১৭ টাকা বেতনের চাকরি, পেনশন সাড়ে পাঁচ হাজার

আপডেট: 02:54:46 28/11/2016



img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) : যশোরের চৌগাছা উপজেলার শতবর্ষী আয়ুব মাস্টার এখনো কর্মক্ষম। তার অনেক ছাত্র পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার অনেকে শয্যাশায়ীও হয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাদের শিক্ষক কর্মক্ষম। প্রতিদিন ৩-৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে চৌগাছা শহরে আসেন পারিবারিক কাজে।
সম্প্রতি এক দুপুরে চৌগাছার এখলাচ উদ্দিনের টি-স্টলে বসে বর্ষীয়ান এই শিক্ষক সুবর্ণভূমিকে শোনালেন তার জীবনের নানা উপাখ্যান।
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে উপজেলার সিংহঝুলি ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামে জন্ম নেন আয়ুব হোসেন। তার বাবা আজিবর রহমান বিশ্বাস আর মা ইশারন নেছা। জন্মের নয় মাস পরেই মারা যান মা ইশারন নেছা। মা-হারা আয়ুবকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন নানা উপজেলার হুদো চৌগাছা গ্রামের মেহের আলী বিশ্বাস। একটু বড় হলে আয়ুবকে গ্রামের মাহিন্দ্রনাথের খানকায় লেখাপড়া শিখতে পাঠান নানা। এক পর্যায়ে কলকাতায় গিয়ে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করে বিফল হন তিনি। নানা প্রতিকূলতার কারণে আনুষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ফেলতে বাধ্য হন তিনি।
তার ভাষ্য মতে, ১৯৪০ সালে চৌগাছার তৎকালীন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আয়ুব হোসেন। সেই থেকে পরিচিতি পান আয়ুব মাস্টার নামে। বৃদ্ধদের অনেকেই এখনো তাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করেন; যা শুনে এ প্রজন্মের অনেকে অবাক হয়ে যান।
সেই আমলে চৌগাছার জমিদাররা শিক্ষকদের কিছুটা সহযোগিতা করতেন। পরে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হলে তার মাসিক বেতন ১৭ টাকা নির্ধারিত হয়। তিন মাস পরপর ৫১ টাকা করে বেতন আসতো পোস্ট অফিসের মাধ্যমে। শিক্ষক হিসেবে ওই বিদ্যালয়ে আরো যোগদান করেন কয়ারপাড়া গ্রামের আহমদ আলী সাহিত্যরত্ন এবং চৌগাছার রজব আলী বিশ্বাস। আয়ুব মাস্টারের এ দুই সহকর্মী অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।
তিনি চৌগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও দীঘলসিংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফুলসারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তার অসংখ্য ছাত্রের মধ্যে ছিলেন চৌগাছা শাহাদৎ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এ কে শফিউদ্দিন আহমদ; যিনি প্রায় দশ বছর আগে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছেন, চৌগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিএম হাবিবুর রহমান, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম হাবিবুর রহমান, চৌগাছা বাকপাড়ার দাউদ হোসেন বিশ্বাস, বর্তমান খুলনা জেলার সিভিল সার্জন ডাক্তার এএসএম আব্দুর রাজ্জাক, বিশিষ্ট শিল্পপতি ডিভাইন গ্রুপের এমডি হাসানুজ্জামান রাহিন প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। অর্ধশত বছর শিক্ষকতা পেশায় জড়িত থাকার পর ১৯৯০ সালে অবসর নেন তিনি।
নিজের জীবনের অনেক সফলতার কাহিনির পাশাপাশি ব্যর্থতার কথাও শোনালেন আয়ুব মাস্টার। জানালেন, জীবনে অসংখ্য ছাত্রকে হাতে ধরে লেখাপড়া শেখালেও নিজের কোনো সন্তানকে তেমন লেখাপড়া শেখাতে পারেননি তিনি।
বৈবাহিক জীবনে তিনি দশ সন্তানের জনক। সাত মেয়ে আর তিন ছেলে। মেয়েরা সবাই শ্বশুরবাড়ি চলে গেছেন। তিন ছেলের মধ্যে কেউই তেমন কর্মঠ নন। পেনশন মাসিক পাঁচ হাজার ৫৯০ টাকা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে তার। এর মধ্যে আবার বেশ কিছু টাকা দিয়ে স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনতে হয়। তিন ছেলের কারো ছেলে সন্তান নেই। মেয়ে পাঁচটি।
শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে আয়ুব মাস্টার জানান, এখনো তাকে কোনো ওষুধ সেবন করতে হয় না। হেঁটেই চলাফেরা করেন। কোনো সমস্যা হয় না।
স্মৃতি রোমন্থন করতে ভালোবাসেন এই প্রবীণ ব্যক্তি। বলেন, ‘ব্রিটিশ, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ সরকারের অধীনে চাকরি করে এখনো সুস্থভাবে বেঁচে আছি, এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বেশি পাওয়া।’
‘চাকরি শুরু ১৭ টাকা বেতনের। এখন সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পেনশন পাই। ভাবতে ভালোই লাগে’, যোগ করেন চৌগাছার সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই প্রবীণ শিক্ষক।