হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার, গায়ে এখন পুলিশের উর্দি

আপডেট: 02:23:03 18/04/2018



img
img

জহর দফাদার : হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার; কিন্তু মেডিকেলে সুযোগ পাননি। ভর্তি হয়েছিলেন গার্হস্থ অর্থনীতিতে। অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে অংশ নেন বিসিএস পরীক্ষায়। প্রথম পছন্দ ছিল পুলিশ ক্যাডার। আর সেখানেই পেয়ে যান সুযোগ, ২৫তম ক্যাডারে। সাতক্ষীরার মেয়ে হিসেবে তিনিই প্রথম বিসিএস পুলিশ।
রেশমা শারমীন বর্তমানে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপারের (যশোর জোন) দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পুলিশে নিয়োগ পেয়ে অখুশি নন; বরং সাধারণ মানুষের সেবা করতে পেরে বেশ প্রফুল্ল তিনি।
সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার চান্দা গ্রামে জন্ম রেশমা শারমীনের। বাবা মো. নজরুল ইসলাম ছিলেন সোনাবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মা মাবিয়া সুলতানা গৃহিণী। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি বড়। প্রাইমারি শেষ করেছেন রাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে; এসএসসি পাশ করেছেন সোনাবাড়ীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং এইচএসসি খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে। আলাপচারিতায় উঠে আসে রেশমার কর্মজীবনের নানা কথা।
কর্মজীবনে তার বড় চ্যালেঞ্জ কী- এমন প্রশ্নের জবাবে রেশমা জানান, এখন পর্যন্ত তার কাছে তেমন কিছু বড় চ্যালেঞ্জ মনে হয়নি। তবে, সারদায় প্রশিক্ষণটা মনে হয়েছিল বড় চ্যালেঞ্জ। প্রায় এক বছর সেখানে কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ট্রেনিং করাটাই ছিল খুব কঠিন। এরপর বিভিন্ন স্টেশনে এসে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সহকর্মী- সবার কাছ থেকে পেয়েছেন সহযোগিতা। প্রত্যেকেই ছিলেন সাপোর্টিভ, সিনিয়র-জুনিয়র সবার সম্মান-স্নেহ পেয়েছেন।
স্বামী ব্যাংকার রোকনুজ্জামান ও এক সন্তান নিয়ে তার সংসার। চাকরিজীবনে কোনো সংশয় দানা বাঁধেনি সংসারে। পুলিশে যোগদানের পর ডাক্তার হওয়ার বাসনা ক্রমে মিইয়ে যায়। ২০১১ সালে নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকালে যশোরের কেশবপুরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে গাড়িও যায় না, গিয়েছিলেন রেশমা। তিনি বলেন, 'মনে আছে- সেখানকার নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে অনেকেই এসেছিলেন আমাকে দেখতে। তারা শুনেছেন, একজন নারী কর্মকর্তা রয়েছেন যিনি থানার ওসির চেয়েও পদমর্যাদায় বড়!'
পুলিশের চাকরি খুব ইন্টারেস্টিং। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে আরেক নির্বাচনের সময় গিয়েছিলেন তিনি। বলেন, 'ওই জায়গাটা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে, কোনো অঘটন সেখানে ঘটেনি।'
কয়েকটি মামলার তদন্ত করেছেন রেশমা। সেগুলোর কাহিনি নাটক-সিনেমাকে হার মানায়। ভিকটিমের বাড়িতে গেলে তাদের স্বজনরা এমনভাবে কথা বলেছেন, যেন তিনি তাদের নিকটাত্মীয়। নারী পুলিশ হওয়ায় অনেকেই মন খুলে কথা বলেছেন তার সঙ্গে। সেক্ষেত্রে মামলার তদন্ত করতে সুবিধেও হয়েছে।
তিনি জানান, ২০০৯ সালে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলায় গ্রাম্য দলাদলির ঘটনায় এক মারামারির সময় সারাদিন মাঠের ভেতরেই থাকতে হয় তাকে। কোনো খাবার বা পানি ছিল না আশেপাশে। পরে অন্য জায়গা থেকে পানি আনতে হয়।
কষ্টকর কোনো অভিজ্ঞতা? 'একবার ছেলেটির খুব জ্বর! ডিউটি যশোরের বেনাপোলে। দুই বছরের সন্তানটিকে মায়ের কাছে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ডিউটি করেছিলাম। মা হিসেবে সেদিন খুব কষ্ট লেগেছিল।'
চাকরিজীবনে জাতিসংঘ মিশনে যাওয়া ছাড়াও ইতালিতে জেন্ডার প্রটেকশন বিষয়ে ট্রেনিং করেছেন রেশমা শারমীন। ভ্রমণ করেছেন ইস্তাম্বুল, প্যারিস, উগান্ডা। সোমালিয়া, ঘানা, কেনিয়া, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশের নারী পুলিশের সঙ্গে মেশার সৌভাগ্য হয়েছে। জর্ডান বাদে অন্য দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে নারী পুলিশ সদস্যদের কর্মক্ষেত্র বা পরিবেশ ভালো বলে তিনি মনে করেন।
আগামীতে যেসব নারী পুলিশে যোগ দিতে চান, তাদের উদ্দেশে রেশমার কথা, অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে পুলিশের চাকরি সম্মানজনক। ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই পেশায় নারীদের আসা উচিৎ। অধিক সংখ্যক নারী এই পেশায় এলে তা হবে নারীবান্ধব বা পজিটিভ পুলিশিং।