতা থাকার পরও গাড়ি চালকের পেশায় মেয়েদের অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়। কেউ চাকরি পেলেও টিকে থাকতে হয় অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে।
“চাকরির জন্য অনেক জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছি। কিন্তু মেয়ে বলে অনেকেই চাকরি দিতে চায় না।… ভোক্তা অধিকারে চাকরি পাওয়ার আগে অনেক জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে কেউই চাকরি দিতে আগ্রহ দেখায় না।”
এখন সরকারি একটি অফিসে চাকরি হওয়ায় একটু স্বস্তির জীবনের স্বপ্ন দেখছেন সংগ্রামী এই নারী।
সূত্র : বিডিনিউজ