৯ বছরেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি আইলাবিধ্বস্ত উপকূলীয় জনপদ

আপডেট: 01:50:31 25/05/2018



img
img
img

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : দুই অবুঝ সন্তান ও স্ত্রীসহ গোটা পরিবারকে ছিনিয়ে নিয়েছিল আইলা। পৈত্রিক বসতভিটে আর সহায়-সম্পদ, কোনো কিছুই রেহাই পায়নি ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের ছোবল থেকে।
তারপর একে একে নয়টি বছর পেরিয়েছে। আজ পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি দশ নম্বর সোরা গ্রামের আব্দুল মাজেদের জীবন। গোটা পরিবারকে হারিয়ে ভাবলেশহীন হয়ে পড়া মাজেদ আজো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন বেঁচে থাকার।
‘সবাই চলে গেল, শুধু আমাকে রেখে গেছে স্বজন হারানোর বেদনা সইবার জন্য,’ মাজেদের। ভাঙনের মুখে থাকা বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে মাজেদ বলেন, ‘বেঁচে থাকাটাই এখন একটা যন্ত্রণা।’
আইলার আঘাতের পর প্রায় এক বছর সরকারি-বেসরকারি সাহায্য নিয়ে দিন কেটে যাচ্ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এক বছর পর থেকে নদী আর বনের ওপর ভর করে কোনো রকমে জীবিকা চলছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে বনে দস্যুদের উপদ্রব বেড়ে যাওয়া এবং নদীতে পোনা ধরা বন্ধের ঘোষণায় এখন না খেয়ে মরার যোগাড়।
এমন অবস্থা কেবল আব্দুল মাজেদের, তা না; বরং গোটা উপকূলের হাজার হাজার পরিবারকে কমবেশি আজও সেই আইলার তাণ্ডবের ক্ষত বহন করতে হচ্ছে। নিরন্তর তারা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে কেবলমাত্র বেঁচে থাকার জন্য।
মাজেদের প্রতিবেশী বরকত গাজী আর আমিরুল ইসলামসহ কয়েকজন জানান, আইলার পর নয়টি বছর পার হয়েছে। আইলা তাদেরকে বিধ্বস্ত করে যেখানে রেখে গেছিল, সেখান থেকে আজও তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেননি। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে খাবার উপযোগী পানি এমনকি জ্বালানি সংকটে পড়ে তারা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। এছাড়া উপকূল রক্ষা বাঁধসমূহ আজ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে মেরামত না হওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে প্রতিটি দিন কাটে চরম আতঙ্কে।
নাপিতখালী গ্রামের আজিজুল গাজী বলেন, আইলার সময় সাগরের লোনা পানি এসে সমগ্র এলাকা ভাসিয়ে দেয়। এরপর থেকে এলাকায় ফসল উৎপন্ন হয় না। গাছ-গাছালিশূন্য হয়ে পড়া গোটা এলাকা মরুভূমির মতো পড়ে আছে। কাজের খোঁজে মানুষ প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়া অব্যাহত রেখেছে।
আইলার ক্ষত শুকাতে আরো অনেক দিন লাগবে উল্লেখ করে নাপিতখালী জামে মসজিদের ইমাম মহসীন আলম জানান, তার ভাই মাসুম বিল্লাহ গত নয় বছরেও এলাকায় ফেরেননি। পরিবার পরিজন নিয়ে খুলনায় কাজকর্ম করেন তিনি।
ইমাম বলেন, এলাকায় কৃষি ফসল উৎপাদন না হওয়ায় অল্পসংখ্যাক মানুষ জোয়ারের লোনা ব্যবহার করে চিংড়ি ঘের পারিচালনা করছে। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ কাজের অভাবে উত্তরাঞ্চলে গিয়ে ধান ও মাটি কাটার পাশাপাশি ইটের ভাটায় কাজ করে মৌসুমি শ্রমিক পরিচয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছে।
এদিকে, আইলায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার না হওয়ায় গত নয় বছর ধরে ঝুঁকির মুখে বিস্তীর্ণ জনপদ। আমিরুল ইসলাম, মোসলেম গাজীসহ অনেকে জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পক্ষ থেকে সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়ায় কখন বাঁধ ভেঙে জনপদ প্লাবিত হয়- এই উদ্বেগে দিন কাটে মানুষের।
সরেজমিনে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ, কৈখালীসহ আইলার নির্মমতার শিকার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাঝেমধ্যে কোনো কোনো জায়গায় দুই চারটি তাল কিংবা নারকেলগাছ খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। বাদবাকি বিস্তীর্ণ এলাকা বৃক্ষশূন্য। সরকারি অর্থায়নে গড়ে তোলা বেশকিছু বসতঘরের দেখা মিললেও বড় ধরনের ঝড়ো বাতাস কিংবা জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলা করার মতো শক্তি নেই সেসব আশ্রয়স্থলের। আর উপকূল রক্ষা বাঁধের অবস্থা দেখলে মনে হয়, এগুলো সংস্কারের কোনো কর্তৃপক্ষ নেই।
জেলেখালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের ওপর বসে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব দিদারুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন। সংবাদকর্মী পরিচয় দিতেই প্রায় প্রত্যেকে কমবেশি বিরক্তি প্রকাশ করেন। ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা দিদারুল নামে একজন বলেন, ‘নটা বছর হয়ে গেল, তবু তোমরা আমাগো বাঁধটা বানদি (বেঁধে) দিতি পারলে না। শুধু আইলার সময় আসলি আসো আমাগো ভাল মন্দ জানতি, পেপারে লিখার খোরাক নিতি।’
