১৭ মাসের রাজনীতিক দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে

আপডেট: 02:52:16 10/11/2016



img

মনির হায়দার

এ যেন অচেনা এক টর্নেডো। কোনো পূর্বাভাসই মেলেনি। ঠিক হয়নি বোদ্ধা-বিশেষজ্ঞদের কোনো বিশ্লেষণও। সব আন্দাজ-অনুমান, হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়ে দুনিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদের অধিকারী হয়ে গেলেন মাত্র ১৭ মাসের এক রাজনীতিক, ডনাল্ড জে. ট্রাম্প। অবিশ্বাস্য এক জয় পেয়েছেন তিনি। ভূমিধসও বলা যেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট পদে ডনাল্ড ট্রাম্পের জয় ছাড়াও নির্বাচনে সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভও নিজের কব্জায় রাখতে পেরেছে রিপাবলিকান পার্টি।
গত বছরের মার্চ মাসে ম্যানহাটনের ট্রাম্প টাওয়ারে হাসি-তামাশায় ভরা এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান দিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কের ৭০ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী। আর দশটি সংবাদ সম্মেলনের মতো তার সেদিনের সংবাদ সম্মেলনটি মূলধারার কোনো মার্কিন সংবাদমাধ্যমেই স্বাভাবিক খবর হিসেবে আসেনি। সবগুলো মিডিয়াতেই এটি ছিল অনেকটা উপহাসযুক্ত হাসির খবর। উপহাসের উপাদানও দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আমি খুবই ভালো প্রেসিডেন্ট হবো। কারণ, আমি দুর্নীতি করবো না। আমি এমনিতেই ধনী। সত্যিই যথেষ্ট ধনী।’
আদতেই তিনি কতটা ধনী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটা অপ্রাসঙ্গিক। তবে রাজনীতিতে যে তার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই এ কথা সবারই জানা। ব্যবসা এবং টেলিভিশনে রিয়েলিটি শো উপস্থাপনার বাইরে উল্লেখ করার মতো কোনো সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ট্রাম্পের সম্পৃক্ততার কথা কখনো শোনা যায়নি। এমন একজন হঠাৎ করেই একেবারে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদের লড়াইয়ে শামিল হওয়ার ঘোষণা দিলে কোনো মহলই সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চায়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব হাসি-ঠাট্টা, বিভিন্ন মহলের সমালোচনা, সংবাদমাধ্যমে একের পর এক নিজের ও তৃতীয় স্ত্রীর অতীতের নানা কেচ্ছা-কাহিনী বেরিয়ে পড়া এবং সব রকম জনমত জরিপের ফলাফল পেছনে ফেলে সত্যিই এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকার প্রথম অরাজনীতিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে আগামী ২০ জানুয়ারি শপথ নেবেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটন পরাজয় মেনে নিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাকে।
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার খবরটিকে সাংবাদিকদের মতোই অনেকটা ঠাট্টাচ্ছলে নিয়েছিলেন রিপাবলিকান পার্টির বাঘা বাঘা নেতারা। শুরুর দিকে তারা পাত্তাই দেননি রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এই রিয়েল এস্টেট ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ীকে। সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ভাই ও ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর জেব বুশকে মনে করা হয়েছিল প্রাইমারিতে সবচেয়ে ফেভারিট প্রার্থী। এছাড়া ওহাইয়োর গভর্নর জন কেইসিক, টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ ও ফ্লোরিডার সিনেটর মার্কো রুবিওর মতো প্রার্থীরা ছিলেন প্রতিযোগিতায়। কিন্তু কট্টর রক্ষণশীল রিপাবলিকান সমর্থকদের উদ্দেশে বার্তা যা দেওয়ার লড়াইয়ের একেবারে শুরুতেই তা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। আর তাই তাকে ঘিরে তৃণমূলের রিপাবালিকান শিবিরে দ্রুত আগ্রহ তৈরি হয়। তাতেই তিনি ক্রমশ চক্ষশূল হতে থাকেন রিপাবলিকান স্টাবলিশমেন্ট ও দলের বড় বড় নেতাদের।
প্রথম থেকেই তার মধ্যে কাউকে ছেড়ে কথা না বলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। প্রাইমারি পর্বে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের বিভিন্ন বিতর্কে প্রায় সব প্রার্থীকেই আক্রমণ করে কথা বলেছেন তিনি। তার এমন আচরণে দলটির নেতারা নাখোশ হলেও আশ্চর্যজনকভাবে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন রক্ষণশীল ভোটাররা। প্রাইমারির ভোট শুরু হওয়ার পর খুব দ্রুতই তা পরিষ্কার হয়ে যায়। তারপরের ইতিহাস তো শুধুই তার এগিয়ে যাওয়ার। ট্রাম্প-ঝড়ের কবলে পড়ে একে একে বিদায় নেন হেভিওয়েট নেতাসহ মোট ১৭ প্রার্থী। বিদায় নেয়াই শুধু নয়, তারা প্রায় সবাই জানিয়ে দেন যে, দলের মনোনয়ন পেলেও ট্রাম্পের জন্য তারা কাজ করবেন না। এমনকী কেউ কেউ প্রকাশ্যে এই ঘোষণাও দেন যে, ট্রাম্পকে তারা ভোটও দেবেন না। প্রাইমারিতে ট্রাম্পের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত লড়ে হেরে যাওয়া ওহাইয়োর গভর্নর জন কেইসিক তো আগাম ভোটাধিকার প্রয়োগ করে জানিয়ে দেন যে, তিনি ট্রাম্পকে ভোট দেননি। রিপাবলিকান পার্টির আগের দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জন ম্যাককেইন ও মিট রমনি তো দলের ভেতরেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন।
