সড়কে হত্যার ক্ষতিপূরণ কত

আপডেট: 02:53:59 25/03/2019



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : জেব্রা ক্রসিং বা সেফজোনে নিহত হওয়া আবরারের মৃত্যু হত্যার শামিল। কিন্তু এটা আদালতে প্রমাণ করাই মূল চ্যালেঞ্জ।
রাস্তার মাপ এবং সুপ্রভাত বাসের মাপ কী ছিল, দুর্ঘটনা মুহূর্তের গতি কী ছিল, বাসটি অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ছিল কি না, সেটি ওভারটেক করছিল কি না, ওভারটেকের সঙ্গে ওই স্থানের রাস্তার মাপও গুরুত্বপূর্ণ। সিগন্যাল বিকল থাকলে ট্রাফিকের হাতের সংকেত কী ছিল? ঢাকায় প্রতি ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিসীমা দেখা যায়। এটা খুবই কম। ফৌজদারি আইনের আওতায় আনতে গেলে অভিপ্রায় ও অবহেলা—দুটোই দেখাতে হবে। চালকের অভিপ্রায় বা ইনটেনশন প্রমাণ করা গেলে সাজার ধরন পাল্টাবে।
গাড়ি চালনায় চালকের অবহেলা নাকি অভিপ্রায়, কোনটি বেশি সক্রিয় ছিল? যদি ‘অভিপ্রায়’ দেখানো যায়, তাহলে বেশি সাজার দিকে যাওয়া যাবে। অভিপ্রায়ের মধ্যে হত্যার উপাদান দেখানোর অর্থ আবার এই নয় যে এটা দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার আওতায় বিচার্য হবে। ৩০২ ধারায় সুপ্রভাতের চালক পড়বেন না। চালকের সঙ্গে আবরারের চেনাজানা ছিল না। তাই এটা চলে যেতে পারে দণ্ডবিধির ৩০৪, ৩০৪ক বা ৩০৪খ ধারায়। ৩০৪ ধারাটি বলেছে, ইনটেনশন প্রমাণ করা গেলে চালকের সাজা অনধিক যাবজ্জীবন। গাড়ি চালিয়ে নেওয়ার কারণে আবরারের মৃত্যু অবধারিত, এই অভিপ্রায় (ইনটেনশন) চালকের ছিল, এটা প্রমাণ করতে পারলে যাবজ্জীবন। আর এর থেকে কম প্রমাণ করা আরো সহজ। সেটা হলো চালকের জানা (নলেজ) ছিল যে তার র্যা শ (হঠকারী) ড্রাইভিংয়ের কারণে পথচারীদের মৃত্যুঝুঁকি ছিল। তাহলে তার এই সাজা হবে অনধিক দশ বছর। এখন এর মধ্যে কোন অবস্থাটি সুপ্রভাতের চালকের জন্য প্রযোজ্য, সেটাই তদন্তে বেরিয়ে আসার কথা। অভিযোগপত্র তৈরির ওপর বহুলাংশে চালকের সাজার বিষয়টি নির্ভর করে। একই পরিস্থিতি একটু ভিন্নভাবে চিত্রিত করতে পারলেই সাজার হারে বিরাট পরিবর্তন ঘটে যাবে।
সুপ্রভাতের চালকের যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি হয়, সে জন্য পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যগুলো হাজির করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই তার গাড়ির গতিসীমাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তপর্যায়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সুযোগ আছে। মিশুক মুনীর-তারেক মাসুদের মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা যথেষ্ট দক্ষতার ছাপ রেখেছিলেন বলেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
৩০৪ক ধারায়, মানে র্যালশ বা হঠকারী গাড়ি চালানোর বিষয়টি প্রমাণ করতে পারলে অনধিক পাঁচ বছর জেল। তবে দণ্ডবিধির ৩০৪খ ধারাটিতে কিন্তু র্যা শ বা হঠকারী গাড়ি চালনার কারণে নরহত্যার শাস্তি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে। আর এটা বিস্ময়কর যে ১৯৮৫ সালের পরে সংসদ আর এই বিধানে পরিবর্তন আনতে পারেনি। ১৯৮৫ সালের আগে অবহেলায় গাড়ি চালনায় কারো মৃত্যু ঘটলে সাজা ছিল সাত বছর। সেটা ১৯৮৫ সালে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছিল, সেটা নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পাঁচ বছর জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধানে উন্নীত হয়েছে মাত্র। তবে কোন ক্ষেত্রে তিন বছর, কোন ক্ষেত্রে পাঁচ বছর, সে বিষয়ে আইনে অস্পষ্টতা রাখা হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। নতুন সড়ক পরিবহন আইন যেটি বহুলাংশে মালিকবান্ধব, এরপরও যা আছে তাকেও অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন মন্ত্রী নিয়ে গঠিত কমিটি বৈঠকেই বসছে না। যারা মনে করেন ছাত্রআন্দোলনের কারণে সরকার তিন বছরের সাজা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করেছে, সেখানে রয়েছে বড় এক বিভ্রম। কারণ, নতুন আইনের ৯৮ ধারায় ফাঁক আছে। দণ্ডবিধির ৩০৪খ-এর আওতায় চালকের অবহেলায় কারো নিহত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে চালকের তিন বছর জেল হবেই। কিন্তু চালকদের জন্য সাজা বাড়ানোর নামে নতুন আইনে একটি বিশেষ দায়মুক্তি বা রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছে। সাজা তিন বছর থেকে পাঁচ বছরে উন্নীত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গাড়িচাপা দিয়ে কোনো চালক কাউকে মেরে বা চিরতরে পঙ্গু করে দিলে তাকে জেলে যেতেই হবে, তা নয়। আদালত চাইলে তাকে শুধু পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করেই ছেড়ে দিতে পারেন। চাইলে উভয় দণ্ডও দিতে পারেন।
