১২ বারের দেশসেরা চৌগাছা হাসপাতাল বেহাল

আপডেট: 07:59:45 04/05/2019



img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) : চিকিৎসাসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নাম চৌগাছা উপজেলা মডেল ৫০ শয্যা হাসপাতাল। এই প্রতিষ্ঠানটি মোট ১২ বার অর্জন করেছে দেশসেরার পুরস্কার। সর্বশেষ স্বাস্থ্যসেবায় সারাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করে ৭ এপ্রিল পেয়েছে ‘হেলথ মিনিস্টার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০১৮’।
কিন্তু দেশসেরা এই হাসপাতালে প্রকৃতপক্ষে খুবই দুরবস্থা বিরাজ করছে। গাইনি বিশেষজ্ঞ না থাকায় মেডিকেল অফিসার ডা. সুব্রতকুমার বাগচি প্রসূতিদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। তিনিই করছেন অস্ত্রোপচার। চিকিৎসকের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকটও রয়েছে।
এখানকার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সিভিল সার্জন হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ঝিনাইদহে যোগদান করেছেন। আবার আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আওরঙ্গজেব উচ্চতর ডিগ্রি নিতে তিন বছরের ছুটিতে গেছেন। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার নাহিদ সিরাজের নেতৃত্বে চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালে মোট চিকিৎসকের পদ রয়েছে ২১টি। বিপরীতে আটজন চিকিৎসক কর্মরত ছিলেন। ওই আটটি পদের মধ্যে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, কার্ডিওলোজিস্ট একজন, অর্থোপেডিক চিকিৎসক একজন, আবাসিক মেডিকেল অফিসার একজন এবং মেডিকেল অফিসার চারজন। বর্তমানে ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম।
বছরের পর বছর ধরে ফাঁকা রয়েছে গাইনি বিশেষজ্ঞ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ, সার্জারি বিশেষজ্ঞ, ইএনটি বিশেষজ্ঞ ও অজ্ঞান করা চিকিৎসকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো। এছাড়া সহকারী সার্জনের একটি, প্যাথলোজিস্টের একটি, সিনিয়র স্টাফ নার্সের পাঁচটি, প্রধান সহকারী, হিসাবরক্ষক, ক্যাশিয়ার, অফিস সহকারী দুটি, এমএলএসএস দুটি, ওয়ার্ডবয়ের একটি, আয়ার পদগুলোও রয়েছে শূন্য। ফলে জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হচ্ছে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, চৌগাছা হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সাবেক চিকিৎসক ইমদাদুল হকের আন্তরিক চেষ্টায় অন্তঃসত্ত্বাদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হয়েছিল। চিকিৎসক হিসেবে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। মা ও প্রসূতিসেবায় ব্যাপক অবদান রাখার ফলে ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এটি উপজেলা পর্যায়ে একটানা দেশসেরা হাসপাতাল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০১৬ সালেও হাসপাতালটি অর্জন করে জাতীয় পুরস্কার। সর্বশেষ স্বাস্থ্যসেবায় সারাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করে গত ৭ এপ্রিল পেয়েছে ‘হেলথ মিনিস্টার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০১৮’। এদিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রতিষ্ঠান প্রধান সেলিনা বেগম।
চৌগাছা পৌরসভার পাঁচনামনা গ্রামের সুমি খাতুন, উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের পারভীন খাতুনসহ অনেকেই জানিয়েছেন, জরুরি মুহূর্তে তেমন কোনো সেবা মিলছে না এখানে। গাইনি বিভাগে দায়িত্বরত মেডিকেল অফিসার ডা. সুব্রতকুমার বাগচিকে দুপুর আড়াইটার পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্য বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের মধ্যে অনেকে কর্মস্থলে আসেন না নিয়মিত। ফলে সামান্য সমস্যায় রোগীদের ছুটতে হচ্ছে যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ বেসরকারি বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। দেশসেরা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার এই হালে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
হাসপাতালের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সেলিনা বেগমের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা মোট আটজন দায়িত্বে ছিলেন। বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে অনেক কষ্ট করে হাসপাতালটি পরিচালনা করতেন। তিনি সিভিল সার্জন হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ঝিনাইদহে যোগদান করেছেন। এছাড়া আরএমও তিন বছরের জন্য ছুটিতে গেছেন। বর্তমানে ছয়জন চিকিৎসক রয়েছেন হাসপাতালটিতে। একজন মেডিকেল অফিসারের পক্ষে কোনোভাবেই গাইনি রোগী সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. দিলীপকুমার রায় জানিয়েছেন, চৌগাছা মডেল হাসপাতালে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদ দ্রুত পূরণ হবে। এছাড়া গাইনি কনসালটেন্ট ও গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকের পদগুলো পূরণের ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদফতরে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে নতুন একজন মেডিকেল অফিসার সেখানে যোগদান করবেন বলে জানান সিভিল সার্জন।

আরও পড়ুন