৪৫ বছরে পুঁজি বেড়ে এক হাজার

আপডেট: 06:57:21 11/03/2018



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : ‘ইঁদুরের বংশ, মরে হবে ধ্বংস’,  ‘ইঁদুরের যম এসেছে যম, পালাবার জায়গা নেই’। এভাবে লেকচার (বয়ান) দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে দীর্ঘ ৪৫ বছর ইঁদুর মারা ওষুধ বিক্রি করেন ঝিনাইদহের নিজাম উদ্দিন (৬২)। ছোটবেলা থেকেই এই পেশা বেছে নিয়েছিলেন। এই কাজ করেই পাঁচ সন্তান লালন-পালন করেছেন।
এখন তার সন্তানেরা নানা কাজে নিয়োজিত। তবে নিজাম উদ্দিন পুরনো পেশাকেই ধরে আছেন। দিনে ২-৩শ’ টাকা আয় করেন। তা-ও প্রতিদিন হয় না। কষ্ট করেই কাটিয়ে দিলেন জীবনটা। মাত্র ২০ টাকা পুঁজি নিয়ে এই পেশায় নেমেছিলেন। তার ভাষায় এখন তার ব্যবসার পুঁজি অনেক- এক হাজার টাকা!
নিজাম উদ্দিন বিশ্বাস ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার অচিন্ত্যপুর গ্রামের মৃত তোরাফ আলী বিশ্বাসের ছেলে।
তিনি জানান, তারা দুই ভাই। বাবা হতদরিদ্র হওয়ায় ছোটবেলায় ঠিকমতো পড়ালেখা করাতে পারেননি। শৈলকুপা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালে ১৯৭৩ সালে কর্মজীবনে ঢুকতে হয়। বাবার দেওয়া আর ধার মিলিয়ে ২০ টাকা পুঁজি নিয়ে ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রি শুরু করেন।
তিনি জানান, সেই সময় মাঠের জমিগুলো বছরের বেশির ভাগ সময়ই শুকিয়ে থাকতো। ফসলের ক্ষেতে ইঁদুরের উৎপাত ছিল বেশি। মানুষের গোলাভরা ধান আর উঠোন ভরা শস্য থাকতো। যেগুলো নষ্ট করতো ইঁদুর। যে কারণে ইঁদুর মারা ওষুধও প্রয়োজন ছিল কৃষকের। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন এই পেশা।
সম্প্রতি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের নিমতলা বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি তখনো ওষুধ বিক্রি করছিলেন।
নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সব সময় সৎ পথে থাকার চেষ্টা করেছি। বাজার থেকে কীটনাশক কিনে বাড়িতে বসে খাবারের সঙ্গে তা মেশাই। এভাবে তৈরি হয়ে যায় ইঁদুর মারা ওষুধ। মাসে আনুমানিক ২০ দিন এই ওষুধ নিয়ে রাস্তায় বের হই। বাকি দিনগুলো কোনো কাজ থাকে না।’
ঝিনাইদহ, শৈলকুপা এবং কালীগঞ্জ শহরে হেঁটে হেঁটে এই ওষুধ বিক্রি করেন নিজাম। বিক্রি শেষে হিসেব করেন আয় কত হলো।
তিনি জানান, এক সময় দিনে ৪-৫ টাকা আয় হতো। এখন ২-৩শ’ টাকা আয় হয়। এই উপার্জন দিয়েই তার সংসার চলে। তবে কোনো সঞ্চয় করতে পারেননি; পারেননি জায়গা-জমির মালিক হতে। এমনকি একটা পাকা বাড়ির শখ ছিল তার; কিন্তু তা-ও করা সম্ভব হয়নি।
নিজামের দাবি, তার তৈরি ওষুধ কিনে ৯০ শতাংশ মানুষ বলেছে, তাদের বাড়ি বা ক্ষেতের ইঁদুরগুলো মরে সাফ হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে ২-৪ জন ‘কাজ হয়নি’ বলে অভিযোগ করেছে। আর তখনই তিনি ওই ক্রেতাকে বিনেপয়সায় ওষুধ দিয়েছেন। এখন একপাতা ওষুধ পাঁচ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, ১৯৭৬ সালে একই উপজেলার পদমদী গ্রামের আনোয়ার হোসেন খাঁর মেয়ে রহিমা খাতুনকে বিয়ে করেন তিনি। তার পাঁচ সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে জাহাঙ্গীর আলম রাজমিস্ত্রি। মেজ ছেলে আলমগীর হোসেন কৃষিকাজ করেন। আর ছোট ছেলে নাজমুল হোসেন এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। বড় মেয়ে কোহিনুর বেগমকে বিয়ে দিয়েছেন। আর ছোট মেয়ে সাথিলা খাতুন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে।
তিনি জানান, জীবনে যা আয় করেছেন, তা দিয়ে ছেলে-মেয়েদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা হয়েছে। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা তার কখনো হয়নি। এখন মাটির মেঝে আর টিনের চালের দুই কক্ষে পরিবার নিয়ে তার বসবাস। একটি রান্নাঘর আছে। ভিটেবাড়ি, পতিত আর চাষযোগ্য মিলিয়ে তার দুই বিঘা জমি আছে।
দৃশ্যত নিজাম উদ্দিনের পরিস্থিতি ইতরবিশেষ না হলেও তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এখন এই ব্যবসায় পুঁজি বেড়েছে; যার পরিমাণ এক হাজার টাকা। এই পুঁজি নিয়ে বাজারে বাজারে ঘুরে বেড়াই।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে প্রকাশ করেন, ‘তবে শরীর এখন আর পারে না। পাঁয়ে হাঁটা কষ্টকর হয়ে যায়। কিন্তু না চললে খাবো কী?’