এছাড়া অব্যাহতভাবে অভিবাসী, আফ্রিকান-আমেরিকান, মেক্সিকান ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং নারীদের প্রতি অসম্মানকজনক উক্তি করার কারণে দলের অন্য নেতারাও ট্রাম্পকে এড়িয়ে চলেন। রিপাবলিকান কনভেনশনে ট্রাম্পকে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন দেয়ার পর তার দীর্ঘ নির্বাচনী প্রচারে দলের কোনো শীর্ষ নেতাকে কখনো দেখা যায়নি। অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধে দলের চেয়ার ও হাউস স্পিকার পল রায়ান ক্যালিফোর্নিয়াতে একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে আমন্ত্রণ জানিয়েও পরে তা বাতিল করেন। এ অবস্থায় অনেকটা নিজের পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রচারণা চালান তিনি।
নিজের বেপরোয়া কথাবার্তার কারণে এমনিতেই মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের সমালোচনার মুখে ছিলেন তিনি। এরমধ্যে কয়েক বছরের পুরনো একটি ‘সেক্স টেপ’ ফাঁস হয়ে গেলে আরো বেকায়দায় পড়েন ট্রাম্প। তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কের প্রতিটিতেই হিলারির কাছে হেরে যান তিনি।
এফবিআই গত ২৮ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় হিলারি ক্লিনটনের ই-মেল তদন্তের কথা জানালে পরদিন ২৯ অক্টোবর ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের জনমত জরিপে মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য এগিয়ে যান এই রিপাবলিকান প্রার্থী। এর আগে ও পরে সব জরিপেই স্পষ্ট ব্যবধানে অগ্রগামী দেখানো হয় হিলারিকে। খ্যাতিমান নির্বাচন বিশ্লেষকরাও বলেছেন, দেশের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন হিলারি। সর্বশেষ সোমবারও হিলারির বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ৭০ ভাগেরও বেশি বলে দেখানো হয়।
ইউরোপ ও আমেরিকার পেশাদার বাজিকর প্রতিষ্ঠানগুলোও হিলারিকে হবু প্রেসিডেন্ট মেনে নিয়েই মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বাজি ধরে। সবকিছু দেখেশুনে ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেও যেন আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সকালে ম্যানহাটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভোট দেয়ার পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি হতাশাই ব্যক্ত করেছিলেন।
কিন্তু বাস্তবে সোমবার মধ্যরাতের পর নিউ হ্যাম্পশায়ারের তিন কেন্দ্রের ভোটের ফলাফলে পেছনে পড়ে যাওয়া সাবেক ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন শেষ পর্যন্ত আর টপকাতে পারেননি ডনাল্ড ট্রাম্পকে। 
আমেরিকার নির্বাচনে এই প্রথম প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর দুজনই তাদের ইলেকশন নাইট ইভেন্টের আয়োজন করেছিলেন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে। হিলারি ক্লিনটনের আয়োজনটি ছিল ট্রাম্পের তুলনায় অনেক বড় পরিসরে। নগরীর সবচেয়ে বড় কনভেনশন হল জ্যাকব জাভিটস সেন্টার ভাড়া নেন তিনি। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পরপরই সেখানে হাজির হন ডেমোক্রেট প্রার্থী। জড়ো হয় হাজার হাজার কর্মী-সমর্থকও। কথা ছিল তাদের উদ্দেশে বিজয়-ভাষণ দেবেন তিনি। কিন্তু তা হয়নি। এমনকী পরাজিত প্রার্থী হিসেবে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তৃতা করা এবং বিজয়ীকে অভিনন্দন জানানোর রেওয়াজটিও মানেননি হিলারি। তিনি ট্রাম্পকে টেলিফোনে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। আর উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন হিলারির প্রচার দলের প্রধান জন পোডেস্টা।
অন্যদিকে নিজের ঠিকানা ট্রাম্প টাওয়ার থেকে মাত্র কয়েক শ’ গজ দূরে ম্যানহাটনের হিলটন মিড টাউন হোটেলে তুলনামূলক ছোট পরিসরের ইলেকশন নাইট উৎসবে অংশ নেন ডনাল্ড ট্রাম্প। জয়ের খবর নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর রাত ২টা ৪৭ মিনিটে মুহুর্মুহু করতালি আর উল্লাসধ্বনির মধ্যে স্ত্রী মেলানিয়া, রানিংমেট মাইক পেন্স ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে হাত উঁচিয়ে অভিনন্দনের জবাব দিতে দিতে ধীর পায়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন তিনি। কিছুটা বদলে যাওয়া মেজাজে দাঁড়ান মাইকের সামনে। অনেকটাই ধীর স্থির। তারপর সংক্ষিপ্ত বিজয় ভাষণে নিজের কর্মী-সমর্থক ও প্রচার দলের সদস্যদের ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান তিনি। উল্লেখ করতে ভোলেননি সিক্রেট সার্ভিস সদস্যদের কথাও। তার নির্বাচিত হওয়ার ফলে দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার ব্যাপারটিও যেন পুরোপুরিই ওয়াকিবহাল ছিলেন তিনি। আর সে কারণেই কিনা বিজয় ভাষণে ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সব মানুষের প্রেসিডেন্ট আমি।’
এখন দেখার পালা কতটা ভালো প্রেসিডেন্ট হন তিনি।

লেখক : নিউ ইয়র্ক প্রবাসী সংবাদকর্মী
সূত্র : মানবজমিন