স্বপ্ন পূরণের শেষ ধাপ দেখে যেতে পারলেন না সমীর

আপডেট: 06:24:26 02/01/2018



img
img

মাগুরা প্রতিনিধি : মাগুরা-যশোর মহাসড়কের শিমুলিয়া এলাকায় গত শুক্রবার (২৯ ডিসেম্বর) রাতে সংঘটিত এক সড়ক দুর্ঘটনায় এক গরিব বাবার মৃত্যু শুধু যে ওই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবককে কেড়ে নিয়েছে তাই না, মাগুরা সদর উপজেলার জাগলা গ্রামের ওই পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নেরও অপমৃত্যু ঘটিয়েছে।
অথচ আর দুটি দিন বেঁচে গেলেই তিনি তার মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া রিমি সাহার বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার (৩১ ডিসেম্বর রোববার প্রকাশিত) ফলাফলে সারাদেশের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করার খবরটিও জানতে পারতেন। সহকারী জজ হিসেবে নিজ সন্তানের কর্মজীবনও হয়তোবা নিজ চোখে দেখে যেতে পারতেন।
মাগুরা সদর উপজেলার জাগলা গ্রামের বলরাম সাহার ছেলে সমীর সাহা যে শুধু তার মেয়েটিকেই শিক্ষিত করে তুলেছেন তাই নয়, তার বিশেষ প্রচেষ্টায় অন্য দুই মেধাবী সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান সৌরভ সাহা রংপুর মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র; ছোট ছেলে শুভ্রদেব সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সফওয়্যার ইনজিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে শ্যালো-ইনজিনচালিত ‘গ্রামবাংলা অটো-ভ্যানের’ সঙ্গে যশোরমুখী একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে গ্রামবাংলা অটো-ভ্যানের আরো ১৯ যাত্রী আহত হয়ে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান মাগুরা শহরের ভায়না বাজারের পান ব্যবসায়ী মাগুরা সদর উপজেলার জাগলা গ্রামের গরিব কিন্তু স্বপ্নদর্শী বাবা সমীর সাহা।
নিজে অর্থাভাবে লেখাপড়া না করতে পারলেও সন্তানদের প্রত্যেককে সুশিক্ষিত দেখার স্বপ্নে বিভোর সমীর সাহা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন এ লক্ষ্যকে বুকে ধারণ করে। সন্তানদেরকে সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সমীর মাগুরা শহরের ভায়না কাচাবাজারে পানের ব্যবসা করে খেয়ে না খেয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। স্বপ্ন একটাই- যেভাবেই হোক তিনটি সন্তানের প্রত্যেককে লেখাপড়া শিখিয়ে অনেক দূর পৌঁছে দেবেন তিনি। তার সন্তানরা যেন তাদের শিক্ষিত হয়ে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে, এটাই ছিল তার আজীবন লালিত প্রত্যাশা।
বাবার স্বপ্ন পূরণে সন্তানরা ছিলেন সমানভাবে আন্তরিক। তাই শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে প্রতিটি স্তরে মেধার স্বাক্ষর রেখে তিন সন্তানের প্রত্যেকেই পৌঁছে গেছেন সমীর সাহার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের অনেকটাই কাছাকাছি। সন্তানদের এতোটা সাফল্যের পেছনে যার অবদান সেই বাবার এমন অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার সন্তানরা।
সহকারী জজের পরীক্ষায় সরাদেশের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম হওয়া রিমি সাহা বলেন, ‘আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমাদের তিন ভাইবোনের প্রত্যেককে প্রতিষ্ঠিত দেখে যাওয়া। সে লক্ষ্যেই বাবা ছোট্ট ব্যবসা করে দিনরাত শ্রম দিয়ে আমাদের লেখাপড়ার খরচ যুগিয়েছেন। আমরা তিন ভাইবোনের প্রত্যেকেই বাবার স্বপ্ন পূরণে সবসময় সচেষ্ট থেকেছি। কিন্তু যখন আমাদেরকে ঘিরে বাবার সব স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবার পথে, তেমন একটা সময় তার চলে যাওয়া আমাদেরকে স্থবির করে দিয়েছে। এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারব কি না জানি না।’
একই ধরনের অনুভূতি ব্যক্ত করে সমীর সাহার ছেলে রংপুর মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সৌরভ সাহা বললেন, ‘বাবা নিজেও একজন মেধাবী মানুষ ছিলেন। অর্থাভাবে তিনি এসএসসির ফরম পূরণ করতে না পারায় লেখাপড়া এগিয়ে নিতে পারেননি। যে কারণে স্বপ্ন ছিল তিনি তার সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করবেন। তার সে স্বপ্ন পূরণের জন্য তিনি কত কষ্টই না করেছেন! শত কষ্টের পর তার সে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে। কিন্তু তিনি তার স্বপ্ন পূরণে সফলতা দেখে যেতে পারলেন না। সামনে সুখের সময় তিনিই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সৃষ্টিকর্তা কেন আমাদের এমন শাস্তি দিলেন? সুখের সময় বাবা থাকবেন না এটা ভাবা যায় না। যে বাবা আমাদের জন্য জীবন দিলেন, সেই বাবাকে সুখের মুখ দেখাতে না পারার এ যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে।’

আরও পড়ুন