‘আমার মৃত মা কীভাবে ভোট দিলেন’

আপডেট: 02:16:44 11/06/2018



img
img
img

খুলনা অফিস : খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দশ নম্বর ওয়ার্ডে ভোট দিয়েছেন এমন সাত নারী, যারা ভোটের আগেই মারা গেছেন। একই সঙ্গে প্রবাসী, অসুস্থ ও ভোটের দিন এলাকায় ছিলেন না- এমন ভোটারদের নামেও ভোট কাস্ট হয়েছে।
এই তথ্য তুলে ধরে এবং অনিয়ম হওয়া ভোট কেন্দ্রে আবার ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. ফারুক হিল্টন।
তার অভিযোগ, নগরীর খালিশপুর হাউজিং এস্টেটের এনএল-৮৮ নম্বর বাসার মৃত শেখ আবদুর রশিদের স্ত্রী শুকুরজান (৭১) ভোটার ছিলেন দশ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াবাটি হাজী শরীয়তউল্লাহ বিদ্যাপীঠ (মাধ্যমিক) ভোট কেন্দ্রে। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মারা যান ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। যা কেসিসির ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের মৃত্যু নিবন্ধন বইতে উল্লেখ রয়েছে। অথচ গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে তিনি ভোট দিয়েছেন বলে দেখানো হয়েছে।
নগরীর নয়াবাটি ঈদগাহ রোডের মৃত মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান গত বছর ৫ নভেম্বর। অথচ তিনিও একই ভোট কেন্দ্রে গত ১৫ মে ভোট দিয়েছেন বলে দেখানো হয়েছে।
শুধু এই দুইজনই নন, এ রকম মোট সাত মৃত ব্যক্তি সিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
নগরীর দশ ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী মো. ফারুক হিলটন স¤প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর এ লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি দশ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি ভোট কেন্দ্রে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা তুলে ধরে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নয়াবাটি রেললাইন এলাকার আবদুল বেপারীর স্ত্রী সূর্যবান বিবি (৭৭) ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গত ২৫ ফেব্রæয়ারি। খালিশপুর নয়াবাটি ১১ নম্বর সড়কের নর্থ জোন বি-৩ এর বাসিন্দা মো. আবুল হোসেনের স্ত্রী মোসা. রিজিয়া বেগম কিডনি রোগে মারা যান গত ৬ মার্চ। খালিশপুর হাউজিং এস্টেটের মোল্লা মহিউদ্দিনের স্ত্রী খালেদা বেগম বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই। নয়াবাটি ১১ নম্বর সড়কের এ-২২ নম্বর বাসার মৃত আতিয়ার রহমানের স্ত্রী আলেয়া বেগম বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান গত বছরের ৩১ অক্টোবর। এছাড়া নয়াবাটি মুন্সীবাড়ির মৃত আমির হোসেনের স্ত্রী ফাতেমা স্ট্রোকে মারা যান গত ৩১ জানুয়ারি। মৃত এই পাঁচজনও ভোট দিয়েছেন।
মৃত ভোটার আনোয়ারা বেগমের ছেলে মো. আবদুল হাই কালু বলেন, তার মা মারা গেছেন প্রায় ৬-৭ মাস আগে। অথচ ভোট প্রদানকারীর তালিকায় তার মায়ের নামও রয়েছে।
তার প্রশ্ন, ‘আমার মৃত মা কীভাবে ভোট দিলেন? নিশ্চয় আমার মায়ের নামে  জাল ভোট দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমার স্ত্রী লাইজু বেগম অসুস্থতার কারণে ওই দিন ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেনি। অথচ তার নামও ভোট প্রদানকারীর তালিকায় রয়েছে।’