পরিবহন আইনের ৯৮ ধারা এক বিরাট ফাঁদ। সেখানে চালকদের স্বার্থে নতুন করে অপরাধের সংজ্ঞা তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যদি নির্ধারিত গতিসীমার অতিরিক্ত গতিতে বা বেপরোয়াভাবে বা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালনার ফলে কোনো দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধিত হয়, তাহলে অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দিতে পারবেন। তার মানে আবরারের মামলায় ভবিষ্যতের কোনো শুনানির দিনে ঘাতক চালকের পক্ষে কোনো আইনজীবী এই ধারার আওতায় শাস্তি চাইতে পারেন। আমাদের হয়তো আবরারের পরিবারকে তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা শুনতে হতে পারে। যদিও হাইকোর্ট সাত দিনের মধ্যে আবরারের পরিবারকে দশ লাখ টাকা পরিশোধ করতে বাসমালিক প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং কেনো পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, সেই মর্মে রুল জারি করেছে।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অভিপ্রায় প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে মিশুক-মুনীরদের মামলায়। সে কারণে চালক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের অনুকূল বলা যাবে না। কারণ, সরকার গত বছর একটা আইন পাস করেছে বটে, কিন্তু তার বাস্তবায়নে তাকে বিশ্বস্ত থাকতে দেখা যায়নি। অথচ আরেকটি বিষয়, সড়ক পরিবহন আইনে জেল ও জরিমানার ছড়াছড়ি। ছাড়পত্র, ফিটনেসের মতো ক্ষেত্রে অনিয়মে তিন মাস জেল দেওয়ার বিরাট সুযোগ আছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম প্রতিদিন লাশের সংখ্যা ছাপে। জেলদণ্ডভোগীদের কোনো খবর ছাপানোর সুযোগ হয় না।
সংবাদ-এর বার্তা সম্পাদক নিহত হওয়ার মামলায় তার ক্ষতিপূরণ আদায়ে দ্বিতীয় প্রজন্ম লড়ছে। মিশুক মুনীর ও তারেকের পরিবারকে সাড়ে চার কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু এখন শুনলাম, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। তার মানে দাঁড়াল, সামাজিক উন্নয়ন ছাড়া পরিবহন খাতে আইনের শাসন এখনো হনুজ দূর অস্ত। ফলে দশ দিনের মধ্যে ফাঁসি চাইয়ের মতো স্লোগান না তুলে তদন্ত এবং পরিবহন আইনপ্রক্রিয়ায় একটি কার্যকর নাগরিক শরিকানা নিশ্চিত করতে মনোযোগী হওয়া জরুরি।
২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন বলছে, ‘কোনো মোটরযান হইতে উদ্ভূত দুর্ঘটনার ফলে কোনো ব্যক্তি আঘাতপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া মৃত্যুবরণ করিলে, উক্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা ক্ষেত্রমত, তাহার উত্তরাধিকারীগণের পক্ষে মনোনীত ব্যক্তি ধারা ৫৩-এর অধীন গঠিত আর্থিক সহায়তা তহবিল হইতে ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, চিকিৎসার খরচ প্রাপ্য হইবেন।’
এখন এই স্বশাসিত ট্রাস্টি বোর্ড যথারীতি অচল আছে। কারণ, তা গঠিতই হয়নি। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ একটি বিচার বিভাগীয় ধারণা, যা আগের আইনে ক্লেইমস ট্রাইব্যুনালে স্বীকৃত ছিল। ভারতীয় আইনে হাইকোর্ট ও জেলা জজের যোগ্যতা ছাড়া কারো সদস্য হওয়ার সুযোগই রাখা হয়নি। বাংলাদেশ তার ইতিহাসে কখনো ক্লেইমস ট্রাইব্যুনাল গঠনই করেনি। প্রতি জেলায় জেলা জজের নেতৃত্বে থাকার বিধান ছিল। আর এখন ১৩ সদস্যের ট্রাস্টি বোর্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা। বিশিষ্ট নাগরিক মাত্র একজন। যদি আদৌ বোর্ড রাখতেই হয়, তাহলে নাগরিক শরিকানা আরো বাড়িয়ে সেখানে অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারককে চেয়ারম্যান করা যেতে পারে।
তার থেকেও বড় কথা, আর্থিক তহবিল যদি ভালোভাবে গঠন ও গতিশীল করা যেত, তাহলেই মালিক-চালকদের কানে পানি যেত। কারণ, প্রস্তাবিত তহবিলে সরকারি অনুদান ছাড়া বাকি পাঁচটি উৎসের সবটাই তাদের সংশ্লিষ্ট। আইনেই বলা আছে, মোটরযানের মালিকের দেওয়া চাঁদা, এই আইনের অধীন আদায় করা জরিমানার অর্থ, মালিক সমিতি, মোটর শ্রমিক সংগঠন বা ফেডারেশনের দেওয়া অনুদান এবং অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ক্ষতিপূরণ মেটানো হবে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের মনে হয়, যে মামলায় আবরারকে ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে, সেই মামলাতেই আদালতের সামনে ট্রাস্টি বোর্ড ও আর্থিক তহবিল গঠনে উপযুক্ত নির্দেশনা প্রার্থনা করা উচিত। ২০১০ সালে তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছিলেন, বিমা কোম্পানিগুলো দুর্ঘটনার পরে টাকা দেয় না, তাই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সবটাই বুলি। আমরা ক্ষতিপূরণের টাকা আগামী জাতীয় বাজেটে সরাসরি বরাদ্দ হিসেবে দেখতে চাই।
[লেখক : সাংবাদিক। প্রথম আলো থেকে।]

আরও পড়ুন