পরে কিছুটা নরম স্বরে তিনি বলেন, ‘বাবা তোমরা কষ্ট নিও না। অনেক আফসোস থেকে এসব কথা বলতি বাধ্য হইছি। তোমরা এবারো আইছো যখন ঘুরে ঘুরে দেখে যাও ভাঙনধরা বাঁধ কীভাবে আমাগো অস্থির করে রেখেছে।’
পাশে বসা জাহিদুল ইসলাম জানান, আইলার পর থেকে লবণাক্ততার কারণে গোটা এলাকায় কৃষি ফসল উৎপাদন না হওয়ায় স্থানীয়রা পাশের নদী এবং সুন্দরবনকে আশ্রয় করে বাঁচার চেষ্টা করছিল। কিন্তু সুন্দরবনে ডাকাতের তৎপরতার পাশাপাশি নদীতে নেমে রেণু পোনা ধরার নিষেধাজ্ঞায় এখন তারা নিদারুণ অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছেন।
নয় বছরেও দুর্যোগকবলিত উপকুলবাসীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ জানান চাঁদনীমুখা গ্রামের আলাউদ্দীন ও ফজের আলীসহ অন্যরা। তাদের অভিযোগ, বন-বাদা ও নদীতে নামা বন্ধ হওয়ার পর এখন এলাকাবাসীর না খেয়ে মরার উপক্রম হয়েছে। তারা আরো বলেন, আইলার আগে গাবুরা এলাকায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার ইটের সোলিং থাকলেও গত নয় বছরে প্রায় শত কিমি রাস্তার কোথাও একটি ইটও পড়েনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইলার আঘাতে পুরোপুরিভাবে বিধ্বস্ত জনপদে পরিণত হওয়া এলাকা আজও মরুভূমির রূপ নিয়ে আছে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এলাকার বাইরে গিয়ে কাজকর্ম করে কোনো রকমে সংসারের খরচ যোগানোর চেষ্টায় রত।
২৭ কিমি উপকূল রক্ষা বাঁধসহ গোটা ইউনিয়নের সব রাস্তা কাঁচা এবং জীর্ণশির্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন গাবুরার চেয়ারম্যান মাসুদুল আলমের দাবি। তিনি জানান, আইলার পর নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এলাকার লবণাক্ততা কাটেনি। বৃক্ষরাজিশূন্য মরুভূমিসদৃশ জনপদে সেভাবে বনায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। তার ওপর খাবার পানি আর জ্বালানি সংকটে পড়ে গোটা উপকূলীয় জনপদের হাজারো পরিবার চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা উপকূল রক্ষা বাঁধ নিয়ে ৪৫ হাজার জনগোষ্ঠীর জনপদ প্রচণ্ড বিপন্ন বলে জানান তিনি।
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার দেওয়া তথ্যে জানা যায়, আইলার পর বসতঘর নির্মাণের জন্য পরিবারপিছু ২০ হাজার করে নগদ টাকা দেওয়া হয়। এর পর থেকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে উপকূল রক্ষা বাঁধের সামান্য সংস্কার কাজ করা হলেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কোথাও এক ইঞ্চি কাজও হয়নি। ফলে গত কয়েক বছরে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের এই দিনে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘুর্ণিঝড় ‘আইলা’ আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে। দিনের আলোয় এক মুহূর্তেই সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার উপকূলবর্তী আশাশুনি, কয়রা ও দাকোপ উপজেলার মতো সমুদ্রের কোলে অবস্থিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ উপজেলা শ্যামনগর লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ভুতুড়ে জনপদে পরিণত হয় গ্রামের পর গ্রাম।
স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় নারী ও শিশুসহ কয়েক শত মানুষ, হাজার হাজার গবাদি পশু আর ঘরবাড়ি। ক্ষণিকেই গৃহহীন হন কয়েক লাখ মানুষ। লাখ লাখ হেক্টর কৃষিজমি, ফসলের ক্ষেত আর শত শত কিলোমিটার রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে একাকার হয়ে যায়। চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূল রক্ষা বাঁধ আর অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আইলার ধ্বংসযজ্ঞে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এলাকার পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার ১২২ ব্যক্তি মুহূর্তেই নিরাশ্রয় হয়ে পড়েন। শুধু শ্যামনগরেই গৃহহীন হন দুই লাখ ৪৩ হাজার ২৯৩ জন। এছাড়া শ্যামনগরের ৯৬ হাজার ৯১৬টিসহ মোট এক লাখ বিয়াল্লিশ হাজার ২৪৪টি বসতঘর বিধ্বস্ত হয়। উপজেলার ৪৮ হাজার ৪৬০টি পরিবারসহ মোট এক লাখ ১৪ হাজার পরিবার আইলার আঘাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপজেলার ৩৯৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ তিন শতাধিক মসজিদ, মন্দির সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি ১৭৯ কিমি রাস্তা সম্পূর্ণ ও ৯৯ কিমি আংশিক নষ্ট হয়ে যায়। ৪১টি ব্রিজ ও কালভার্টসহ ১১৭ কিমি বেড়িবাঁধ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। শুধু শ্যামনগরেই ১২৭ কিমি বাঁধের ৯৭ কিমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

আরও পড়ুন