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নয়াবাটি হাজী শরীয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠ (মাধ্যমিক) ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার এক হাজার ৮১৭ জন নারী। এর মধ্যে মেয়র পদে ভোট দিয়েছেন এক হাজার ৮১৬ জন। মাত্র একজন ভোটার ভোট দেননি। ভোট প্রদানের হার ৯৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে কাউন্সিলর পদে এক হাজার ৮১৭ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ৮১৩ জন। দুই পদে দুই রকম ভোট প্রদানের সংখ্যা দেখে এলাকার মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া কাউন্সিলর প্রার্থী মো. ফারুক হিলটন তার লিখিত অভিযোগে বলেছেন, হাজী শরীয়ত উল্লাহ বিদ্যাপীঠ কেন্দ্রে এক হাজার ৮১৭ জন মহিলা ভোটারের মধ্যে এক হাজার ৮১৩ জন ভোট দিয়েছেন। অথচ সাতজন ভোটার ইতিপূর্বে মারা গেছেন, যার প্রমাণপত্র সংযুক্ত করেছেন তিনি। এছাড়া তিনজন ভোটার (তারা স্কুলশিক্ষক) অন্যত্র নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকার কারণে ভোট দিতে পারেননি। এই কেন্দ্রের ভোটার রুমানা আহমেদ বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন হিসেবে ওই সময় আফ্রিকা অবস্থান করায় ভোট দিতে পারেননি। আরো দুইজন ভোটার বিদেশে অবস্থান করায় ভোট দিতে পারেননি। 
এ ব্যাপারে মো. ফারুক হিল্টন বলেন, ‘৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ ভোটার পড়ার বিষয়টি নজিরবিহীন এবং অস্বাভাবিক। আমি লিখিত অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত সাতজনের নাম দিয়েছি। এ রকম শতাধিক ব্যক্তি পাওয়া যাবে যারা মৃত, বিদেশে অবস্থান করছেন কিংবা চাকরির কারণে এলাকার বাইরে রয়েছেন। আমি এ ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নেবো।’
লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়, নয়বাটি জনকল্যাণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মওলানা ভাসানী বিদ্যাপীঠ (গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ) স্কুল ভবন দ্বিতীয় তলা ভোট কেন্দ্রে একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ভোট গণনার সময় দেখা গেছে, ওই কেন্দ্রের প্রায় চার হাজার ৫০০টি ব্যালটে নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার কোনো স্বাক্ষর নেই। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি মৌখিকভাবে ও লিখিত অভিযোগ দিয়েও সুফল পাননি।
‘আমি অভিযোগ করায় প্রশাসনের সামনেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তালাত হোসেন কাউট ও তার ভাই-চাচা দলবল নিয়ে আমাকে লাঞ্ছিত করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। তিনটি কেন্দ্রে প্রদত্ত ভোট দেখানো হয়েছে ৯৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ৯৭ দশমিক ৬০ শতাংশ ও ৮৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। যা কোনো অবস্থায় বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ইতিমধ্যে অনেক ভোটার মৃতত্যুবরণ করেছেন, অনেকে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন জেলায় অবস্থান করছেন, অনেকে দেশের বাইরে, অনেকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে ভোট দিতে পারেননি। অথচ তাদের ভোটও কাস্ট হয়েছে। তাছাড়া সমগ্র সিটি করপোরেশনে কাস্টিং ভোট ৬২ শতাংশ, এই তিনটি কেন্দ্রে কাস্টিং ভোট এতো বেশি, যা কোনো অবস্থায় সম্ভব নয়। নয়াবাটি জনকল্যাণ স্কুল কেন্দ্রের জানালার পাশে কিছু কাটা ছেড়া ব্যালট দেখা যায়।’
এ ব্যাপারে কেসিসি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও খুলনা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর জমা দেওয়া একটি অভিযোগের অনুলিপি তাকেও দেওয়া হয়েছে। এখন আর এ বিষয়ে তার তদন্ত করার কোনো এখতিয়ার নেই। নির্বাচন কমিশন তদন্ত করবে কিনা সে বিষয়ে কমিশনই সিদ্ধান্ত নেবে।
নবনির্বাচিত কাউন্সিলর কাজী তালাত হোসেন কাউট দাবি করেন, দশ নম্বর ওয়ার্ডের সব কেন্দ্রেই সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে। কোনো অনিয়ম বা কাউকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ সঠিক নয়।

আরও পড়ুন